• সন্দেশী অনীকের নিঃসঙ্গতা কাটত শিবুদা’র মুখে হযবরল শুনে, তাঁর ছবি আশ্চর্য প্রদীপ হয়ে রইল বাংলা ছবির বরুণবাবুদের বন্ধু হয়ে
    News18 বাংলা | ২৭ মে ২০২৬
  • যৌথ পরিবার ছেড়ে অণু সংসারে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন শৈশবেই। নিঃসঙ্গে মোড়া সেই ছেলেবেলায় অনীক যেন পিকু। মনের ডায়েরিতে পড়ত আঁকিবুঁকির আঁচড়। কিন্তু স্কুলের খাতা থেকে যেত পরিষ্কার। ভাবনার দুনিয়া থেকে মন সহজে ফিরে আসত না ক্লাসরুমে। বড় হয়ে উপলব্ধি, ‘হয়তো ডিসলেক্সিক ছিলাম। তখন তো আর তারে জমিন পর ছিল না’। সেই ‘না থাকার’ ছেলেবেলায় ছিল বাড়ির পরিচারক শিবুদা’। বাবা মাকে ছাড়া একাকী সময়ে অনীকের সঙ্গী ছিল শিবুদার মুখে ‘হযবরল’ শোনা। তখন থেকেই বোধহয় ঠিক হয়ে গিয়েছিল আদ্যন্ত পোড়খাওয়া ব্যাঙ্কিং, ব্যবসায়ী বাড়ির ছেলে পা রাখবেন প্রথমে বিজ্ঞাপনে, তার পর ছবিতে। অনীকের ঠাকুরদা ছিলেন নামী ব্যাঙ্কার, বাবা ছিলেন চাবাগানের মালিক। কিন্তু অনীকের মন আশৈশব জুড়ে ছিল ছবি আঁকা। সেই শখ আরও ফুলে়ফেঁপে উঠল সন্দেশী হওয়ার পর। মা তাঁকে গ্রাহক করে দিয়েছিলেন ‘সন্দেশ’-এর। বাড়িতে তাঁর নামে যখন পত্রিকার সংখ্যা আসত, লেফাফা খুলে মুগ্ধ হয়ে দেখতেন প্রচ্ছদ। পত্রিকার লেখার পাশাপাশি চুম্বকের মতো টানত ইলাস্ট্রেশনও। যত দিন এগোতে থাকল, তত যেন সত্যজিৎ রায়েই মজে উঠছিল তাঁর জীবন৷ নিছক আদর্শ বা অনুপ্রেরণাই নয়৷ অনীকের দৈনন্দিন চর্যাপদও যেন লেখা হচ্ছিল গড়পাড়ের দীর্ঘদেহীর জীবনের মতো করেই৷

    সত্যজিৎ পিতৃহারা হয়েছিলেন শৈশবে৷ অনীক সাক্ষী ছিলেন বাবা মায়ের বিচ্ছেদের৷ মাকে নিয়ে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে আসেন তিনি৷ তত দিনে নামের পাশে বসে গিয়েছে সেই ‘অর্থনীতি’ বিষয়টিই৷ সত্যজিতের মতো তাঁরও উচ্চশিক্ষা অর্থনীতিতেই৷ তার পর সেই বিজ্ঞাপন৷ স্টোরিবোর্ডে জিঙ্গল, ক্যাচলাইন লেখা কলম নিশপিশ করত সিনেমার সংলাপ লেখার জন্য৷ অবশেষে এল সুযোগ৷ অপেক্ষার উনুনে অনেক কাঠখড় পোড়ার পর মুক্তি পেল ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’৷ ২০১২ সালে মুক্তি পাওয়া এই সিনেমা বাংলা চলচ্চিত্রের দর্শককে ফের হলমুখী করে তুলেছিল৷ অনেক দিন পর আবার শোনা গেল বুদ্ধিদীপ্ত সংলাপ৷ যে সংলাপ চিত্রনাট্যের নিগড়ে বাঁধা না পড়ে থেকে লোকের মুখে মুখে ফিরল৷ তীক্ষ্ণ ব্যঙ্গে শাণিত রসবোধে জারিত সেই সিনেমা একইসঙ্গে প্রশংসিত সমালোচক কলমে এবং দর্শকদের মনে৷ প্রথম সিনেমাতেই এলেন, দেখলেন এবং বক্স অফিস জয় করলেন নবাগত পরিচালক অনীক৷

    ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর পরের বছরই মুক্তি পেয়েছিল ‘আশ্চর্য প্রদীপ’৷ প্রথম ছবির মতো আকাশছোঁয়া সাফল্য ও জনপ্রিয়তা না এলেও সম্পূর্ণ নিরাশ হননি দর্শকরা৷ এর পর ‘মেঘনাদবধ রহস্য’, ‘ভবিষ্যতের ভূত’, ‘বরুণবাবুর বন্ধু’-অনীকের প্রতিটি কাজ তাঁর আগের সিনেমা থেকে বিষয়বস্তুর দিক দিয়ে অনন্য ও স্বকীয়৷ বক্স অফিসের আনুকূল্য পাননি সব সময়৷ ছবিমুক্তির প্রেক্ষাগৃহ পেতেও বিস্তুর সমস্যা হয়েছে৷ কিন্তু ভাটা পড়েনি সমালোচকদের প্রশংসায়৷ ভাটা পড়েনি অনীকের শ্রদ্ধার্ঘ্যেও৷ যাঁর জন্য তাঁর পরিচালনায় হাতেখড়ি, সেই সত্যজিৎ রায়ের জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে অনীকের কুর্নিশ ‘অপরাজিত’ এলোমেলো করে দেয় সব কিছু৷ ‘পথের পাঁচালী’-র দীর্ঘ নির্মাণপর্বের প্রতি মুহূর্তে জড়িয়ে থাকা শ্রমে সিক্ত এ ছবি সব দিক থেকেই স্রষ্টার প্রতি গুণমুগ্ধের আজানুভূমি প্রণাম৷ নতমস্তকে সেই ভালবাসার রেশ অনীক ছড়িয়ে দিয়েছিলেন তাঁর পরের এবং দুর্ভাগ্যজনকভাবে শেষ ছবি ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’-তেও৷

    ওপার বাংলার শিকড় উপড়ে আসা রাজনৈতিক পরিচয় প্রকাশে অকুণ্ঠ অনীক ভালবাসতেন কলকাতাকে৷ চা-বাগানের নিঃসর্গ ছাপিয়ে খুঁজতেন ফেলে আসা শহুরে কোলাহলকে৷ কিন্তু সেই কোলাহলেও কি তাঁকে শারীরিক অসুস্থতার পাশাপাশি গ্রাস করেছিল অবসাদের হলাহল? নয়তো নিজের ‘প্যানিক দত্ত’ পরিচয়কে যিনি হেলায় হেসে উড়িয়ে দিতেন, তিনি কেন এভাবে হারিয়ে গেলেন নিজের জন্মদিনের পাঁচ দিন পর? যাঁর ছবি দর্শকদের বিষণ্ণতা কাটানোর প্রেসক্রিপশন, তাঁর পকেটেই কি না রয়ে গেল অবসাদমুক্তির ওষুধের তালিকা! ছোটবেলায় সত্যজিতের হাতে তাঁর ‘অনীক’ নাম লেখা উপহার খোয়া গিয়েছিল স্কুলে৷ এ আক্ষেপ তিনি ভুলতে পারেননি৷ একবার বাবাকে বলেছিলেন, তিনি যদি জীবনে অন্তত একটাও ছবি পরিচালনা করতে পারেন, তাহলে অনেক সুখী মানুষ হয়ে মৃত্যুবরণ করবেন৷ সেই সুখ তাঁর আয়নায় ছায়া ফেলেছিল কিনা জানা নেই, শুধু তাঁর সৃষ্টিসুখ আশ্চর্য প্রদীপ হয়ে রয়ে গেল বাংলা ছবির বরুণবাবুদের বন্ধু হয়ে৷
  • Link to this news (News18 বাংলা)