কারও জন্ম ভারতেই-কেউ দিয়েছেন ভোটও, হাকিমপুরে এখন বাংলাদেশ ফেরার অপেক্ষায় সালাম-হিদয় মোল্লারা
আজ তক | ২৮ মে ২০২৬
রাজ্যে রাজনৈতিক পটপরিবর্তন ও নতুন সরকার গঠনের পর থেকেই সীমান্ত এলাকায় অনুপ্রবেশ রুখতে নজিরবিহীন তৎপরতা শুরু হয়েছে । রাজ্যে বসবাসকারী অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে অবিলম্বে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর তোরজোড় শুরু করে দিয়েছে শুভেন্দু অধিকারীর সরকার । মুখ্যমন্ত্রীর এই সংক্রান্ত ঘোষণার পর থেকেই উত্তর চব্বিশ পরগনার স্বরূপনগর থানা এলাকায় হাকিমপুর চেকপোস্ট সংলগ্ন সীমান্তে এক অভূতপূর্ব পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে । আইনি জটিলতা ও প্রশাসনিক কড়া ব্যবস্থা থেকে বাঁচতে গত কয়েকদিন ধরে শয়ে শয়ে বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারী ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনীর কাছে এসে আত্মসমর্পণ করতে শুরু করেছেন। গত মঙ্গলবার থেকেই হাকিমপুর সীমান্তে বাংলাদেশি অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের ভিড় দেখা যাচ্ছে। স্বরূপনগরের বিথারী-হাকিমপুর সীমান্তে বৃহস্পতিবারও ভিড় জমালেন শতাধিক বাংলাদেশি নাগরিক । গত ৭২ ঘণ্টায় সীমান্ত এলাকায় প্রায় সাড়ে তিনশো বাংলাদেশির উপস্থিতির খবর মিলেছে। তাঁদের মধ্যে প্রায় ২৫০ জনকে স্বরূপনগর ও বাদুড়িয়ার বিভিন্ন হোল্ডিং সেন্টারে রাখা হয়েছে বলে প্রশাসন সূত্রে জানা গিয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও বিএসএফ সূত্রের দাবি, এই বাংলাদেশিদের পরিচয় ও নথিপত্র খতিয়ে দেখা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই বাংলাদেশে এক নাম এবং ভারতে অন্য নামে থাকার অভিযোগ উঠে এসেছে। কারও কাছে পর্যাপ্ত নথি নেই, আবার কেউ দীর্ঘদিন ধরে ভুয়ো পরিচয়ে এ দেশে বসবাস করেছেন বলেও অভিযোগ। প্রশাসনের দাবি, এঁদের মধ্যে কেউ ২ বছর, কেউ ৫ বছর, আবার কেউ বা প্রায় এক দশক আগে দালালের মাধ্যমে জলপথ বা স্থলপথে সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে ঢুকেছিলেন। অভিযোগ, এ দেশে এসে তাঁরা বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের সুবিধাও নিয়েছেন। যা সম্পূর্ণ বেআইনি বলেই দাবি প্রশাসনের একাংশের।
বর্তমানে প্রত্যেকের নথি যাচাইয়ের কাজ চলছে। বিএসএফ, জেলা প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট দফতরগুলির যৌথ তৎপরতায় চিহ্নিতকরণের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। যাচাই প্রক্রিয়া শেষ হলেই তাঁদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে বলে প্রশাসনিক সূত্রে ইঙ্গিত।
তবে হোল্ডিং সেন্টারে থাকা ব্যক্তিদের জন্য আন্তর্জাতিক মানবাধিকার বিধি মেনেই ব্যবস্থা করা হয়েছে বলে দাবি প্রশাসনের। সেখানে খাবার, স্বাস্থ্যপরীক্ষা ও নিরাপত্তার ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। যাতে দেশে ফেরার আগে কেউ অসুস্থতা বা নিরাপত্তাহীনতায় না ভোগেন, সে দিকেও নজর রাখা হচ্ছে।
