• ‘আপসের রাস্তায় হাঁটেননি, সিস্টেমকে প্রশ্ন করার সাহস রাখতেন’, অনীকের প্রয়াণে শোকস্তব্ধ রুদ্রনীল, কৌশিকরা
    প্রতিদিন | ২৭ মে ২০২৬
  • প্রয়াত অনীক দত্ত। ২২ মে জন্মদিন। তার দিন পাঁচেক বাদেই যে নিয়তির ডাক আসবে সেটা বোধহয় স্বপ্নেও কল্পনা করতে পারেননি অনীকের বন্ধু-সহকর্মীরা। বুধবার দুপুরে পরিচালকের মৃত্যুসংবাদ প্রকাশ্যে আসতেই স্তম্ভিত টালিগঞ্জের স্টুডিওপাড়া! যে মানুষটি কোনওদিন আপস করেননি, যিনি শিরদাঁড়া নোয়ানোর সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত ছিলেন না, এমনকী যাঁর রসবোধকে বন্ধু-সহকর্মীরাও ঈর্ষা করতেন! সেই মানুষটির এমন আকস্মিক চলে যাওয়া কিছুতেই যেন বিশ্বাস করতে পারছেন না সিনেদুনিয়া থেকে রাজনৈতিক ময়দানের পরিচালক-ঘনিষ্ঠরা।

    ছাদ থেকে পড়ে গিয়ে এমন রহস্যজনক মৃত্যু! এভাবে কি অনীক দত্তর চলে যাওয়া মানায়? হাসপাতালে দাঁড়িয়ে সেলেবপাড়ার সদস্য়দের মুখে একটাই কথা! রুদ্রনীল ঘোষ বললেন, “অনীকদা এমন একটা মানুষ ছিলেন যাঁর সঙ্গে তর্ক-ঝগড়া করার পরও মনে একটা শান্তি আসত। অনীকদা একজনই। বন্ধুবান্ধব, পরিবার-স্বজনদের জন্য তো বটেই, পাশাপাশি এটা সিনেমাজগতের জন্যেও এক অপূরণীয় ক্ষতি। ওঁর পরিজন, অনুরাগী, সকলের জন্য সমবেদনা রইল। অনীকদা নিজস্বতায় বাঁচতেন। আপসের রাস্তায় কোনওদিন হাঁটেননি। যে ধারা তিনি গিয়েছেন, উনি বিজ্ঞাপন তৈরি করতেন। আমি অনীকদার সঙ্গে বিজ্ঞাপনেও কাজ করেছি। বিজ্ঞাপনের দুনিয়া থেকেই তিনি খ্যাতি পান। এরপর সিনেমাজগতে প্রবেশ। ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’, ‘অপরাজিত’…। অনীকদা আদতেই অপরাজিত একজন মানুষ।” শেষ সাক্ষাতে কী কথা হয়েছিল পরিচালকের সঙ্গে? সেকথাও তুলে ধরলেন শিবপুরের বিধায়ক তথা অভিনেতা। রুদ্রনীলের মন্তব্য, “কোনওদিনই মানসিক অবসাদে ভুগছিলেন বলে মনে হয়নি। শেষবার মাস দেড়েক আগে একটা প্রিমিয়ারে যখন কথা হল, বললাম- তোমার শরীরটা কেমন একটা দেখাচ্ছে! উনি বললেন- ঠিক জুতসই মনে হচ্ছে না। খুব অল্প সময়ের জন্যেই এসেছিলেন। শরীর খারাপ থাকায় তাড়াতাড়ি চলেও যান সেদিন। কীভাবে এমন ঘটনা ঘটল? পুলিশি তদন্তে নিশ্চয়ই উঠে আসবে। তবে আমার খবরটা বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করছে না এখনও।”

