২৪ বছর পর ইংল্যান্ডের মাটিতে খেলতে নেমেও বদলাল না ভারতীয় ফুটবলের চেনা ছবি। ইউনিটি কাপের সেমিফাইনালে জামাইকার কাছে ০-২ গোলে হার শুধু একটি ম্যাচে পরাজয়ের গল্প নয়, বরং ভারতীয় ফুটবলের দীর্ঘ দিনের সীমাবদ্ধতাকেই আবার সামনে এনে দিল। শক্তিশালী প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে হারতেই পারে দল, কিন্তু যে ভাবে ম্যাচের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভারতকে চাপে দেখা গেল, তাতে প্রশ্ন উঠছে— আন্তর্জাতিক ফুটবলে আসলে কোথায় দাঁড়িয়ে ভারত? কেন বারবার একই জায়গায় আটকে যাচ্ছে দেশের ফুটবল?
ফিফা ক্রমতালিকায় ভারত ১৩৬ নম্বরে, জামাইকা ৭১। দুই দলের শক্তির ব্যবধান ছিল স্পষ্ট। তবে শুধু র্যাঙ্কিং দিয়ে এই হার ব্যাখ্যা করলে ভুল হবে। কারণ মাঠে যে পার্থক্য চোখে পড়েছে, তা শুধু প্রতিভা বা শক্তির নয়— ফুটবল ভাবনা, গতি, পরিকল্পনা এবং ম্যাচের ভিতরে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রেও ভারত অনেকটাই পিছিয়ে ছিল।
ম্যাচের শুরু থেকেই খালিদ জামিলের দল রক্ষণাত্মক কৌশল নেয়। প্রথম একাদশে পাঁচ জন ডিফেন্ডার রেখে অনেকটা সতর্ক ফুটবল খেলতে নামে ভারত। লক্ষ্য ছিল সহজ— গোল না খেয়ে যতটা সম্ভব ম্যাচে টিকে থাকা। কিন্তু আধুনিক ফুটবলে শুধু রক্ষণে ভরসা করে বড় দলের বিরুদ্ধে টিকে থাকা কঠিন। ভারত ম্যাচের শুরু থেকেই অনেকটা পিছিয়ে গিয়ে খেলতে থাকে। ফলে মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ পুরোপুরি চলে যায় জামাইকার হাতে।
মাত্র ৮ মিনিটেই গোল খেয়ে বসে ভারত। কোর্টনি ক্লার্কের সেই গোলটা ভারতীয় রক্ষণের একাধিক দুর্বলতা সামনে এনে দেয়। প্রথম শট গুরপ্রীত সিং সান্ধু আটকালেও ডিফেন্ডাররা দ্রুত বল ক্লিয়ার করতে পারেননি। সেই সুযোগ নিয়েই গোল করে জামাইকা। বড় দলের বিরুদ্ধে ছোট ভুলেরও বড় মূল্য দিতে হয়, এই শিক্ষা আবারও পেল ভারত।
প্রথমার্ধে ভারতের আক্রমণ কার্যত চোখেই পড়েনি। বল নিয়ে উপরে ওঠার সময় বোঝাপড়ার অভাব স্পষ্ট ছিল। মাঝমাঠ থেকে স্ট্রাইকারদের কাছে সঠিক পাস পৌঁছয়নি। উইং ব্যবহার করার চেষ্টা হলেও শেষ মুহূর্তের সিদ্ধান্তে ঘাটতি ছিল। ফলে গোলের সুযোগ প্রায় তৈরি হয়নি বললেই চলে।
