বাংলা সিনেমায় পরিচালক হিসেবে পরিচিত হলেও অনীক দত্তের কাজ শুরু বিজ্ঞাপনের দুনিয়ায়৷ কলকাতার নামী বিজ্ঞাপন সংস্থায় কপিরাইটার ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করতে করতেই তাঁর গল্প বলার দক্ষতা তৈরি হয়।
কলকাতায় বেড়ে ওঠা, ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য, সিনেমা ও নাটকের প্রতি অনুরাগ, পুরনো কলকাতা এবং মধ্যবিত্ত নাগরিক জীবন ছিল অনীক দত্তের সিনেমার মূল উপজীব্য৷
মাত্র কয়েকটি ছবি, সেখানেই স্বকীয়তা দেখিয়েছিলেন অনীক দত্ত। তীক্ষ্ণ রসবোধ ও মজার ছলে সমাজের যে প্রতিচ্ছবি তুলে ধরতেন তা যেন সামাজিক দর্পণ। নস্ট্যালজিয়া, পুরনো কলকাতা, বাঙালির স্মৃতিমেদুরতা এবং সেইসঙ্গে শব্দের জাগলারি মিলিয়ে অনীক দত্তের সিনেমা বিনোদনের মোড়কে সমাজের আয়না৷
‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ বাংলা সিনেমায় অনীক দত্তকে পরিচালক হিসাবে প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল৷ হাস্যরস, পুরনো কলকাতা, সদ্য গজিয়ে ওঠা প্রোমোটারি ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত, পাড়ার মস্তান কী না নেই সেখানে! ভূতে মানুষে প্রেমে বিরহে জনপ্রিয় ব্যঙ্গাত্মক কমেডি। ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে একটি পুরনো জমিদারবাড়ি ও সেখানে থাকা নানা যুগের ভূতদের ঘিরে। ইংরেজ আমল থেকে শুরু করে নকশাল আন্দোলনের সময়ের চরিত্র— বিভিন্ন সময়ের মৃত মানুষরা একই বাড়িতে বসবাস করে। কিন্তু আধুনিক শহুরে উন্নয়নের নামে সেই ঐতিহ্যবাহী বাড়ি ভেঙে ফেলার পরিকল্পনা হয়। তখন নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় ভূতেরা একজোট হয়। হাস্যরসের মোড়কে ছবিটি আসলে শহরের পুরনো ঐতিহ্য, স্মৃতি এবং সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা তুলে ধরে। শব্দের জাগলারিতে সংলাপ হয়ে উঠেছিল উপভোগ্য এবং বার্তাবহ৷ অজস্র চরিত্র তবুও প্রত্যেকটা চরিত্রই যেন অনন্য, ব্যতিক্রমী চিত্রনাট্যের জন্য সিনেমাটি দর্শকের বিপুল প্রশংসা পায়। বাংলা সিনেমায় স্যাটায়ারধর্মী ছবির ক্ষেত্রে এটি আজও একটি মাইলফলক।
‘আশ্চর্য প্রদীপ’ মনের সেই অন্ধকারে আলো ফেলে যেখানে ক্ষমতার কালো ছায়ায় কখন যেন ঢাকা পড়েছে বিবেকের আলো৷ মূলত এক সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের হঠাৎ বদলে যাওয়া জীবনের গল্প। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে তৈরি এই ছবিতে দেখা যায়, এক ব্যক্তি আচমকা একটি জাদুর প্রদীপের মালিক হয়ে যায়। প্রদীপের দৈত্য তার সব ইচ্ছেপূরণ করতে পারে। প্রথমে জীবনের ছোট ছোট চাওয়া পূরণ হলেও ধীরে ধীরে লোভ, ক্ষমতা ও অর্থের মোহ তাকে গ্রাস করতে শুরু করে। ছবিটি রূপকথার আবহে তৈরি হলেও এর ভিতরে রয়েছে সমাজব্যঙ্গ ও মানবিক বার্তা। অনীক দত্ত অত্যন্ত মজার ছলে দেখিয়েছেন, মানুষ সীমাহীন সুযোগ পেলে কীভাবে নিজের স্বাভাবিকতা হারিয়ে ফেলে। মধ্যবিত্তের স্বপ্ন, হীনম্মন্যতা ও সামাজিক প্রতিযোগিতার বিষয়গুলোও ছবিতে উঠে এসেছে। অভিনয়ে ছিলেন শাশ্বত চট্টোপাধ্যায় ও মমতা শঙ্কর। ফ্যান্টাসি ও বাস্তবতার মিশেলে তৈরি এই সিনেমা দর্শকদের কাছে আলাদা মাত্রার বিনোদন এনে দেয়।
