• এক চুমুকে শান্তি! তীব্র গরমে ফ্রিজকে টেক্কা দিয়ে তুঙ্গে মাটির কলসির চাহিদা
    প্রতিদিন | ২৮ মে ২০২৬
  • জ্যৈষ্ঠের চড়া রোদ আর তীব্র তাপপ্রবাহে মানুষের প্রাণ ওষ্ঠাগত। বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই রাস্তাঘাট শুনশান, আর তৃষ্ণা মেটাতে সর্বত্রই খোঁজ পড়ছে এক ফোঁটা ঠান্ডা জলের। আধুনিক যুগের দৌড়ে ঘরে ঘরে রেফ্রিজারেটর বা ফ্রিজ জায়গা করে নিলেও, মাটির কলসির প্রাকৃতিক ঠান্ডা জলের স্বাদ ও গুণের কাছে যে আজও নস্যি, তা প্রমাণ করছে চলতি মরশুমের বাজার দর। জঙ্গলমহলের গ্রামগঞ্জ থেকে শুরু করে মফস্বলের শহরবাজার সর্বত্রই এখন মাটির কলসি কেনার হিড়িক পড়েছে। বাঁকুড়ায় রায়পুর বাজারের এক মৃৎপাত্র বিক্রেতা জানান, অন্যান্য বছরের তুলনায় এ বছর গরমের তীব্রতা যেমন বেশি, তেমনই পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মাটির কলসির বিক্রি। দোকান খোলার পর থেকেই ক্রেতাদের ভিড় জমছে।

    সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বদলেছে মানুষের পছন্দও। আর ক্রেতাদের এই চাহিদার কথা মাথায় রেখে মৃৎশিল্পীরাও এনেছেন নতুনত্ব। সারেঙ্গা ব্লকের নিতুরপুর গ্রামের কলসি তৈরির কারিগর বিদ্যুৎ কুম্ভকর ও কৃষ্ণ কুম্ভকার বলেন, ‘‘আগে শুধু গ্রামেই মাটির কলসি বেশি বিক্রি হতো। কিন্তু এখন শহরাঞ্চলেও এর চাহিদা তুঙ্গে। এখন সাধারণ কলসির পাশাপাশি বাজারে রঙ-বেরঙের নকশা করা সাজানো হাঁড়ি এবং ‘ট্যাপ’ বা কল লাগানো কলসির চাহিদাও খুব বেশি।” পি মোড়ের এক ব্যবসায়ী পারিজাত মুখোপাধ্যায়ের কথায়, ‘‘প্রতি বছরের মতো এবারও গরম পড়তেই আমি একটা নতুন মাটির কলসি কিনেছি। তবে জল নেওয়ার সুবিধার জন্য তাতে একটা ট্যাপ লাগিয়ে নিয়েছি। কলসিটিকে সবসময় একটা ভেজা লাল সালু কাপড়ে জড়িয়ে রাখি, যাতে জল আরও বেশি ঠান্ডা থাকে। দোকানে আসা তৃষ্ণার্ত ক্রেতাদের এই কলসির জল দিলে, তাঁরা খেয়ে যে তৃপ্তি পান, তা ফ্রিজের জলে পাওয়া যায় না।”

    ব্যবসায়ী উজ্জ্বল নায়ক, ননীগোপাল মহান্তি, জনার্দন পাণ্ডাদের বক্তব্য, ‘‘এর পেছনে মূলত দুটি বড় কারণ রয়েছে ফ্রিজের অতিরিক্ত ঠান্ডা জল পানের ফলে গলা ব্যথা বা সর্দি-কাশির ভয় থাকে। কিন্তু মাটির কলসির জল প্রাকৃতিকভাবেই শরীরের তাপমাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ঠান্ডা হয়, যা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর।” এ বিষয়ে পি মোড়ের বাসিন্দা দীনবন্ধু মাহাতো ও বাবলু মাহাতোরা বলেন, দিন দিন যেভাবে বিদ্যুতের বিল বাড়ছে, তাতে মধ্যবিত্ত ও নিম্ন-মধ্যবিত্ত পরিবারগুলির কাছে বিদ্যুৎ খরচ না করে জল ঠান্ডা রাখার এটাই সেরা প্রাকৃতিক উপায়।

    বিশেষজ্ঞরা আবার মাটির কলসির জল পানের উপযোগিতা নিয়ে বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। বলা হচ্ছে, মাটির তৈরির কলসির গায়ে থাকা অসংখ্য ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র ছিদ্র দিয়ে জল বাষ্পীভূত হওয়ার সময় যে লীনতাপ গ্রহণ করে, তার ফলেই কলসির জল ভিতরের দিক থেকে ঠান্ডা থাকে। এটি সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক এবং পরিবেশবান্ধব। সময়ের নিয়মে বহু পুরনো অভ্যাস হারিয়ে গেলেও, মাটির সুবাস মাখা এই সাবেকিয়ানা যে পুরোপুরি মুছে যায়নি, তা জঙ্গলমহলের এই চাঙ্গা বাজারই প্রমাণ করে দিচ্ছে। তীব্র গরমে মাটির কলসি একদিকে যেমন সাধারণ মানুষের তৃষ্ণা মেটাচ্ছে, তেমনই অন্য দিকে লক্ষ্মীলাভের আশায় মুখে হাসি ফুটিয়েছে সারেঙ্গা ব্লকের বানপুর ও নেতুরপুরের কুম্ভকার পাড়ার মৃৎশিল্পীদেরও।
  • Link to this news (প্রতিদিন)