    পাশেই দাঁড়িয়ে ছিলেন পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়। তাঁর মন্তব্য, “বারবার এমন মর্মান্তিক ঘটনা ঘটছে। মানুষ চলে যায় ঠিকই কিন্তু অনীকদার মতো এমন রাজকীয় রসবোধ যাঁর এত ভালো সেন্স অফ হিউমর, তার এভাবে চলে যাওয়া কেউ মানতে পারছি না। যে চলে গেছে তাকে তো আটকাতে পারবেন না, কিন্তু মিডিয়ার কাছে আমার অনুরোধ অনীককে ওঁর কাজের মধ্য দিয়েই উদযাপন করুন। অনীক দত্তকে রিপ্লেস করা সম্ভব নয়। কারণ ওঁর মতো রসবোধ আমাদের কারও নেই।” ভ্রাতৃসম অনীকের প্রয়াণে কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায় বললেন, “খুবই দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা। দৃঢ়চেতাচেতা মানুষ ছিলেন। ফিল্ম জগতের বিরাট ক্ষতি। এই ঘটনা মেনে নিতে পারছি না। এইমুহূর্তে এর থেকে খুব বেশি কিছু বলার নেই আর। সিনেদুনিয়ার পাশাপাশি বিজ্ঞাপন জগতেরও অপূরণীয় ক্ষতি অনীকের চলে যাওয়াটা।”

    হাসপাতালে সংবাদ মাধ্যমের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন মানসী সিনহা। অভিনেত্রী জানালেন দিন পাঁচেক আগেই অনীকের সঙ্গে কথা হয়েছে তাঁর। মানসী বলছেন, “২২ মে অনীকের জন্মদিনের রাতে ওর সঙ্গে আমার কথাও হল। ওঁর নতুন কাজ শুরু করার কথাও ছিল। আসলে ও খানিক অসুস্থ ছিল। নানারকম সমস্যায় পড়ে ছবিটার কাজ আটকে গিয়েছিল। সেদিন ও আমাকে জানিয়েছিল, নতুন কাজ শুরু করছি। সেই বিষয়ে কত ভালো ভালো কথা হল। এরকম একটা কাণ্ড যে ঘটে যাবে, সেটা তো বুঝতে পারিনি। অনীক অনেক শক্ত মনের। কোনওভাবেই বোঝা যায়নি। নানারকম সমস্যা তো সবার জীবনে থাকে। তার জন্যে এতবড় সিদ্ধান্ত নেবে বুঝতে পারিনি।” আবেগপ্রবণ অনীকের ‘অপরাজিত’ অভিনেতা জীতু কমলও। ‘আজ কিছু বলার মতো অবস্থায় নেই…’, নিজেকে সামলে শুধু এটুকুই বললেন। অনীক দত্তর হাত ধরেই বড়পর্দায় ‘অভিনেতা’ জীতুর আত্মপ্রকাশ।

    প্রযোজক ফিরদৌসুল হাসান যিনি গোড়া থেকেই অনীক দত্তর সঙ্গে হাসপাতালে ছিলেন, তাঁর কথায়, “অনীক দত্তর চলে যাওয়া ক্রিয়েটিভ ফিল্ডের ক্ষতি। উনি একেকটা সিনেমা ২-৩ বছর সময় নিয়ে বানাতেন। কাজে কখনও ফাঁকি দিতেন না। খানিক খামখেয়ালি ছিলেন বটে। সেকথা আমরা সকলেই জানতাম। কিন্তু তার জন্য যে এত বড় একটা সিদ্ধান্ত নেবেন, এটা অকল্পনীয়। এই তো ২১ তারিখ পরবর্তী ছবি অপরাজিত ২-এর প্রি প্রোডাকশন মিটিং করলাম প্রায় দু ঘণ্টা ধরে বসে। ২২ তারিখ ছিল ওঁর জন্মদিন। সেদিনও কথা হল। গত পরশুই আমাকে একটা কনসেপ্ট নোট পাঠিয়ে জানতে চাইলেন কেমন হয়েছে? সেখানে এমন আকস্মিকভাবে চলে যাওয়াটা অপ্রত্যাশিত। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ওঁর মেয়ে এলে নন্দনে জনসাধারণ, সিনেপ্রেমীদের শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য ২ ঘণ্টা অনীককে রাখা হতে পারে।”

