‘অপরাজিত’ অনীক: ঠোঁটকাটা, খুঁতখুঁতে, আবার কারও মতে আপসহীন, স্পষ্টবক্তা
এই সময় | ২৮ মে ২০২৬
কারও কথায় তিনি ঠোঁটকাটা, খুঁতখুঁতে। আবার কারও মতে আপসহীন, স্পষ্টবক্তা। তবে বক্স অফিস দৌড়ের সেফ চয়েসের গণ্ডি টপকে তিনি যে কিছুটা অন্য রকম, সেটা স্বীকার করেন সকলেই। তিনি অনীক দত্ত।
মুখোমুখি কথাবার্তায় হোক বা পর্দায় তুলে ধরা বার্তায়, তীক্ষ্ম ভাষায় নিজের বক্তব্য পেশ করতেই যিনি পরিচিত। সেই চেনা ছন্দে চিরতরে ছেদ পড়ল বুধবার। ৬৫তম জন্মদিনের (২০ মে) ঠিক পাঁচ দিনের মাথায় অকালপ্রয়াণ অনীকের। বেশ কিছু দিন যাবৎ নানা শারীরিক সমস্যা ভোগাচ্ছিল পরিচালক অনীক দত্তকে। মাঝে ঘরে পড়ে গিয়ে পিঠে–কোমরে মারাত্মক চোট পাওয়ার জেরে অল্প দিনের জন্য শয্যাশায়ী হয়ে পড়েছিলেন। তবে সেই অবস্থাতেও থামাননি কাজ। এ ছাড়া সিওপিডি-র সমস্যার জেরে নিতে হচ্ছিল নেবুলাইজ়ারও। কিন্তু শারীরিক সমস্যা কখনও তাঁর মানসিক উদ্যমে ব্যাঘাত ঘটাতে পারেনি। তাই ছাদ থেকে পড়ে অনীক দত্তের মৃত্যু যেন টলিউড ইন্ডাস্ট্রিকে ঠেলে দিয়েছে শোকের আবহে। অবিশ্বাসের ঘোর পরিচালকের অনুরাগীদের মধ্যেও।
২০১২-তে মুক্তি পাওয়া অনীক দত্তর ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’ এখনও বাংলা সিনেমা জগতে এক মাইলফলক। তার পরে একে-একে ‘আশ্চর্য প্রদীপ’ (২০১৩), ‘মেঘনাদবধ রহস্য’ (২০১৭), ‘ভবিষ্যতের ভূত’ (২০১৯), ‘বরুণবাবুর বন্ধু’ (২০১৯), ‘অপরাজিত’ (২০২২)-এর মতো ছবি বাঙালি দর্শকদের উপহার দিয়েছেন তিনি। সত্যজিৎ রায়ের ফিল্মমেকিংয়ের অনুরাগী হওয়ায় তাঁর ১০১তম জন্মবার্ষিকীতে রিলিজ় করেছিলেন ‘অপরাজিত’। অসুস্থ হলেও আরও দু’টি ছবির কাজ নিয়ে তিনি কথাবার্তা চালাচ্ছিলেন বলেও জানা গিয়েছিল। তবে খাতায়কলমে পরিচালকের শেষ কাজ হয়ে রইল ‘যত কাণ্ড কলকাতাতেই’ (২০২৫)। গত বছরের পুজো রিলিজ়-এর কাজ অসুস্থ অবস্থায় কার্যত ঘরবন্দি হয়েই শেষ করেছিলেন পরিচালক।
আর সিনেমা-জগতে প্রবেশের আগে অনীক দত্ত পরিচিত ছিলেন বিজ্ঞাপনের লোক হিসেবে। সম্পর্কে ইউনাইটেড ব্যাঙ্কের প্রতিষ্ঠাতা নরেন্দ্রচন্দ্র দত্তের নাতি। পড়াশোনা কলকাতার পাঠভবন স্কুল থেকে। বিজ্ঞাপনের জগতে কপি লেখা থেকে অ্যাড-ফিল্ম তৈরি ছিল তাঁর প্রথম পেশা। বিজ্ঞাপনের পাশাপাশি তাঁর লেখা গল্প-উপন্যাস-প্রবন্ধ থেকে আঁকা নানা ইলাস্ট্রেশন এবং কার্টুনও জনপ্রিয়তা বাড়িয়েছিল অনীকের। সহজ ভাবে কঠিন কথা যেমন সামনে তুলে ধরতেন তিনি, তেমনই বুদ্ধিদীপ্ত হিউমারের মোড়কে আকর্ষণ করতে পারতেন দর্শকদের। ফিল্ম পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরুর অভিজ্ঞতা অবশ্য তাঁর ভালো হয়নি। অনীক দত্ত পরিচালিত প্রথম কাজ ‘যদুবাবুর নাতনি’ রাজনৈতিক কারণের জেরে রিলিজ় করেনি। যদিও তার বছর তিন পরেই ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’–এর সুবাদে ফিল্মমেকার হিসেবে তাঁর বিগ ব্রেক।
বরাবরই বামপন্থী রাজনৈতিক মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন পরিচালক। বেশ কিছু ক্ষেত্রে পূর্বতন তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের তীব্র সমালোচনাও শোনা যেত তাঁর মুখে। ‘ভবিষ্যতের ভূত’ থেকে ‘অপরাজিত’-র মতো সিনেমার হল পাওয়া থেকে স্ক্রিনিং নিয়ে বিভিন্ন সময়ে সমস্যার মুখে পড়লেও কখনও আপস করেননি অনীক। সেই স্পষ্টবক্তার হঠাৎ এ ভাবে সবাইকে নির্বাক করে দিয়ে চলে যাওয়াটা তাই যেন বাংলার সিনেমাপ্রেমীদের মন আরও ভারী করে তুলেছে।