এই সময়: ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা ‘সার’ প্রক্রিয়ার আইনি বৈধতায় সিলমোহর দিল সুপ্রিম কোর্ট। তারা স্পষ্ট জানিয়ে দিল, নির্বাচনের স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা বাড়াতেই এই পদক্ষেপ করা হয়েছে। এটি জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের পরিপন্থী নয়। বরং এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ওই আইনে ‘নতুন প্রাণের সঞ্চার’ হয়েছে। শীর্ষ আদালতের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি বিপুল এম পাঞ্চোলির বেঞ্চে এই মামলার শুনানি শেষ হয়েছিল গত জানুয়ারিতেই। তবে রায়দান রিজ়ার্ভ ছিল। এ দিন সেই মামলারই রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট।
তবে এই রায় দিতে গিয়ে সুপ্রিম কোর্ট এও জানিয়েছে, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া মানেই তাঁদের নাগরিকত্ব খারিজ হয়ে গেল এমনটা নয়। এই বাদ পড়া ভোটারদের তালিকা তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের কাছে চার সপ্তাহের মধ্যে পাঠাতে হবে। তারা আগামী বিধানসভা বা লোকসভা বিধানসভা ভোটের আগে তাঁদের বিষয়টি চূড়ান্ত করবে। ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া ব্যক্তিরা যে সব সরকারি সুযোগ–সুবিধা পেতেন, সেটাও এখনই বাদ যাবে না বলে জানিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। এই ব্যাপারে কেন্দ্রীয় সরকারই সিদ্ধান্ত নেবে। ‘সার’ প্রক্রিয়াটিকে আইনি বৈধতা দিলেও, সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, নথি যাচাই করার ক্ষেত্রে কমিশনের নিজস্ব বিচক্ষণতা প্রয়োগের ক্ষমতা থাকলেও তা যেন ‘সীমাহীন’ না হয়। নির্বাচনী স্বচ্ছতা বজায় রাখার মূল লক্ষ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই যাচাই প্রক্রিয়া চালাতে হবে বলে স্পষ্ট করেছে শীর্ষ আদালত।
বিহারে ‘সার’ প্রক্রিয়া শুরুর সময়েই দেশের নির্বাচন কমিশনের বিজ্ঞপ্তিকে চ্যালেঞ্জ করে শীর্ষ কোর্টের দ্বারস্থ হয়েছিল স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘অ্যাসোসিয়েশন ফর ডেমোক্র্যাটিক রিফর্মস’ (এডিআর), মহুয়া মৈত্র, কেসি বেণুগোপাল, সুপ্রিয়া সুলে, যোগেন্দ্র যাদবের মধ্যে বিভিন্ন বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা–নেত্রী এবং তথাকথিত অরাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। সেই সব মামলাগুলির একযোগে শুনানি করে শীর্ষ আদালত। পরে পশ্চিমবঙ্গে ‘সার’ শুরু হলে আরও একগুচ্ছ মামলা দায়ের হয়েছিল। সেখানেও ‘সার’ প্রক্রিয়ার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করেছিল রাজ্যের তৎকালীন শাসকদল তৃণমূল। বস্তুত বাংলায় এ বারের বিধানসভা নির্বাচনে ‘সার’–ই ছিল অন্যতম প্রধান ইস্যু। সব মিলিয়ে প্রায় ৯১ লক্ষ নাম বাদ পড়াকে হাতিয়ার করে কমিশন ও কেন্দ্রের বিজেপি সরকারকে নিশানা করেছিলেন জোড়াফুল নেতৃত্ব। এ দিন সুপ্রিম–রায়ে স্পষ্ট হয়ে গেল তৃণমূল, কংগ্রেস সমেত বিরোধী দলগুলির মূল যুক্তি খারিজ করে দিয়েছে দেশের সর্বোচ্চ আদালত।
নির্বাচন কমিশনের এক্তিয়ার ও ‘সার’–এর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে যে সব যুক্তি তুলে ধরা হয়েছিল কোর্টে, সেগুলিকে মূলত চারটি প্রশ্নে ভাগ করে রায় দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট — প্রথম, এই পদক্ষেপ করার আইনি এক্তিয়ার কমিশনের আছে কি না, দ্বিতীয়, প্রক্রিয়াটি যুক্তিসঙ্গত কি না, তৃতীয়, এটি সংবিধানের ৩২৪ অনুচ্ছেদ ও ১৯৫০–এর জনপ্রতিনিধিত্ব আইন লঙ্ঘন করে কি না এবং চতুর্থ, ভোটার তালিকায় নাম তোলার ক্ষেত্রে কমিশন কারও নাগরিকত্ব যাচাই করতে পারে কি না।
