কলকাতার লাইফলাইন এ বার আরও আধুনিক। কলকাতার মেট্রোর ব্লু লাইনে খুব শীঘ্রই মাত্র আড়াই মিনিট অর্থাৎ ১৫০ সেকেন্ড অন্তরই মিলবে ট্রেন। সেই পরিষেবার লক্ষ্যে শহরের সবচেয়ে পুরোনো ও ব্যস্ততম লাইনের ভূগর্ভস্থ অংশে বহু বছরের পুরোনো স্টিলের থার্ড রেল বদলে বসানো হয়েছে আধুনিক অ্যালুমিনিয়াম থার্ড রেল। মেট্রোর তরফে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রযুক্তিগত আপগ্রেডকে ভবিষ্যতে ট্রেনের ব্যবধান কমানোর লক্ষ্যে বড় পদক্ষেপ বলে জানানো হয়েছে। এই আপগ্রেডের ফলে ভবিষ্যতে আরও দ্রুত গতিতে এবং কম ব্যবধানে মেট্রো চালানো সম্ভব হবে বলে দাবি কর্তৃপক্ষের। একইসঙ্গে এই নতুন প্রযুক্তির হাত ধরে প্রায় ৫০ হাজার টন কার্বন নির্গমন কমবে বলেও জানিয়েছে মেট্রোর।
বর্তমানে ব্লু লাইন কলকাতা মেট্রোর সবচেয়ে ব্যস্ত করিডরগুলির একটি। প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ যাত্রী এই লাইনে যাতায়াত করেন। ১৯৮৪ সালে চালু হওয়া এই করিডরে এতদিন ধরে স্টিলের থার্ড রেলের মাধ্যমেই ট্রেনের বিদ্যুৎ সরবরাহ হত। তবে প্রযুক্তির উন্নতির সঙ্গে সঙ্গে সেই পুরোনো ব্যবস্থা এখন তুলনামূলকভাবে কম কার্যকর এবং বেশি শক্তিক্ষয়ী হয়ে পড়েছে। তাই ধাপে ধাপে আধুনিক অ্যালুমিনিয়াম থার্ড রেল বসানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।
মেট্রো সূত্রে জানা গিয়েছে, অ্যালুমিনিয়ামের বিদ্যুৎ পরিবহণ শক্তি স্টিলের তুলনায় অনেক বেশি। যেখানে স্টিলের বিদ্যুৎ পরিবহণ ক্ষমতা প্রায় ৬ মিলিয়ন সিমেন্স প্রতি মিটার, সেখানে অ্যালুমিনিয়ামের পরিবাহিতা প্রায় ৩৮ মিলিয়ন সিমেন্স প্রতি মিটার। এর ফলে বিদ্যুতের ভোল্টেজ ড্রপ এবং শক্তির অপচয় অনেক কম হবে। ট্রেন দ্রুত গতিতে অ্যাক্সেলারেট করতে পারবে। ফলে ভবিষ্যতে ট্রেনের মধ্যে ব্যবধান কমিয়ে ১৫০ সেকেন্ড বা আড়াই মিনিটের হেডওয়ে পর্যন্ত নামিয়ে আনার যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা বাস্তবায়ন সম্ভবপর হবে।
এই আপগ্রেড মূলত ব্লু লাইনের ভূগর্ভস্থ অংশে করা হয়েছে। অর্থাৎ নোয়াপাড়া থেকে দমদম এবং বেলগাছিয়া থেকে মহানায়ক উত্তম কুমার স্টেশন পর্যন্ত বিস্তৃত ট্র্যাকেই নতুন অ্যালুমিনিয়াম থার্ড রেল বসানো হয়েছে। মেট্রো কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে দক্ষিণের এলিভেটেড অংশ অর্থাৎ মহানায়ক উত্তম কুমার থেকে কবি সুভাষ পর্যন্ত অংশেও একই প্রযুক্তি চালু করা হবে।
কর্তৃপক্ষের দাবি, এই নতুন ব্যবস্থা শুধু পরিষেবার গতি বাড়াবে না, পরিবেশের পক্ষেও উপকারী হবে। অ্যালুমিনিয়ামের কম রোধের কারণে কম তাপ উৎপন্ন হবে, ফলে টানেলের এয়ার-কন্ডিশনিং সিস্টেমের উপর চাপও কমবে। দীর্ঘমেয়াদে প্রায় ৫০ হাজার টন কার্বন নিঃসরণ কমানো সম্ভব হতে পারে বলেও জানিয়েছে মেট্রো। পাশাপাশি বছরে বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ সাশ্রয় হবে, যার ফলে অপারেশনাল খরচও কমবে।
এই আধুনিকীকরণ প্রকল্প ব্লু লাইনের বৃহত্তর আপগ্রেড পরিকল্পনার অংশ। ভারতের প্রথম মেট্রো করিডর হিসেবে পরিচিত কলকাতা মেট্রোর উত্তর-দক্ষিণ ব্লু লাইনকে ধাপে ধাপে আধুনিক ও শক্তি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির মাধ্যমে উন্নত করা হচ্ছে। অফিস টাইমে ট্রেনে ভিড় সামাল দিতে এবং যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য বাড়াতে ট্রেনের ফ্রিকোয়েন্সি বাড়ানো দরকার। তাতে কমাতে হবে দুই ট্রেনের মধ্যে সময়ের ব্যবধান। ইতিমধ্যেই কেন্দ্রীয় সরকার প্রায় ৬৭১.৭ কোটি টাকা এর জন্য বরাদ্দ করেছে। এর আওতায় মেট্রোর সিগন্যালিং সিস্টেমকে আধুনিক CBTC প্রযুক্তিতে রূপান্তর, অতিরিক্ত ট্র্যাকশন সাব-স্টেশন তৈরি এবং সর্বোচ্চ ট্রেনের গতি বাড়ানোর কাজও করা হবে। ভবিষ্যতে লন্ডন ও মস্কো মেট্রোর মতো ৯০ সেকেন্ড অন্তর ট্রেন চালানোর লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে কলকাতা মেট্রো।