নজিরবিহীন! জটিল অস্ত্রোপচারের পর ভাড়া গাড়িতে ক্যানসার রোগীকে বাড়ি পৌঁছে দিলেন চিকিৎসক
প্রতিদিন | ২৯ মে ২০২৬
সাতঘন্টা ধরে ক্যানসার রোগীর জটিল অস্ত্রোপচার। তারপর প্রায় দেড় মাস হাসপাতালে রেখে পর্যবেক্ষণ। এরপর গাড়ি ভাড়া করে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে রোগীকে বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া। এককথায় নজিরবিহীন। সরকারি হাসপাতালের এমন ছবি আগে দেখেনি পশ্চিমবঙ্গ। দেশেও বিরল! জঙ্গলমহল পুরুলিয়া জুড়ে বিভিন্ন হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিয়ে গত কয়েকদিনে যখন নানা প্রশ্ন উঠছে, ঠিক এমন সময়ে বৃহস্পতিবার এই জেলার দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট ও মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল এবং ওই প্রতিষ্ঠানের ক্যানসার বিভাগের নোডাল অফিসার তথা জেনারেল সার্জারি চিকিৎসক পবন মণ্ডলের এই মানবিক মুখ সকলের নজর কেড়েছে। ওই মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের সুপার কাম ভাইস প্রিন্সিপাল সুকোমল বিষয়ী বলেন, ‘‘অস্ত্রোপচার জটিল ছিল। চিকিৎসক রোগীকে গাড়ি ভাড়া করে বাড়িতে পৌঁছে দিয়েছেন। আমরা সত্যিই গর্বিত।”
পুরুলিয়ার জঙ্গলমহল বলরামপুরের বিরামডির বাসিন্দা মিনি মান্ডি। তার অগ্ন্যাশয়ে ক্যানসার ধরা পড়ে। জন্ডিসও হয়েছিল। মাস দেড়েক আগের ঘটনা। মাঝেমধ্যেই জ্বর আসত। রোগীর কখনও হাত-পা বা কোমরে পরে শুরু হয় পেটে মারাত্মক ব্যথা। তারপরই তাঁর পরিবার দেবেন মাহাতো গভর্নমেন্ট মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে নিয়ে আসেন। নানান পরীক্ষার পর মিনিকে ভর্তি করা হয়। ওই রোগীর শরীরে রক্তের পরিমাণও কম ছিল। তাই হাসপাতালে ভর্তি করে ৩ ইউনিট রক্ত দেওয়া হয়। তৈরি করা হয় একটি মেডিক্যাল টিম। তারপর ১৩ মে অস্ত্রোপচার হয়। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় এই জটিল অস্ত্রোপচারের নাম ‘হুইপলস অপারেশন’। সাত ঘন্টা অপারেশনও দুই ইউনিট রক্ত প্রয়োজন হয়। বাদ দিতে হয় ক্যানসার সমেত ৫০ শতাংশ অগ্ন্যাশয়। সেইসঙ্গে সম্পূর্ণ ডিওডেনাম, পিত্তথলি ও পিত্তনালী। এছাড়া পাকস্থলীর কিছু অংশ সহ বেশ কিছু লসিকা গ্রন্থি।
কিন্তু পরবর্তীকালে রোগই যাতে স্বাভাবিকভাবে খাবার খেতে পারেন এবং সহজেই জীবন যাপন করতে পারেন সেজন্য বাদ পড়া অংশগুলোর পর বাকি অঙ্গগুলিকে আবার জোড়া লাগানো হয়। যাতে মুখের খাবার খাদ্যনালীতে যেতে পারে, এখন ওই রোগী সম্পূর্ণ সুস্থ। হাসপাতাল ক্যাম্পাসে চিকিৎসকের সঙ্গে গাড়িতে ওঠার সময় ওই মহিলা জানান, ‘‘এই হাসপাতালকে প্রণাম। আর ডাক্তারকে নমস্কার। সরকারি হাসপাতালে এমন পরিষেবা পাব ভাবতে পারিনি। আমি সুস্থ হয়ে গিয়েছি।” বাড়িতে পা রেখে ওই মহিলা বলেন, ‘‘জীবন যুদ্ধে লড়াই করার শক্তি যোগালেন এই চিকিৎসক।” চিকিৎসক পবন মণ্ডলের কথায়, ‘‘এই অস্ত্রোপচার সহজ ছিল না। ওই পরিবারটি আমাদের উপর ভরসা করেছিল। ফলে পরিষেবা দিতে পেরেছি। বাড়িতে রোগীকে পৌঁছে দেওয়ার অর্থ আমরা আছি। জীবন যুদ্ধে লড়াই চালিয়ে যান। এটাই বার্তা।”
হাসপাতাল থেকে রোগীকে ভাড়া গাড়িতে ওঠানোর সময় চোখে জল চলে আসে চিকিৎসকের। তাঁর কথায়, ‘‘আজ বাবার কথা মনে পড়ছে। তখন আমি মাত্র ১৮ থেকে ২০ দিনের মেডিক্যাল স্টুডেন্ট। আমার বাবা এই রোগেই মারা যান। বাঁচাতে পারিনি। তখন থেকে আমি চ্যালেঞ্জটা নিয়েছিলাম। কোন রোগীকে এই জটিল অস্ত্রোপ্রচারে সুস্থ করবই।” এই অস্ত্রোপচারের টিমে ছিলেন চিকিৎসক মণিরুল ইসলাম, কার্তিক ও অ্যানাস্থেশিয়া দলে অনামিত্র মণ্ডল, সমর সান্যাল, অজিতপ্রসাদ মুর্মু, ঋষভ। ক্যানসার বিভাগের ওই নোডাল অফিসার তথা চিকিৎসক জানান, সেবিকাদের ভূমিকাও ছিল গুরুত্বপূর্ণ।