ছকভেঙে ‘অপরাজিত’, হাস্যরস-রহস্যে মোড়া অনীকের এসব ছবি দাগ কেটেছে দর্শকমনে
প্রতিদিন | ২৭ মে ২০২৬
মাত্র কয়েকটি ছবি, সেখানেই স্বকীয়তা দেখিয়েছিলেন অনীক দত্ত। তীক্ষ্ণ রসবোধকে হাতিয়ার করে স্যাটায়ারের মোড়কে সমাজকে আয়না দেখিয়েছিলেন অনীক দত্ত। ২০১২ সালে মুক্তি পায় 'ভূতের ভবিষ্যৎ'। আর ডেবিউ ছবিতেই লেটার মার্কস পেয়েছিলেন পরিচালক অনীক দত্ত। বলা ভালো ছকভাঙা চিত্রনাট্যে নতুন করে বাঙালি দর্শককে ভাবতে শিখিয়েছিলেন তিনি।
অনীক দত্তের কাজ শুরু বিজ্ঞাপনের দুনিয়া থেকে। কলকাতার নামী বিজ্ঞাপন সংস্থায় দীর্ঘদিন কপিরাইটার ও ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেছেন। সেখান থেকেই তাঁর গল্প বলার দক্ষতা তৈরি হয়। তাছাড়া ছাত্রজীবন থেকেই সাহিত্য-সিনেমা ও নাটকের প্রতি অনুরাগ ছিল তাঁর। শহুরে সেসব উপজীব্য করেই স্যাটায়ারের মোড়কে সমাজকে আয়না দেখিয়েছিলেন অনীক দত্ত।
পুরনো কলকাতায় সদ্য গজানো প্রোমোটারি ব্যবসার বাড়বাড়ন্ত, পাড়ার মস্তান কী নেই 'ভূতের ভবিষ্যৎ' ছবিতে? ভূতে-মানুষে প্রেম-বিরহের এহেন ড্রামাটিক গল্প একমাত্র তিনিই দেখিয়েছিলেন বাঙালি দর্শককে। যে ব্যঙ্গাত্মক ছবি আজও জনপ্রিয় দর্শকমনে। ছবির গল্প আবর্তিত হয়েছে এক পুরনো জমিদারবাড়ি ও সেখানে থাকা নানাযুগের ভূতদের ঘিরে। ইংরেজ আমল থেকে নকশাল আন্দোলনের সময়কার চরিত্রের মধ্য দিয়ে শহরের ঐতিহ্য-সংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা তুলে ধরেন তিনি।
অনীক দত্তের 'আশ্চর্য প্রদীপ' মনের সেই গহীন অন্ধকারে আলো ফেলে যেখানে ক্ষমতার কালো ছায়ার আস্ফালনে ঢাকা পড়ে বিবেকের আলো! শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের উপন্যাস অবলম্বনে এক সাধারণ মধ্যবিত্ত মানুষের আচম্বিতে বদলে যাওয়া জীবনের গল্প দেখিয়েছিলেন। আলাদ্দিনের 'জিন' যদি হঠাৎ কারও জীবনে ধরা দেয়, সেক্ষেত্রে মাত্রাতিরিক্ত চাহিদায় কী পরিণতি হতে পারে? 'আশ্চর্য প্রদীপ' সেকথাই বলে। ফ্যান্টাসি- বাস্তবতার মিশেলে এই ছবি সামাজিক বার্তা দেয়।
এরপর সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়কে সঙ্গী করে রামাপদ চৌধুরীর গল্প অবলম্বনে অনীক তৈরি করেন 'বরুণবাবুর বন্ধু' ছবিটি। এক অবসরপ্রাপ্ত মানুষের মননজগতের গল্প। কালের নিয়মে পরিবার, বন্ধুত্ব ও সামাজিক যোগাযোগের যে দূরত্ব তৈরি হয়, সেটাই ছবির মূল বিষয়। হঠাৎ এক পুরনো বন্ধুর আগমনে বরুণবাবুর জীবনে কীভাবে নতুন আলো আসে? শেষজীবনের একাকিত্ব, স্মৃতি ও বার্ধক্যের আবেগে ফুটিয়ে তুলেছেন অনীক।
‘অপরাজিত’ অনীক দত্তের অন্যতম প্রশংসিত সিনেমা, যেখানে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ তৈরির সংগ্রামের গল্প দেখানো হয়েছে। অর্থের অভাব, অনভিজ্ঞ টিম, শুটিংয়ের সমস্যা— সব বাধা পেরিয়ে কীভাবে এক যুগান্তকারী বাংলা সিনেমা তৈরি হয়। সেটাই এই ছবিতে ফুটে উঠেছে। সাদা-কালো চিত্রগ্রহণ ছবিটিকে আরও নস্ট্যালজিক করে তুলেছে। বাংলা সিনেমার ইতিহাসে অনীকের ‘অপরাজিত’ যে এক অনন্য অভিজ্ঞতা, তা বলতেই হয়।
অনীকের শেষ ছবি 'যত কাণ্ড কলকাতাতেই'। বহু বছর আগের এক অমীমাংসিত রহস্যের সূত্র খুঁজতে গিয়ে এক তরুণ অনুসন্ধানকারী জড়িয়ে পড়ে এমন এক ঘটনায়, যার সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে পুরনো কলকাতার ইতিহাস, দুর্গাপুজোর আবহ এবং ফেলুদা-ধাঁচের তদন্তের স্বাদ। অনীকের এই ছবিতে কলকাতাই যেন এক চরিত্র। রহস্য, নস্ট্যালজিয়া এবং কলকাতার আবহ- এই তিন উপকরণের মিশ্রণেই তৈরি হয়েছে ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’।