বেঞ্চের পর্যবেক্ষণ, ‘অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচনের যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে, ‘সার’ প্রক্রিয়া তাকে ব্যাহত করে না। বরং সেই লক্ষ্যপূরণকেই আরও ত্বরান্বিত করে।’ আদালত আরও জানিয়েছে, কমিশনের এই পদক্ষেপ মোটেই ‘মাত্রাতিরিক্ত’ বা ‘খামখেয়ালি’ নয়, কাউকে ইচ্ছাকৃত বা অযৌক্তিক ভাবে তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার মতো ফাঁকও নেই এতে। পর্যাপ্ত আইনি সুরক্ষাকবচ রেখেই পুরো প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করা হয়েছে। আদালতের বক্তব্য, ‘সংবিধানের ৩২৪ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী সার করার ক্ষমতা কমিশনের আছে। কমিশন তার বিধিবদ্ধ ক্ষমতার সীমা লঙ্ঘন করে কোনও পদক্ষেপ করেছে, এ কথা বলার অবকাশ নেই। ভোটার তালিকার যথার্থতা এবং বিশ্বাসযোগ্যতার উপরে নির্ভর করে নির্বাচন। এটাই গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ভিত্তি।’ কমিশন নিজেদের আইনি ক্ষমতার বাইরে গিয়ে কাজ করেছে— এমনটা মানতে নারাজ আদালত। শীর্ষ আদালত জানিয়েছে, তালিকা থেকে নাম বাদ যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে শো–কজ় বা কারণ দর্শানোর নোটিস দেওয়ার মতো আইনি রক্ষাকবচও এই প্রক্রিয়ায় রয়েছে। তাই এটি কোনও ভাবেই জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের পরিপন্থী নয়।
বিহারে ‘সার’–এর সময়ে ১১টি নথির যে কোনও একটি দেখানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছিল প্রথমে। পরে আদালতের নির্দেশে আধার কার্ডকে একটি নথি হিসেবে শর্তসাপেক্ষে যুক্ত করা হয়। এ দিন আদালত জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় নাম রাখার জন্য কী কী নথি প্রয়োজন, তা ঠিক করার এক্তিয়ার রয়েছে কমিশনের। একজন ভোটারকে ভোটার তালিকায় রাখা হবে কি না, তা ঠিক করতে পারে কমিশনই। শুধুমাত্র ভারতীয় নাগরিকরাই এ দেশের ভোটার হতে পারেন বলে আদালতে জানিয়েছিল কমিশন। কিন্তু নাগরিকত্ব যাচাইয়ের অধিকার আদৌ কমিশনের আছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন আবেদনকারীরা। এ দিন আদালত জানিয়েছে, নাগরিকত্ব যাচাইয়ের দায়িত্ব কেন্দ্রের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রকের। তবে ভোটার তালিকায় নাম রাখার জন্য কেউ নাগরিক কি না, তা দেখতে পারে কমিশন। বেঞ্চের বক্তব্য, ‘যাঁদের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ গিয়েছে, সেই তালিকা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রক যেমন— কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক বা বিদেশ মন্ত্রকের কাছে কমিশনকে পাঠাতে হবে চার সপ্তাহের মধ্যে। সেই নামগুলি নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারত সরকার।’
নাগরিকত্বের বিষয়ে আদালত জানিয়েছে, নাগরিকত্ব না থাকার জন্য ভোটার তালিকা থেকে কারও নাম বাদ দিতে পারে কমিশন। তবে সেক্ষেত্রে শুধুমাত্র ভোটার তালিকা থেকেই নাম বাদ যাবে। অন্যান্য সুবিধা তাঁরা পাবেন কি না, কী পদক্ষেপ করা হবে তাঁদের নিয়ে, সেই সিদ্ধান্ত ভারত সরকারের উপরে ন্যস্ত। তাই বাদ যাওয়া নামগুলি কেন্দ্রকে পাঠাতে হবে।