নদী ও সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্র রক্ষা এবং মাছের বংশবৃদ্ধির তাগিদে প্রতি বছর একটি নির্দিষ্ট সময়ে মাছ ধরার ওপর সরকারি নিষেধাজ্ঞা জারি থাকে, যা ‘ব্যান পিরিয়ড’ নামে পরিচিত। বর্তমানে সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি বছর ১৫ এপ্রিল থেকে ১৫ জুন পর্যন্ত মোট দুই মাস নদী ও সমুদ্রে সমস্ত ধরনের মাছ ধরা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। এই সময়টিকে মাছের প্রধান প্রজনন ঋতু বা ‘ব্রিডিং সিজন’ হিসেবে গণ্য করা হয়। ডিমপোনা ও ছোট মাছের সুরক্ষায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও, বর্তমান পরিস্থিতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের কথা মাথায় রেখে মৎস্যজীবীরা এখন এই নিষিদ্ধ সময়সীমা আরও বাড়ানোর দাবি জানাচ্ছেন।
দিঘা, শংকরপুর সহ উপকূলবর্তী অঞ্চলের মৎস্যজীবী সংগঠনগুলির দাবি, শেষ কয়েক বছরে সামুদ্রিক আবহাওয়া এবং মাছের প্রজনন চক্রে বেশ কিছু দৃশ্যমান বদল এসেছে। বিশ্ব উষ্ণায়ন ও প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার কারণে অনেক সময়ই প্রজনন প্রক্রিয়া ১৫ জুনের পরেও স্থায়ী হচ্ছে। ফলে, নিষেধাজ্ঞা উঠতেই যখন ট্রলারগুলি সমুদ্রে নামছে, তখন জালে ধরা পড়ছে প্রচুর পরিমাণে ডিম্ববতী ও ছোট মাছ। এতে দীর্ঘমেয়াদে সামুদ্রিক মৎস্য সম্পদের অপূরণীয় ক্ষতি হচ্ছে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে মৎস্যজীবীদের জীবিকায়। মৎস্যজীবীদের একাংশের মতে, এই ব্যান পিরিয়ড বা নিষেধাজ্ঞা অন্তত ৬০ থেকে ১৮০ দিনে বাড়ানো উচিত।
ব্যান পিরিয়ড বাড়িয়ে ১৮০ দিনের করলে মাছেরা সম্পূর্ণভাবে ডিম ছাড়ার ও বড় হওয়ার সুযোগ পাবে। প্রজননকাল সম্পূর্ণ সুরক্ষিত থাকলে ইলিশ সহ অন্যান্য মূল্যবান সামুদ্রিক মাছের উৎপাদন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পাবে। নদী ও সমুদ্রের তলদেশের জীববৈচিত্র্য তথা সামগ্রিক বাস্তুতন্ত্র সুরক্ষিত থাকবে। সাময়িকভাবে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে পরে বড় আকারের মাছ পাওয়া যাবে, যা বাজারে মৎস্যজীবীদের অনেক বেশি লাভ দেবে। এ বিষয়ে, পূর্ব মেদিনীপুর মৎস্যজীবী ফোরামের সহ সভাপতি শ্রীকান্ত দাস বলেন, ” বর্তমান সময়ে ৬০ দিনের ব্যান পিরিয়ড নদী বা সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের জন্য। আমরা এই ব্যান পিরিয়ড ১৮০ দিনের করার দাবি জানাচ্ছি। এতে দীর্ঘ মেয়াদী সুবিধা লাভ করবে মৎস্যজীবীরা।”
সাধারণত সরকারি নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে ক্ষোভ দেখা দিলেও, মৎস্যজীবীদের নিজেদের তরফ থেকে এই নিষেধাজ্ঞা বাড়ানোর দাবি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও দূরদর্শী। এখন দেখার, মৎস্য দফতরের আধিকারিক ও বিশেষজ্ঞরা এই দাবির বৈজ্ঞানিক ভিত্তি খতিয়ে দেখে ব্যান পিরিয়ডের সময়সীমা পুনর্মূল্যায়ন করেন কি না। মৎস্যজীবীদের এই আরজি যদি বাস্তবায়িত হয়, তবে তা সমুদ্রের নীল অর্থনীতি এবং পরিবেশ, উভয়ের জন্যই এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ হবে। তবে মৎস্যজীবী সংগঠনে এই ব্যান পিরিয়ড থেকে প্রান্তিক এবং ক্ষুদ্র মৎস্যজীবীদের ছাড় দেওয়ার দাবিও উঠেছে।