এই ম্যাচে ভারতের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা ছিল মাঝমাঠে। আন্তর্জাতিক ফুটবলে মাঝমাঠই ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণ করে। কিন্তু জামাইকার ফুটবলাররা দ্রুত পাস, শারীরিক শক্তি এবং জায়গা তৈরি করার দক্ষতায় ভারতকে বারবার চাপে ফেলে দেয়। ভারতীয় ফুটবলারদের অনেক সময় বল পেতেই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। বল পেলেও তা বেশিক্ষণ ধরে রাখতে পারেননি।
দ্বিতীয়ার্ধে কিছুটা আক্রমণাত্মক হওয়ার চেষ্টা করে ভারত। ৫৩ মিনিটে লালিয়ানজুয়ালা ছাংতে বল জালে জড়ালেও অফসাইডের কারণে গোল বাতিল হয়। সেটাই ছিল ভারতের অন্যতম সেরা মুহূর্ত। এর পর ফ্রি-কিক ও কর্নার থেকেও সুযোগ এসেছিল। কিন্তু গোল করার মতো ঠান্ডা মাথা বা পরিকল্পনা দেখা যায়নি।
অন্যদিকে জামাইকা সুযোগ তৈরি করতে থাকেই। ভারত যখন সমতা ফেরানোর চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই ৭৮ মিনিটে কাহেইম ডিক্সন দ্বিতীয় গোল করে ম্যাচ কার্যত শেষ করে দেন। এই গোলও দেখিয়ে দেয়, প্রতিপক্ষের তুলনায় ভারত কতটা পিছিয়ে গতি ও ম্যাচ নিয়ন্ত্রণের জায়গায়।
শুধু কৌশল নয়, শারীরিক সক্ষমতার জায়গাতেও পার্থক্য চোখে পড়েছে। দ্বিতীয়ার্ধের দিকে ভারতীয় ফুটবলারদের ক্লান্ত দেখাচ্ছিল। অন্যদিকে জামাইকার ফুটবলাররা একই গতিতে খেলা চালিয়ে যায়। দ্রুত দৌড়, বল নিয়ন্ত্রণ, শারীরিক লড়াই— সব জায়গাতেই এগিয়ে ছিল তারা।
আরও একটা বড় সমস্যা হল দলের গভীরতা বা বেঞ্চ স্ট্রেন্থ। গুরুত্বপূর্ণ কয়েক জন ফুটবলারকে ক্লাবের কারণে শিবির ছাড়তে হওয়ায় ভারত তুলনামূলক দুর্বল দল নিয়ে মাঠে নামে। কিন্তু প্রশ্ন উঠছেই, এক-দু’জন ফুটবলার না থাকলে কি পুরো দল এতটা দুর্বল হয়ে পড়বে? আন্তর্জাতিক মানের দল হতে গেলে বিকল্প খেলোয়াড়ও তৈরি রাখতে হয়।
সবচেয়ে বড় কথা, ভারতীয় ফুটবলে এখনও বড় দলের বিরুদ্ধে লড়াই করার আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি স্পষ্ট। অনেক সময়ই মনে হয়েছে, হার এড়ানোই যেন প্রধান লক্ষ্য। কিন্তু শুধু রক্ষণ সামলে সম্মানজনক হার দিয়ে আন্তর্জাতিক ফুটবলে এগোনো যায় না। গোল করার মানসিকতা, মাঝমাঠে সৃজনশীলতা এবং দ্রুত আক্রমণ গড়ার অভ্যাস না বদলালে একই গল্প বারবার ফিরবে।
এ বার ইউনিটি কাপে তৃতীয় স্থান নির্ধারণের ম্যাচে জ়িম্বাবোয়ের বিরুদ্ধে নামবে ভারত। সেই ম্যাচে জয় হয়তো কিছুটা স্বস্তি দিতে পারে। কিন্তু জামাইকার বিরুদ্ধে এই হার আবারও বুঝিয়ে দিল, ভারতীয় ফুটবলের সমস্যাটা শুধু এক ম্যাচের নয়, এটা অনেক গভীর, আর সেই সমস্যার সমাধান না হলে আন্তর্জাতিক মঞ্চে উন্নতির স্বপ্ন অধরাই থেকে যাবে।