হাকিমপুর সীমান্তে এখন ভয় ও অনিশ্চয়তা বিরাজ করছে। কর্তৃপক্ষের ক্রমবর্ধমান চাপ এবং রাজ্যজুড়ে অবৈধ অভিবাসীদের জন্য হোল্ডিং সেন্টার তৈরির মধ্যেই এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। ব্যাগ, কম্বল ও পরিচয়পত্র নিয়ে, যে পরিবারগুলো ভারতে বছরের পর বছর কাটিয়েছে, তারা এখন নিজেদের দেশে ফিরে যাওয়ার জন্য সীমান্তের কাছে অপেক্ষা করছে।
হাকিমপুর সীমান্ত চৌকিতে পুলিশ একটি রেজিস্ট্রেশন ডেস্ক তৈরি করেছে, যেখানে আগতদের বিবরণ নথিভুক্ত করা হচ্ছে। অভিবাসীদের হোল্ডিং সেন্টার তৈরির আগে কর্মকর্তারা বাংলাদেশিদের কাগজপত্র যাচাই করছেন এবং একটি ডেটাবেস প্রস্তুত করছেন। কর্মকর্তাদের মতে, সোমবার থেকে ৩৫০ জনেরও বেশি বাংলাদেশির নথি প্রস্তুত করা হয়েছে। বুধবার সীমান্তে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ জন লোক উপস্থিত ছিলেন, যাঁদের মধ্যে অনেকেই কলকাতার নিউ টাউন, হাতিয়ারা, খড়দহ, দমদম ও ডানকুনি এলাকার বাসিন্দা। তাঁদের অধিকাংশই স্বীকার করেছেন, তাঁরা কাজের সন্ধানে বছরের পর বছর ধরে দালাল বা মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে অবৈধভাবে ভারতে প্রবেশ করেছেন।
'আমরা গরীব মানুষ। তাই এখানে এসেছি,' বললেন কাঠমিস্ত্রি সালাম ডালি। তিনি জানান, প্রায় পাঁচ বছর আগে এক দালালকে ৮,০০০-১০,০০০ টাকা দিয়ে তিনি বাংলাদেশের খুলনা জেলা থেকে ভারতে আসেন। 'আমাদের কাছে কাগজপত্র না থাকায় সরকার আমাদের চলে যেতে বলেছে। তাই এখন আমরা চলে যাচ্ছি', স্ত্রী ও সন্তানকে নিয়ে সীমান্তের কাছে অপেক্ষা করার সময় তিনি বলেন।
বেশ কয়েকজন অভিবাসী বলেছেন, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে পরিস্থিতি তীব্রভাবে বদলে গেছে এবং পুলিশের নজরদারি, কাগজপত্র তল্লাশি ও আটক হওয়ার ভয় তাদের এলাকা ছাড়তে বাধ্য করছে। ২০০৩ সালে জন্ম নেওয়া হিদয় মোল্লা নামের এক যুবক, যিনি দাবি করেছেন, ২০০১ সালে তাঁর বাবা-মা বাংলাদেশ থেকে চলে আসার পর তিনি মধ্যমগ্রামে বড় হয়েছেন। হিদয় দাবি করেছেন, স্থানীয় পুলিশ বারবার তাঁর কাছে ২০০২ সালের আগের বসবাসের প্রমাণ চেয়েছে। 'আমার জন্ম ২০০৩ সালে। আমার বাবা-মা পুরোপুরি অশিক্ষিত। তাঁরা এ বি সি ডি-ও জানেন না। তাঁরা কীভাবে কাগজপত্র তৈরি করবেন?' বলছেব ওই যুবক। ওই যুবকের আরও বক্তব্য, তাঁর আধার, প্যান, রেশন কার্ড ও স্কুল সার্টিফিকেট থাকা সত্ত্বেও ভোটার আইডির আবেদন একাধিকবার প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। 'আমি এখানেই বড় হয়েছি। এই সংস্কৃতি আমার সত্তার অংশ। আমার বাবা-মায়ের মনে হচ্ছে তাঁরা নিজেদের দেশে ফিরছেন, কিন্তু আমার কাছে মনে হচ্ছে যেন আমরা নিজেদের দেশ ছেড়ে অন্য দেশে যাচ্ছি,' জানান হিদয়।
