• মমতার নতুন কবিতা ‘গিরগিটি’
    আজকাল | ২৮ মে ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যের শাসক দল যখন আক্ষরিক অর্থেই এক চরম সাংগঠনিক সংকটের মুখোমুখি, ঠিক তখনই ফের একবার কলম ধরলেন তৃণমূল নেত্রী মমতা ব্যানার্জি। দল যখন তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ছে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ দাবি করছেন, ঠিক সেই মুহূর্তেই তাঁর নতুন ব্যঙ্গাত্মক কবিতা ‘গিরগিটি’ রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র জল্পনা ও বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। দলের বিধায়ক, সাংসদ, কাউন্সিলর, পঞ্চায়েত সদস্য থেকে শুরু করে মুখপাত্রদের একাংশের লাগাতার পদত্যাগ, বিজেপির প্রশংসা এবং নেত্রীর ভাইপো অভিষেক ব্যানার্জির  তীব্র সমালোচনা করে দল ছাড়ার হিড়িকের পটভূমিতে এই কাব্যিক কটাক্ষকে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।

    সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত এই কবিতায় মমতা ব্যানার্জির তীব্র আক্রমণ শানিয়ে লিখেছেন যে, গিরগিটির থেকেও ভয়ঙ্কর হল সেইসব মানুষ, যারা মাত্র কয়েক ঘণ্টায় স্বার্থের জন্য ভোলবদল করে নিজেদের ও কর্মীদের আত্মসম্মান বিক্রি করে দেয়। তবে নিজের দলত্যাগী বা বিশ্বাসঘাতকদের ‘গিরগিটি’ হিসেবে দেগে দিলেও, নেত্রী ঠিক কার বা কাদের উদ্দেশ্যে এই তির ছুঁড়েছেন, তা নিয়ে ধোঁয়াশা রয়েই গেছে। 

    কিন্তু এই কবিতার সূত্র ধরেই এখন উল্টো পুরাণের স্মৃতি মনে করিয়ে দিচ্ছে রাজনৈতিক মহল। "পাপ বাপকে  ছাড়ে না। আজ যেই দলবদলকে ‘অমানবিক’ বা ‘গিরগিটির ভোলবদল’ বলে নেত্রী কবিতা লিখছেন, ঠিক একই কাজ তাঁর দল করে এসেছে রাজ্যে পালাবদলের পর থেকেই। নিজে যখন ছলে-বলে-কৌশলে বছরের পর বছর ধরে বিরোধী দল ভাঙিয়েছেন, তখন কি এই গিরগিটির তত্ত্ব মনে পড়েনি? এক জাগায় আবার তিনি লিখেছেন "আর কতো চাও?" মানে অনেক মালকড়ি যে তারা পেয়েছে সেটা কবিতার মাধ্যমে নিজেই স্বীকার করছেন", কটাক্ষ সিপিএম নেতা ময়ূখ বিশ্বাসের।

    তাঁর দাবি, গত এক দশকে বারেবারে দেখা গিয়েছে কীভাবে অন্য দলের জেতা এমএলএ, এমপি কিংবা কাউন্সিলরদের ক্ষমতার অলিন্দে টেনে নিয়েছে শাসক দল। বিরোধীদের জেতা বিধায়ক, সাংসদ থেকে শুরু করে পঞ্চায়েত ও পুরসভার কাউন্সিলরদের হয় প্রলোভন দেখিয়ে দল ভাঙানো হয়েছে, নয়তো বলপ্রয়োগ করে দখল করা হয়েছে। এমনকি, বিরোধীদের জেতা বোর্ড বা পুরসভা এলাকায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা ও তহবিল বন্ধ করে দেওয়ার মতো মারাত্মক অভিযোগও উঠেছে বারবার। শুধু তাই নয়, বিগত পঞ্চায়েত নির্বাচনে খোদ অভিষেক ব্যানার্জির 'বিরোধী শূন্য' করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি মেনে যেভাবে কার্যত বিরোধীহীন পঞ্চায়েত ভোট করানো হয়েছিল—তা নিয়ে আজও সরব রাজনৈতিক মহল। আজ সেই দল ভাঙানোর খেলা নিজের ঘরের দোরগোড়ায় এসে পৌঁছাতেই নেত্রীর এই নীতিবাণীকে ‘দ্বিমুখী আচরণ’ বলেই কটাক্ষ করছেন ময়ূখ।

    বাংলার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট অবশ্য এখন দ্রুত পরিবর্তনশীল। যে সিপিআইএম-এর ‘শূন্য’ হয়ে যাওয়া নিয়ে কিছুদিন আগেও তৃণমূলের তরফে দেদার হাসাহাসি চলত, ফলতা পুনর্নির্বাচনের পর তারাই যেন আকস্মিকভাবে রাজ্যের রাজনীতিতে দ্বিতীয় প্রধান শক্তি হিসেবে মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে। পরিস্থিতি এতটাই বদলেছে যে নন্দীগ্রামের মতো হাই-প্রোফাইল কেন্দ্রে মনোনয়ন জমা দেওয়ার জন্য তৃণমূলকে এখন হন্যে হয়ে যোগ্য প্রার্থী খুঁজতে হচ্ছে বলে খবর। ভাগ্যের চাকা যেন সম্পূর্ণ উল্টো ঘুরতে শুরু করেছে জোড়াফুল শিবিরের জন্য।

    এই চরম রাজনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে দাঁড়িয়ে মমতা ব্যানার্জি তাঁর স্বভাবসিদ্ধ চেনা ছন্দে, কবিতার মাধ্যমে ঘুরে দাঁড়ানোর এবং পাল্টা আঘাত করার চেষ্টা করলেন ঠিকই। কবিতায় তিনি ‘ভোগীদের স্থান নিকৃষ্ট’ এবং ‘শীঘ্রই উত্তর পাবে’ বলে কড়া হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। কিন্তু অতীত কর্মফলের পাল্টা কামড়ে জেরবার শাসক দলের এই দলবদলুদের স্রোত নেত্রী শুধু কবিতা লিখে রুখতে পারবেন কি না, সেটাই এখন বাংলার রাজনীতির সবথেকে বড় প্রশ্ন।
  • Link to this news (আজকাল)