ফের তৃণমূলে বিদ্রোহ। সাংসদ কাকলি ঘোষ দস্তিদার দলে তাঁর সমস্ত সাংগঠনিক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন। তিনি রাজ্য সভাপতি সুব্রত বক্সীকে চিঠি লিখে এই বিষয়টি জানিয়েছেন। পাশাপাশি জানা যাচ্ছে, কলকাতা পুরসভার ১২ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সনের পদ ছাড়লেন সুশান্ত ঘোষ। বুধবারই পুর কমিশনার স্মিতা পাণ্ডের কাছে তাঁর ইস্তফাপত্র জমা দিচ্ছেন। পুরসভার আর এক কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তীও ‘মিউনিসিপ্যাল অ্যাকাউন্টস কমিটির’ পদ ছাড়লেন।
গতকালই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কাউন্সিলরদের নিয়ে বৈঠক করেছিলেন। তাঁদের ঝাঁপিয়ে পড়ে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো। তবে পরের দিনই দেখা গেল উল্টো ঘটনা। এর আগে দেবলীনা বিশ্বাস পুরসভার ৯ নম্বর বরো চেয়ারম্যান পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। দেবলীনার পরে এবার বরো চেয়ারম্যানের পদ ছাড়লেন সুশান্ত ঘোষ। কলকাতা পুরসভায় ১২ নম্বর বরোর চেয়ারম্যান পদ ছাড়লেন সুশান্ত ঘোষ। কাউন্সিলর থাকলেও, বরো চেয়ারম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সুশান্ত ঘোষ। এদিকে, পুরসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সদস্যপদ ছাড়লেন তৃণমূল কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তী।
সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে সুশান্ত ঘোষ ও অরূপ চক্রবর্তী জানান, 'হার স্বীকার করতে হবে,নইলে আগের জয় মিথ্যে হয়ে যায়।' সুশান্ত জানান, তিনি কাউন্সিলর থাকলেও বরো চেয়েরম্যান পদ থেকে পদত্যাগ করছেন। পাশাপাশি কসবায় তাঁর পার্টি অফিসে বিজেপি ভাঙচুর চালায়নি বলেও দাবি করেন তিনি। তৃণমূল কর্মীদের ঘরে ফেরানোর জন্য বিজেপি নেতৃত্বকে ধন্যবাদ জানান অরূপ ও সুশান্ত। এখনও দল ছাড়েননি বলেও জানান দুজনে। তবে দল বললে আজকেই ইস্তফা দিতে পারেন সেকথাও জানিয়ে দেন। গত ১৫ বছর ধরে দলের সঙ্গে লড়াই করতে হয়েছে বলেও ক্ষোভ উগরে দেন সুশান্ত ও অরূপ।
আজ, বুধবার সরাসরি পুরসভায় গিয়ে মেয়র ফিরহাদ হাকিমের সঙ্গে দেখা করে পদত্যাগপত্র জমা দেন তাঁরা। পদত্যাগের পর যৌথ সাংবাদিক বৈঠকে দলের শীর্ষ নেতৃত্ব এবং প্রাক্তন হেভিওয়েটদের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দেন সুশান্ত ঘোষ। তিনি স্পষ্ট জানান, দলের সাধারণ কর্মীরা যখন মার খাচ্ছেন, তখন বড় বড় নেতারা নিখোঁজ। সুশান্ত বলেন, 'আমরা যেমন জনপ্রতিনিধি, ঠিক তেমনি দলীয় পদেও ছিলাম। কিন্তু আজ দলের ছেলেরা ঘরছাড়া, অথচ পাশে নেই দলের শীর্ষ নেতৃত্ব।' তিনি আরও বলেন, 'গত ১৫ বছর ধরে মমতাদির প্রশ্রয়ে যাঁরা কনভয় নিয়ে ঘুরে বেড়ালেন, সমস্ত সুযোগ-সুবিধা ভোগ করলেন, সেইসব নেতা-মন্ত্রীরা আজ কোথায়? তাঁদের আজ খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না! আমরা বিজেপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলে অনেক ঘরছাড়া তৃণমূল কর্মীকে ঘরে ফেরাতে পেরেছি। মানুষ আমাদের বিপক্ষেই ভোট দিয়েছে, এটা বুঝতে হবে। মানুষ ছাড়লে আগামীদিনে কাউন্সিলর পদ থেকেও ইস্তফা দেব। এখন আমাদের চুপ করে বসে থাকা এবং গঠনমূলক বিরোধিতা করা দরকার।'
একই সুরে সুর মিলিয়ে দলের ভিভিআইপি সংস্কৃতির বিরুদ্ধে গর্জে ওঠেন পদত্যাগী কাউন্সিলর অরূপ চক্রবর্তীও। এই ইস্তফাকে ‘প্রতীকী প্রতিবাদ’ আখ্যা দিয়ে তিনি বলেন, 'আজকে যদি ২০২৬-এর হার আমরা মেনে নিতে না পারি, তবে ২০১১, ২০১৪ বা ২০২১-এর জয়গুলোও মিথ্যে হয়ে যায়। ২০২৬-এ আমরা পরাজিত হয়েছি, মানুষ আমাদের বিরোধী আসনে বসিয়েছেন, এটা বুঝতেই হবে। আজ কর্মীরা ঘরছাড়া, অথচ দলের কেষ্টবিষ্টুরা কোথায়?' তাঁর কথায়, 'আমাদের দলেও এমন অনেক নেতা-মন্ত্রী ছিলেন যাঁরা ভেবেছিলেন সারাজীবন পদে থেকে যাবেন। আজ যখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের বাড়িতে রবীন্দ্রজয়ন্তীর অনুষ্ঠান হচ্ছে, তখন আগের সেই কেষ্টবিষ্টুরা কোথায় গেলেন? মানুষের জনাদেশ মাথা পেতে নেওয়াটাই তো গণতন্ত্রের শিষ্টাচার।'
সুশান্ত ঘোষ আরও স্পষ্ট হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছেন, 'পরবর্তী সময়ে হয়তো আরও অনেক কাউন্সিলর আমাদের এই পথেই হাঁটবেন।' সম্প্রতি ৯ নম্বর বরোর চেয়ারপার্সনের পদ থেকে দেবলীনা বিশ্বাসের ইস্তফার পর, আজ জোড়া কাউন্সিলরের এই পদত্যাগ কলকাতা পুরসভায় তৃণমূলের বড়সড় ভাঙন ও অসন্তোষকেই প্রকাশ্যে এনে দিল।