• খুরের নাল দিয়ে তৈরি আংটি নকল নয় আসল, প্রমাণ করতে ঘোড়া নিয়েই কলকাতা ঘোরেন বিক্রেতা
    বর্তমান | ২৮ মে ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: নকল নয় আসল। আংটি একদম খাঁটি। এই দাবি প্রমাণ করতে আস্ত একটা ঘোড়া নিয়ে শহরে ঘুরে বেড়ান শান্তি কর্মকার।ঘোড়ার নালের আংটি আঙুলে পরলে নাকি উপকার হয়! শরীর-স্বাস্থ্য ঠিক থাকে! গ্রহ নক্ষত্রের কুপ্রভাব গায়ে লাগে না! ‘ঘনঘন পেট খারাপ হয়, অনামিকায় পরে নিন আংটি। ঠিক হয়ে যাবে। প্রতিবেশী খুব হিংসে করে, আংটি তর্জনিতে গলিয়ে নিন। তিনি কাছে চলে আসবেন। পয়সাকড়ি বিশেষ আসছে না, মধ্যমায় পরতে হবে আংটি। প্রেমে বাধা, আংটির প্রভাবে ভালোবাসার মানুষটি হবেন গদগদ। তবে হ্যাঁ, আংটি হতে হবে খাঁটি। ঘোড়ার নালের লোহা কেটে বানাতে হবে।’ অনর্গল এইসব দাবি রাস্তায় দাঁড়িয়ে করে যান শান্তিবাবু। তখন ঘোড়াটি প্রায় স্ট্যাচুর মতো দাড়িয়ে থাকে। কদাচিৎ ঘাড় নাড়লে বোঝা যায়, জীবন্ত। 

    ঘোড়ার রং কালো। লেজ চামরের মতো। খুব বড়ো বা লম্বা নয়। মাঝারি চেহারা। চোখে ঠুলি বসানো। তার ফাঁক দিয়ে চোখ দু’টি দেখা যায়। তা সর্বদা ভিজে ভিজে, কোল দিয়ে জল গড়ায়। কেন কে জানে? শান্তিও জানেন না। ঘোড়াটি ঘাস-বিচালি খায়। আর দেওয়া হয় ছোলা। সকালে একটা ছ্যাকরা ধরনের গাড়ি নিয়ে শান্তি বেরন। গাড়িটিতে জুড়ে দেওয়া হয় ঘোড়া। সে টেনে টেনে মাইলের পর মাইল হাঁটে। বারাসত থেকে কাঁকুড়গাছি, বাগুইআটি থেকে দমদম— সর্বত্র ঘোরে গাড়িটি। কোথাও দাঁড়ায়। আংটি বিক্রি করেন। তারপর বিকেলের দিকে শান্তিরা ফিরে যান দক্ষিণেশ্বর। সেখানেই বাড়ি তাঁর। ঘোড়ার নাল থেকে আংটি তৈরি করে দু’পয়সা রোজগার হলেও ঘোড়াটিকে কিন্তু দস্তুরমতো গাড়ি টেনেই যেতে হয় রোজ। নালের মালিক বলে খুব একটা অতিরিক্ত খাতির সে পায় না। শান্তির সঙ্গে থাকেন তাঁর এক যুবক আত্মীয়। তিনি খদ্দেরদের আঙুলের মাপ অনুযায়ী, আংটি মাপে মাপে করে দেন। গাড়িতে একটি ধুলোমলিন সোলার প্যানেল পর্যন্ত বসানো। সেটি থেকে যে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়, তা দিয়ে একটি সাউন্ড বক্স চলে। বক্সে একটি লোক গাঁক গাঁক করে আংটির গুনাগুন সম্পর্কে বকেই চলেন। মাঝেমধ্যেই কানে আসে, ‘আংটি কাজ করেনি প্রমাণ করতে পারলে নগদ পাঁচশো টাকা পুরস্কার।’ আর কানে আসে, ‘ঘোড়ার নাল সরাসরি সূর্য থেকে প্রতিফলিত রশ্মি টেনে নেয়।’ শান্তি বোঝান, এর ফলে অপার্থিব শক্তি অর্জন করে সেটি। এছাড়াও আনুষঙ্গিক অনেক ক্ষমতা আহরণ করে প্রকৃতি থেকে। ফলে প্রায় দৈবশক্তির মতো শক্তিশালী হয়ে ওঠে ঘোড়ার নালের আংটি। তবে হ্যাঁ, তা ঘোড়ার পা থেকে খুলে তবেই বানাতে হবে। নকল হলে মোটেও কাজ করবে না।তিনি যে কোনো আজেবাজে পথ অবলম্বন করেননি, তা প্রমাণ করতেই ঘোড়াটি নিয়ে রাজপথে বেরন। 

    মলিনা দাস নামে এক ক্রেতা দু’টি আংটি কিনলেন। বললেন, ‘আংটি কাজে দিলে আঙুলে চকচক করবে। না হলে কালো হয়ে যাবে।’ বিভিন্ন সাইজের গুচ্ছের আংটি শান্তির গাড়িতে সাজানো থাকে। এছাড়া কেউ চাইলে ঘোড়ার পা থেকে নাল খুলে তৎক্ষণাৎ বানিয়েও দেন। তবে এর জন্য টাকা অনেক বেশি দিতে হয়।

    ভালোমন্দ মিলিয়ে রোজগার মোটামুটি খারাপ নয়। ঘোড়াটা ঠিকঠাক খেতে পায়। নিজেদেরও চলে যায়। ফলে শান্তি খুশি-খুশিই থাকেন। এই দেশে এমন কিছু জ্যোতিষী আছেন, যাঁরা গ্রাহকের স্বার্থে মহাকাশে স্যাটেলাইট পাঠিয়ে গ্রহ-নক্ষত্রের অবস্থান এদিক ওদিক করে দেন। কাগজ খুললে এরকম কিছু বিজ্ঞাপন চোখেও পড়ে। সে দেশে শান্তি কর্মকার কি না খেয়ে থাকবেন! কিছু না থাক, তাঁর তো একটি ঘোড়া আছে।  নিজস্ব চিত্র
  • Link to this news (বর্তমান)