রামাপদ চৌধুরীর গল্প অবলম্বনে তৈরি ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ ছবিটি এক অবসরপ্রাপ্ত মানুষের মানসিক জগতের গল্প। বরুণবাবু দীর্ঘদিন বিদেশে থাকার পর দেশে ফিরে আসেন। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর চারপাশের সম্পর্কগুলো বদলে যেতে থাকে। পরিবার, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগের ভেতরে যে দূরত্ব তৈরি হয়, সেটাই ছবির মূল বিষয়। হঠাৎ এক পুরনো বন্ধুর আগমন তাঁর জীবনে নতুন আলো নিয়ে আসে। সিনেমাটি মূলত একাকিত্ব, স্মৃতি ও বার্ধক্যের আবেগকে কেন্দ্র করে নির্মিত। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের অভিনয় এই ছবির সম্পদ৷ অত্যন্ত সংযত অভিনয়ের মাধ্যমে তিনি এক নিঃসঙ্গ মানুষের মনোজগত ফুটিয়ে তুলেছেন। অনীক দত্ত এখানে খুব শান্তভাবে মধ্যবিত্ত বাঙালির শেষজীবনের একাকীত্ব এবং সম্পর্কের টানাপড়েন তুলে ধরেছেন।
‘অপরাজিত’ অনীক দত্তের অন্যতম প্রশংসিত সিনেমা, যেখানে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির সংগ্রামের গল্প দেখানো হয়েছে। যদিও ছবিতে সত্যজিৎ রায়ের নাম বদলে অপরাজিত রায় করা হয়েছে, তবুও পুরো নির্মাণটাই তাঁর জীবন ও সিনেমা তৈরির অভিজ্ঞতা থেকে অনুপ্রাণিত। অর্থের অভাব, অনভিজ্ঞ টিম, শুটিংয়ের সমস্যা— সব বাধা পেরিয়ে কীভাবে এক যুগান্তকারী বাংলা সিনেমার নির্মাণ, এমন এক সিনেমা যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে শিল্পের ব্যকরণ নির্মাণ করেছে, সেটাই ছবির মূল আকর্ষণ। এই সিনেমা কেবক এক পরিচলকের গল্প নয়, বরং স্বপ্ন ও শিল্পের প্রতি অদম্য ভালবাসার কাহিনি। জিতু কমলকে সত্যজিৎ রায়ের চরিত্রে অভিনয়ের জন্য নির্বাচন করাও অনীক দত্তের মুন্সীয়ানা। সাদা-কালো চিত্রগ্রহণ ছবিটিকে আরও নস্ট্যালজিক করে তুলেছে। বাংলা সিনেমার ইতিহাস, চলচ্চিত্র নির্মাণের সংগ্রাম এবং সৃজনশীলতার শক্তি— সব মিলিয়ে ‘অপরাজিত’ এক অনন্য অভিজ্ঞতা।
'যত কাণ্ড কলকাতাতেই', পরিচালক অনীক দত্তের শেষ ছবি৷ বহু বছর আগের একটি অমীমাংসিত রহস্য, সেই রহস্যের সূত্র খুঁজতে গিয়ে এক তরুণ অনুসন্ধানকারী জড়িয়ে পড়ে এমন এক ঘটনায়, যার সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরনো কলকাতার ইতিহাস, দুর্গাপুজোর আবহ এবং ফেলুদা-ধাঁচের তদন্তের স্বাদ। ছবিটিতে শহর কলকাতাই এক চরিত্র৷ পুরনো ট্রাম, উত্তর কলকাতার গলি, বনেদি বাড়ি এবং শহরের ঐতিহ্য গল্পকে আরও জীবন্ত করে তোলে। অনীক দত্ত এখানে রহস্যের পাশাপাশি শহরের স্মৃতি, সংস্কৃতি ও মানুষের আবেগকেও গুরুত্ব দিয়েছেন। রহস্য, নস্ট্যালজিয়া এবং কলকাতার আবহ— এই তিনের মিশ্রণেই তৈরি হয়েছে ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’।