যুবকের প্রশ্ন, আমরা কী ভুল করেছি? ভুলটা ছিল আমাদের বাবা-মায়ের। তাঁরাই আমাদের এখানে নিয়ে এসেছেন। তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে কোনও জমি বা আত্মীয়স্বজন নেই। 'আমি সেখানে কী করব? কোনও বন্ধু নেই, আমার কোনও ভবিষ্যৎও নেই।'
সীমান্তের কাছে জড়ো হওয়া মানুষদের মধ্যে ছিলেন খড়দহের দৃষ্টিহীন পরিবার—মহম্মদ শামসুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আসিয়া খাতুন এবং ভাই বিলাল—তাঁরা সবাই অন্ধ এবং কলকাতার ট্রেনে ও রাস্তায় ভিক্ষা করে জীবনধারণ করতেন। 'আমরা কর্তৃপক্ষকে অবিলম্বে আমাদের ফেরত পাঠানোর অনুরোধ করছি,' রহমান বলেন। পরিবারটি দাবি করেছে, তারা এক দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতে বসবাস করে আসছে এবং খড়দহ এলাকায় থাকাকালীন আধার ও অন্যান্য নথি তৈরি করেছিল।
আরেক অভিবাসী মোহাম্মদ আলী মুন্সি, যিনি দাবি করেন যে কয়েক দশক আগে তার বাবা সীমান্ত পার হওয়ার পর তিনি ভারতে জন্মগ্রহণ করেছিলেন, বলেন, ভয় ও চাপের কারণে পরিবার দেশ ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে। আমার আধার আর রেশন কার্ড ছিল। আমি সবকিছু পেছনে ফেলে এসেছি, কারণ এগুলোর কোনওটিই এখন আর কাজে লাগবে না।
বাংলাদেশের খুলনা জেলার বাসিন্দা মাফুজা খাতুন জানান যে তিনি বহু বছর ভারতে বসবাস করেছেন এবং একাধিকবার নির্বাচনে ভোট দিয়েছেন। তিনি দাবি করেছেন, তিনি স্থানীয় রাজনৈতিক ও পৌরসভা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আধার ও ভোটার আইডি কার্ড তৈরি করিয়েছিলেন। 'আমরা বছরের পর বছর ধরে এখানে ভোট দিয়েছি। এখন আমাদের ভোটার আইডি বাতিল করে দেওয়া হয়েছে,' তিনি বলেন।
সীমান্তের অনেক মহিলা জানিয়েছেন, ভাড়া বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হওয়ার আগে তাঁরা কলকাতার উপকণ্ঠে গৃহকর্মী, আবর্জনা সংগ্রাহক ও শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। বেশ কয়েকজন অভিবাসী স্বীকার করেছেন, তাঁরা উভয় দিকে সক্রিয় দালালদের মাধ্যমে অবৈধভাবে সীমান্ত পার হয়েছিলেন। তাঁদের মধ্যে কেউ কেউ বলেছেন, শৈশবে তাঁদের ভারতে আনা হয়েছিল এবং বাংলাদেশ সম্পর্কে তাঁদের তেমন কোনও স্মৃতি নেই।
কর্তৃপক্ষ হাকিমপুরে আসা অনেককে উত্তর ২৪ পরগনা জেলা জুড়ে তৈরি হওয়া অস্থায়ী হোল্ডিং সেন্টারে স্থানান্তর করেছে। সবচেয়ে বড় কেন্দ্রটি তেঁতুলিয়ায় পথের সাথী ভবনের ভেতরে তৈরি করা হয়েছে, যেখানে কর্মকর্তারা জানিয়েছেন বর্তমানে ১১৬ জন বাংলাদেশিকে রাখা হয়েছে। খাদ্য, চিকিৎসা ও নিরাপত্তার জন্য ওই কেন্দ্রে স্বাস্থ্য বিভাগের দল, বাবুর্চি ও পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, জেলায় আরও হোল্ডিং সেন্টার প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং হাকিমপুরে জড়ো হওয়াদের শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।