এই সময়: তৃণমূলের ‘বিদ্রোহী ক্লাব’–এর সদস্য সংখ্যা বেড়েই চলেছে! বাড়ছে ‘বেসুরো’দের সুর চড়ানোর মাত্রা। সেই সঙ্গে বাড়ছে দলের মধ্যে আকচাআকচিও। বিধানসভা ভোটে এই বিপর্যয়ের দায় কার— এই প্রশ্নে ‘বিদ্রোহী ক্লাব’–এর যুক্তিতেই পাল্লা ভারী হচ্ছে ক্রমশ। আর কমছে দলের হয়ে ‘ডিফেন্ড’ করার মুখ।
বুধবারই কলকাতা পুরসভার ৯৮ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলার, তৃণমূলের অরূপ চক্রবর্তী পুরসভার পাবলিক অ্যাকাউন্টস কমিটির সদস্য পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছিলেন। দলের সঙ্গে দূরত্ব আরও বাড়িয়ে বৃহস্পতিবার দলের মুখপাত্র পদ থেকেও ইস্তফা দিয়েছেন তিনি। সঙ্গী হিসেবে তিনি পেয়েছেন রাজ্যসভার প্রাক্তন সাংসদ শান্তনু সেনকেও। তিনিও এ দিন তৃণমূলের মুখপাত্র পদ ছেড়েছেন। নিজের দলের বিরুদ্ধে এ দিন সুর চড়িয়েছেন কলকাতা পুরসভার ৮১ নম্বর ওয়ার্ডের তৃণমূল কাউন্সিলার জুঁই বিশ্বাসও। দলের আর এক মুখপাত্র বিশ্বজিৎ দেবও বেসুরো। তৃণমূলের বর্তমান পরিস্থিতির জন্য তিনি আবার সরাসরিই তোপ দেগেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে।
এর মধ্যেই তৃণমূলের অস্বস্তি আরও বাড়িয়েছেন বারাসতের সাংসদ কাকলি ঘোষদস্তিদার। গত ক’দিন ধরে রোজই তিনি দলের কোনও না কোনও পদ থেকে ইস্তফা দিচ্ছেন। জানা গিয়েছে, বুধবার তিনি তৃণমূল সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে মৌখিক হেনস্থার অভিযোগ তুলে লোকসভার স্পিকার ওম বিড়লাকে চিঠি লেখেন। ওই চিঠিতে কল্যাণের বিরুদ্ধে মৌখিক হেনস্থার অভিযোগ দায়ের করার জন্য স্পিকারের অনুমতি চেয়েছেন কাকলি। চিঠিতে তাঁর অভিযোগ, কল্যাণ লোকসভার ভিতরে তাঁকে বার বার মৌখিক হেনস্থা করেছেন। শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদের বিরুদ্ধে নারীবিদ্বেষের অভিযোগও তুলেছেন কাকলি। চিঠিতে তাঁর দাবি, লোকসভার মহিলা সদস্যদের প্রতি কল্যাণের নারীবিদ্বেষী মনোভাব রয়েছে। তাই এ ক্ষেত্রে কল্যাণের শাস্তি পাওয়া উচিত বলে মনে করেন বারাসতের তৃণমূল সাংসদ।
জবাব দিতে অবশ্য দেরি করেননি কল্যাণ। তিনিও এ দিন কড়া ভাষায় আক্রমণ করেছেন কাকলিকে। যা তৃণমূলের অন্দরের বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিকে আরও বেআব্রু করে দিয়েছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ। কল্যাণ এ দিন বলেন, ‘৪ মের পরে ওঁর ঘুম ভাঙল? আমি যদি খারাপ কথা বলতাম, তা হলে উনি আগে বলেননি কেন? এখন নানা সময়ে নানা কথা বলছেন!’ শ্রীরামপুরের তৃণমূল সাংসদের প্রশ্ন, ‘ওঁকে (কাকলি) খারাপ কথা বলব কখন? উনি তো সংসদেই থাকেন না!’ সুর আরও চড়িয়ে তৃণমূলের আইনজীবী–সাংসদের আক্রমণ, ‘যিনি আমাকে নারীবিদ্বেষী বলছেন, তাঁকে তো হাতেনাতে টাকা নিতে দেখা গিয়েছে। সিবিআই ওঁর বিরুদ্ধে চার্জশিট দিয়েছে। ট্রায়াল শুরু করার জন্য স্পিকারের কাছে অনুমতি চেয়েছে। সেই অনুমতি এখনও দেওয়া হয়নি। আমি তো জানতে চাইব স্পিকারের কাছে, যে এই অনুমতি কেন এখনও দেওয়া হলো না?’ এই কল–কাকলিতেই স্পষ্ট, তৃণমূলের সংসদীয় দলেও আগামী দিনে তীব্র সংঘাতের আবহ তৈরি হতে চলেছে এবং এ নিয়ে আইনি লড়াইয়েরও সম্ভাবনা রয়েছে। ৪ মে বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার পর থেকে একাধিক তৃণমূল নেতানেত্রী দলের নেতৃত্বের বিরুদ্ধে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। কল্যাণ প্রথম থেকেই বুঝিয়ে দিয়েছেন, তিনি এই ‘অসময়ে’ দলের সঙ্গেই আছেন। যদিও ‘বিদ্রোহী’দের ঝাঁজের কাছে কল্যাণ কার্যত ম্লান হয়ে গিয়েছেন।
শান্তনু সেন এ দিন দলের মুখপাত্রের পদ থেকে ইস্তফা দেওয়ার পরে বলেন, ‘আরজি করের ঘটনায় সঞ্জয় রায় একা দোষী নন। আমার কাছে ডিএনএ রিপোর্ট আছে। আমি প্রমাণ করে দিতে পারব, আরজি করের ঘটনায় আরও অনেকে জড়িত।’ শান্তনুর কথায়, ‘মুখপাত্র হিসেবে অনেক অপ্রীতিকর, অন্যায্য ঘটনাকে ডিফেন্ড করতে হয়েছে। কিন্তু বিধানসভা ভোটের ফল প্রমাণ করে দিয়েছে, মানুষ সঠিকটাই বুঝেছেন। তাই মানুষকে রায়কে সম্মান জানাতে এবং আর যাতে এই ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনাকে ডিফেন্ড করতে না–হয়, তার জন্যই পদত্যাগ করেছি।’
তাঁরই সুরে অরূপ বলেন, ‘ভোটে এই ফল কাম্য ছিল না। তবে মানুষের রায়কে মাথা পেতে নিতে হবে। হার স্বীকার করতে না-পারলে আগের জয় মিথ্যে হয়ে যায়। দলের কর্মীরা এখন বিপদে। এত দিন যাঁরা মন্ত্রী ছিলেন, যাঁরা এত দিন সুবিধা নিয়েছিলেন, তাঁরা এখন কোথায়?’ আবার তৃণমূল কাউন্সিলার জুঁইয়ের ক্ষোভ, ‘২০১৬–এর পর থেকেই টালিগঞ্জের স্টুডিয়ো পাড়ায় অনেক সমস্যা হচ্ছিল। দলের নেতৃত্বকে জানাতেও চেয়েছিলাম। কিন্তু আমাকে জানাতে দেওয়া হয়নি।’ তৃণমূলের আর এক বিদ্রোহী নেতা বিশ্বজিৎ দেব এ দিন সরাসরি মমতা–অভিষেককে কাঠগড়ায় তুলে বলেন, ‘দলের নেতা–কর্মীদের কথা শোনা হতো না। আইপ্যাকের মতো কোনও কোম্পানি যদি দল চালায়, তা হলে তো এই অবস্থাই হবে। আমি এটা দলের মধ্যে অনেকবার বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছে আইপ্যাক। সেই কারণে আমি তো তিন বছর ধরেই পার্টির থেকে ডিট্যাচড হয়ে গিয়েছিলাম।’ তাঁর দাবি, ‘অচিরেই তৃণমূল ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে।’