‘সামোসা আর শিঙাড়ার পার্থক্য জানো না...’, অনীক দত্তের সঙ্গে শেষ দেখা প্রসঙ্গে ভ্রাতৃপ্রতিম চিত্রনাট্যকার
এই সময় | ২৭ মে ২০২৬
দেব রায় (চিত্রনাট্যকার-পরিচালক)
অনীকদার সঙ্গে আমার পরিচয় বন্ধু অনিন্দ্যর (চন্দ্রবিন্দু-র অনিন্দ্য চট্টোপাধ্যায়) মাধ্যমে। অনীকদা একজন চিত্রনাট্যকার খুঁজছিলেন। আমি তার দু'-তিন বছর আগে দিল্লিতে ‘সিনেমায়া’ পত্রিকার আয়োজনে জ্যঁ ক্লদ ক্যারিয়ারের একটা স্ক্রিন রাইটিং ওয়ার্কশপ করার সুযোগ পেয়েছি। সুতরাং, বলাই বাহুল্য আলাপ জমতে বেশি সময় লাগল না।
অনীকদা তখন একের পর এক চমৎকার অ্যাড ফিল্ম করছেন। মূলত বিস্কুট, মশলা-টশলা এই সবের। কিন্তু ইচ্ছে, ফিচার ফিল্ম করার। ততদিনে বিজ্ঞাপনজগতে অনীকদার ভালোই সুনাম হয়েছে। কিন্তু মুশকিল হলো অনীকদার সঙ্গে ফিচার ফিল্ম করতে কোনও প্রোডিউসারই তেমন আগ্রহ দেখাচ্ছেন না। আমি অনীকদার ডোভার লেনের বাড়ি যেতে থাকলাম, সেখানে দেদার আড্ডা হয়। কোনও কোনও দিন সন্ধ্যায় পানাহারের ব্যবস্থাও থাকে। এই সব চলতে চলতেই কখন যেন আমি অনীকদার টিভিসিগুলোর জন্য আইডিয়েট করা শুরু করলাম। কোনওটা অনীকদার পছন্দ হয়, তো কোনওটা একেবারেই বেকার। মনে ধরলে বলতেন, ‘দেবব্রত (সবসময় ওই নামে ডাকতেন), ব্যাং অন’। আর পছন্দ না হলে বলতেন, ‘ধ্যুস’।
আর এই সব করতে গিয়ে মঁসিয়ে ক্যারিয়ার ওয়ার্কশপে স্ক্রিন রাইটিং কোলাবরেশনের সব চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে দিক, ওয়েভলেন্থ, সেটা টিউন হয়ে গেল। শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের একটা ছোটগল্প অনীকদার খুব পছন্দ ছিল, ‘আশ্চর্য প্রদীপ’। সেটা নিয়ে আইডিয়েট করা শুরু হলো। অনীকদা কিছুটা করে বলেন, আমি নোট নিই। আমি স্ক্রিপ্ট লিখে আনি। অনীকদা কোনও অংশে খুব খুশি, কোনওটা আবার ফেলে দিতে বলেন। আবার নতুন করে কিছু একটা সংযোজন করতে বললে, আমি হয়তো আপত্তি জানাই। এই ভাবে চলতে থাকে। ‘আশ্চর্য প্রদীপ’-এর স্ক্রিপ্ট রেডি হয়। কিন্তু প্রোডিউসার আর পাওয়া যায় না। তাই কাজ বন্ধ থাকে। মাঝে অনীকদার নিজের ভাবা অন্য একটা গল্প নিয়ে কিছু দিন আমরা নোট নেওয়া, লেখালেখি চলে।
কোনও এক জন্মদিনে হতাশ অনীকদা নাকি (ভাবতে অবাক লাগছে জাস্ট কিছু দিন আগে, ২২ মে, জন্মদিন গেল অনীকদার) সত্যজিৎ রায়ের ছবির সামনে দাঁড়িয়ে আক্ষেপের সুরে বলেছিলেন, ‘গুরু, আমার আর ছবি বানানো হলো না।’ যদিও এ কথা আমি পরে অনীকদার মুখে শুনেছি। তার পর এক সন্ধ্যায় অফিস ফেরার সময় অনীকদার বাড়ি গেলে ‘ভূতের ভবিষ্যৎ‘-এর গল্পটা বলেন। শুনে তৎক্ষণাৎ আমি বলেছিলাম, ‘অনীকদা, ব্যাং অন’। কিন্তু জানেন তো, মজার বিষয় হলো ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর মতো ছবি তৈরি হয়েও বছর দুয়েক রিলিজ় না হয়ে পড়েছিল।
এর পর ‘আশ্চর্য প্রদীপ’-এর প্রোডিউসার পেতে আর বেগ পেতে হয়নি। এই দু'টো ছবিতেই আমি সহকারী চিত্রনাট্যকার, মূল সংলাপ রচয়িতা এবং সহযোগী পরিচালক হিসেবে কাজ করেছি। নতুনদের অভিনয় দেখানোর ব্যাপারেও অনীকদা আমার উপর ভরসা করতেন। ওই দু'টো ছবিতেই আমাকে দিয়ে অভিনয় করিয়ে নিয়েছিলেন। এর পরে অনীকদার সঙ্গে লেখা বা সহযোগী পরিচালক হিসেবে আর কাজ করা হয়ে ওঠেনি। মাঝে খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। উপরন্তু শেষ ছবিটার শুটিং বার বার পিছিয়ে যাওয়া নিয়েও মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। আমি একদিন সন্ধ্যায় ওঁর ডোভার লেনের বাড়িতে গেলাম দেখা করতে। দেখি একেবারে শয্যাশায়ী। ঘরে ছড়িয়ে রয়েছে অক্সিজেন সিলিন্ডার, নেবুলাইজ়ার। আমাকে দেখে বললেন, ‘দেবব্রত, শিঙাড়া খাবে?’
বুঝলাম, রেস্ট্রিকশনে আছেন। তাই উল্টোপাল্টা খাবার খাওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে। আমি বারণ করাতে একগাল হেসে বললেন, ‘আমার শিঙাড়া খেতে বাধা নেই।’ কাজের লোককে দিয়ে শিঙাড়া আনালেন। সে আনবি তো আন, মুখের সামনে সামোসা এনে হাজির করেছে। তাই দেখে অনীকদা শরীরের অবস্থা ভুলে গিয়ে, শিঙাড়া কাকে বলে বোঝাতে শুরু করলেন: ‘সামোসা আর শিঙাড়ার মধ্যে পার্থক্য জানো না।’ আমি দেখলাম মহাবিপদ। বললাম, ‘থাক না, অনীকদা। গরম আছে, খেয়ে নিই’।