একেই তীব্র গরম তায় আবার সন্তানের গরমের ছুটি, এই মরশুমে কি আর ঘরে মন টেকে? কিন্তু কোথায় যাবেন? এই গরমে সমুদ্রের ধারে ঘেমে নেয়ে সারা শরীরে ট্যান নিতে অনিচ্ছুক অনেকেই। এদিকে পাহাড় মানেই অনেকের কাছে শুধু দার্জিলিং বা গ্যাংটক। সেই সব জায়গায় তো এখন ঠেসে ভিড়। আগে থেকে প্ল্যান করে বুকিং করা না থাকলে থাকার জায়গা পাওয়াই দায়। তার উপর দু’দিনের ছুটিতে এই সব ভিড়ভাট্টা থেকে একটু মুক্তি চাইলে, ঘুরে আসতে পারেন পশ্চিম সিকিমের ছোট্ট গ্রাম বিকস্থাং। সবুজ পাহাড়, মেঘে ঢাকা উপত্যকা, কাঞ্চনজঙ্ঘার অপূর্ব দৃশ্য আর নিরিবিলি পরিবেশ— সব মিলিয়ে বিকস্থাং যেন এক অজানা স্বর্গ। শহরের কোলাহল থেকে কয়েক দিনের মুক্তি চাইলে এই গ্রাম হতে পারে আদর্শ উইকএন্ড ডেস্টিনেশন।
বিকস্থাং শব্দটির উৎপত্তির পিছনে দুটি ভিন্ন সংস্কৃতির দারুণ গল্প রয়েছে। লেপচা লোককথা অনুযায়ী, এটি এসেছে ‘বিকমন’ শব্দ থেকে, যার অর্থ ‘যে স্থানে বাঘে গোরু খেয়েছিল’। অন্যদিকে, ভুটিয়া সম্প্রদায়ের মতে, বিকস্থাং মানে ‘বিশেষ ও বৈচিত্র্যময় পাথরে ঘেরা এক স্থান’। জানা যায় এখানে নাকি নানা ধরনের বিশেষ বিশেষ পাথর পাওয়া যেত। ইতিহাস আর প্রকৃতির মেলবন্ধনে এই পাহাড়ি গ্রাম আজও নিজের স্বকীয়তা ধরে রেখেছে।
গ্যাংটক থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে এবং সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ৪,১০০ ফুট উঁচুতে অবস্থিত এই জনপদ। আকাশ পরিষ্কার থাকলে দেখা মেলে কাঞ্চনজঙ্ঘা পর্বতমালার চোখ ধাঁধানো দৃশ্য। সূর্যের প্রথম আলো যখন বরফঢাকা পাহাড় চুঁইয়ে নীচে নেমে আসে, তা কিন্তু ‘এল ডো রাডো’র থেকে কম কিছু নয়। চারপাশে কমলালেবুর বাগান, এলাচ চাষ হচ্ছে, পাইন বন আর পাখির ডাক মিলিয়ে এক অপূর্ব পরিবেশ।
যাঁরা অফবিট ট্রাভেল পছন্দ করেন এবং ভিড় এড়িয়ে প্রকৃতির মাঝে শান্ত সময় কাটাতে চান, তাঁদের জন্য বিকস্থাং আদর্শ। এখানে বিলাসবহুল পর্যটনের চাকচিক্য নেই, আছে পাহাড়ি গ্রামের সরল জীবনযাপন। হোমস্টেতে থাকলে কাছ থেকে সিকিমের স্থানীয় সংস্কৃতি, খাবার এবং মানুষের আতিথেয়তা অনুভব করা যায়। ঘন পাইন-ওকের বনে ঘেরা এই গ্রাম পক্ষীপ্রেমীদের স্বর্গরাজ্য। হিমালয় অঞ্চলের নানা দুর্লভ পাখিদের দেখা মেলে।
বিকস্থাংয়ের কাছেই রয়েছে পেলিং, রিনচেনপং এবং কালুকের মতো জনপ্রিয় গন্তব্য। সময় থাকলে এই জায়গাগুলিও ঘুরে দেখা যেতে পারে।
বিশেষ করে রিনচেনপংয়ের সূর্যাস্ত দেখার অভিজ্ঞতাও অনবদ্য। মাত্র ১৫ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই যমজ গ্রাম, রিনচেনপং ও কালুক কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য এবং বিষাক্ত লেক (Poison Pokhri)-এর জন্য বিখ্যাত।
পেলিংয়ের স্কাইওয়াক পর্যটকদের আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু। এশিয়ার অন্যতম সর্বোচ্চ ঝুলন্ত সেতু, যা রোমাঞ্চপ্রিয় মানুষদের দারুণ পছন্দ হবে।
কলকাতা থেকে বিকস্থাংয়ের দূরত্ব প্রায় ৬৬৪ কিলোমিটার। প্রথমে ট্রেনে বা বিমানে নিউ জলপাইগুড়ি কিংবা বাগডোগরা পৌঁছতে হবে। সেখান থেকে গাড়িতে শিলিগুড়ি হয়ে জোরেথাং যেতে হবে। জোরেথাং থেকে শেয়ার গাড়ি বা রিজার্ভ গাড়িতে সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় বিকস্থাংয়ে। থাকার জন্য এখানে চমৎকার কিছু ইকো-রিসর্ট এবং হোমস্টে পেয়ে যাবেন।
অক্টোবর থেকে মে মাস বিকস্থাং ভ্রমণের সেরা সময়। এই সময় আকাশ পরিষ্কার থাকে এবং কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য সবচেয়ে ভালো দেখা যায়। শীতকালে ঠান্ডা বেশি লাগলেও প্রকৃতির সৌন্দর্য তখন অন্য মাত্রা পায়।