    ‘ভবিষ্যতের ভূত’ ছবির চিত্রনাট্যকার, উৎসব মুখোপাধ্যায় যিনি নিজে দিন কয়েক আগে স্বেচ্ছায় নিখোঁজ হয়েছিলেন, অনীকের মৃত্যুর খবরে তিনিও হাসপাতালে ছুটে এসেছেন। বললেন, “পরশু রাতেই কনসেপ্ট নোট নিয়ে আমাদের আলোচনা হল। হাসানদাকেও সেটা পাঠালেন। সেদিনও ওকে মানসিক আবসাদে রয়েছেন বলে মনে হয়নি। এতটাই স্বাভাবিক যে, নিজেই আমার পাঠানো নোটে কিছু কারেকশন করে দিলেন। একদম সূক্ষ্ম, সুস্থ মাথা, যে অনীকদাকে আমি ২০০৭ সাল থেকে চিনি।” দাদাসম অনীকের প্রয়াণে কান্নায় ভেঙে পড়েছেন শ্রীলেখা মিত্র। পরিচালকের আত্মঘাতী হওয়ার খবরে ‘অভিমানী’ অভিনেত্রীর মন্তব্য, “তুমি তো শেষ হাসি হাসছিলে! কী উদাহরণ তৈরি করলে তোমার অনুরাগীদের জন্য? কমরেড এটা একদম ঠিক করলে না আমাদের সঙ্গে। মেনে নিতে পারছি না। আমি আবার অভিভাবক হারা হলাম। ইন্ডাস্ট্রিতে আমার একমাত্র বন্ধু তথা শুভাকাঙ্ক্ষীকে হারিয়ে ফেললাম।”

    অনীক দত্ত যে বরাবর বামপন্থায় বিশ্বাসী ছিলেন, সেকথা কারও অজানা নয়। বার বার বিরোধী শিবিরের বিরুদ্ধে একাধিক ইস্যুতে প্রতিবাদী আওয়াজ তুলেছেন। বিজেপি-তৃণমূল, স্পষ্ট কথা বলতে কাউকেই কোনওদিন রেয়াত করেননি পরিচালক। সেপ্রসঙ্গ টেনেই সৌরভ পালোধী যিনি নিজেও বাম মতাদর্শে বিশ্বাসী, তিনি বললেন, “অনীকদা আজকের দিনে প্রয়োজনীয় মানুষ ছিলেন। শুধু সিনেমা নয়, কঠিন সময়তেও সিস্টেমকে সরাসরি প্রশ্ন করার সাহস রাখতেন এই মানুষটা। এরকম মানুষ তো আজকে বিরল। যাদের দেখে সাহস পেতাম, তাদের মধ্যে আরও একজন চলে গেলেন।” হাসপাতাল থেকে বেরনোর সময়ে শতরূপ ঘোষ বললেন, “দিন সাতেক আগেই কথা হল অনীকদার সঙ্গে। শারীরিকভাবে তো অনেকদিন ধরেই অসুস্থ ছিলেন। আগেও কয়েক বার অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন। কিন্তু কী থেকে কী ঘটে গেল, কিছুই বুঝতে পারছি না! কথা বলার মতো অবস্থায় নেই আমি।” খবর, পরিচালক অনীক দত্তর মেয়ে ঐশী দত্ত বৃহস্পতিবার বিদেশ থেকে কলকাতায় এসে পৌঁছাবেন। দুপুর তিনটের পর, তাঁর সঙ্গে আলোচনা করে শেষকৃত‍্য হবে।
  • Link to this news (প্রতিদিন)