সদ্য দেশ স্বাধীন হয়েছে। উন্মাদনায় টগবগ করছে গোটা দেশ। শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় তখন বেজায় ব্যস্ত। বার বার দিল্লিতে ছুটছেন। তার মধ্যেও সময় বের করে ভাইপো জনতোষ মুখোপাধ্যায়ের অন্নপ্রাশনে এসেছিলেন তিনি। হুগলির বলাগড়ের বাড়ি হয়ে উঠেছিল বাংলার নবজাগরণের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। নিমন্ত্রিত ছিলেন বিধানচন্দ্র রায়, সুরস্রষ্টা পঙ্কজ মল্লিকরা। কিন্তু কালের গ্রাসে আজ সেই বাড়ির জরাজীর্ণ অবস্থা। পলেস্তরা খসে পড়ছে। চারপাশে আগাছা। রাজ্যে পালাবদলের পরে ফের আশায় বুক বাঁধছেন বলাগড়বাসী। তাঁরা চাইছেন, শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতি বিজড়িত সেই বাড়ি এ বার সারানো হোক।
বাংলার বাঘ আশুতোষ মুখোপাধ্যায়ের চার সন্তান। শ্যামাপ্রসাদ, বামা প্রসাদ, উমাপ্রসাদ, রমাপ্রসাদ। বলাগড়ের জিরাটে বামা প্রসাদের বাড়ি। সেটা ১৯৫২ সাল। জনতোষের অন্নপ্রাশনে সরগরম হয়ে উঠেছিল সেই বাড়ি। উপস্থিত হয়েছিলেন বাংলার উজ্জ্বল নক্ষত্ররা। কিন্তু এখন সে সব শুধুই স্মৃতি। জানলার কাচ নেই, লোহার গ্রিলে মরচে ধরেছে। দেওয়ালের ছবিতে ধুলোর মোটা পরত। এখনও মাঝে মধ্যে এই বাড়িতে আসেন জনতোষের ছেলে বাণীপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়।
সে দিন বাণীপ্রসাদের জন্ম হয়নি। তবে আত্মীয়-স্বজনের সে দিনের ঘটনার কথা অনেক শুনেছেন তিনি। চোখের সামনে যেন সব দেখতে পান। তিনি বললেন, ‘বাবার অন্নপ্রাশনে শ্যামাপ্রসাদ এসেছিলেন। ঠাকুমার মুখে শুনেছি, সেটাই শেষ। তার পরে আর পরিবারের সঙ্গে দেখা হয়নি তাঁর।’ বলাগড় কলেজের শিক্ষক তথা ইতিহাসবিদ পার্থ চট্টোপাধ্যায়ও শ্যামাপ্রসাদের স্মৃতিতে আচ্ছন্ন। এখানে শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক ভিটেও রয়েছে। তিনি বললেন, ‘সেই বাড়িটিরও সংস্কার প্রয়োজন। এতে বলাগড়ের সবাই খুশি হবেন।’
ভোটে জেতার পরেই শ্যামাপ্রসাদের মূর্তিতে মালা দিতে গিয়েছিলেন বলাগড়ের বিধায়ক সুমনা সরকার। ভোটের আগে ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে শ্যামাপ্রসাদের পৈতৃক ভিটে সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ। সেই প্রসঙ্গ টেনে তিনি বললেন, ‘এই নিয়ে ইতিমধ্যেই আমরা মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর সঙ্গে আলোচনা করেছি। আগের সরকার কিছুই করেনি। শ্যামাপ্রসাদকে নিয়ে আমাদের পরিকল্পনা রয়েছে। মুখে কিছু বলতে চাই না। কাজে করে দেখাব।’
অতীতের গৌরব আর বর্তমানের ক্ষয়ের মাঝখানে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে বলাগড়বাসী। খুব শীঘ্রই আবার নতুন করে প্রাণ ফিরে পাবে সেই বাড়ি— যেখানে একদিন অন্নপ্রাশনের নিমন্ত্রণে এসে বসেছিল ইতিহাস নিজেই।