মহিলা সেজে কীভাবে চলত লক্ষীর ভাণ্ডারের টাকা আত্মসাৎ?
আজকাল | ৩০ মে ২০২৬
আজকাল ওয়েবডেস্ক: তৃণমূল কংগ্রেস সরকারের আমলে পশ্চিমবঙ্গের সাধারণ এবং দুঃস্থ মহিলাদের স্বাবলম্বী করার উদ্দেশ্যে চালু হওয়া ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডার’ প্রকল্পকে কেন্দ্র করে ফের এক নজিরবিহীন ও লজ্জাজনক দুর্নীতির পর্দা ফাঁস হল। গত বুধবারই পুরুষদের ‘মহিলা’ সাজিয়ে সরকারি অর্থ আত্মসাৎ করার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ সামনে আসে। এই চক্রের জাল যে কতটা গভীরে, তা প্রমাণ করতে বহরমপুর থানার পুলিশ গ্রেপ্তার করে রাকিবুল শেখ নামে এক ব্যক্তিকে। তাঁকে দফায় দফায় জেরা করার পর, শুক্রবার সকালে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ থানার অন্তর্গত রাজপুত বাহুরা এলাকা থেকে পুলিশের জালে ধরা পড়ল এই চক্রের মূল পাণ্ডা মুস্তাফিজুর রহমান।
পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত মুস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার ৩১৮(৪), ৩৩৬(২), ৩৩৮, ৩৩৬(৩), ৩৪০(২), ৬১(২) এবং ৩(৫) ধারায় আর্থিক তছরুপ, জালিয়াতি, জাল নথিপত্র তৈরি এবং অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের মামলা রুজু করা হয়েছে। ধৃতকে শুক্রবারই বহরমপুর আদালতে পেশ করে ১০ দিনের পুলিশি হেফাজতের আবেদন জানিয়েছে বহরমপুর থানার পুলিশ।
মুস্তাফিজুর রহমানকে জেরা করে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, মুর্শিদাবাদ জেলার শতাধিক পুরুষ সদস্যকে সে ভুয়ো নথিপত্র তৈরি করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তালিকায় উপভোক্তা হিসেবে নথিভুক্ত করিয়েছিল। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও লিঙ্কড মোবাইল নম্বরে কারচুপি করে পুরুষদের নাম মহিলাদের তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হত। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হল, এই উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে সরকারি টাকা ঢোকার পরই সেই অর্থের ঠিক অর্ধেক অংশ 'কাটমানি' হিসেবে তুলে দিতে হত মূল পাণ্ডা মুস্তাফিজুর রহমানের হাতে।
তদন্তে জানা গিয়েছে, ধৃত হোটেল ব্যবসায়ী রাকিবুল শেখের রঘুনাথগঞ্জের রাজপুত বহুরা এলাকায় শ্বশুরবাড়ি সূত্রের কোনও এক আত্মীয়ের মাধ্যমে মুস্তাফিজুরের সঙ্গে পরিচয় হয়। এরপর মুস্তাফিজুর ভুয়ো নথি বানিয়ে রাকিবুলের নামে একটি নয়, বরং মোট তিনটি আলাদা অ্যাকাউন্টে বেআইনিভাবে 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে'র টাকা ঢোকানোর ব্যবস্থা করে দেয়। প্রতি মাসের সেই দুর্নীতির টাকার অর্ধেক ভাগ চলে যেত মুস্তাফিজুরের পকেটে। ঘটনা প্রমাণ করে যে তৃণমূল সরকারের প্রশাসনিক স্তরে কোনও স্ক্রুটিনি বা যাচাইকরণ প্রক্রিয়া ছিল না বললেই চলে।
শুধু তাই নয়, মুর্শিদাবাদের এই 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার' কেলেঙ্কারি প্রমাণ করে দিল যে বাংলায় তৃণমূলের জমানায় সরকারি প্রকল্পগুলো কীভাবে দুর্নীতির আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। যে প্রকল্প রাজ্যের মহিলাদের সামাজিক উন্নয়নের প্রতীক, সেখানে পুরুষদের নাম ঢুকিয়ে টাকা লুটের এই ঘটনা শুধু প্রশাসনিক ব্যর্থতা নয়, নৈতিক দেউলিয়াপনারও চরম নিদর্শন। পুলিশ এই চক্রের অন্যান্য সদস্যদের খোঁজে তল্লাশি চালাচ্ছে। সাধারণ মানুষের এখন একটাই দাবি, প্রকৃত দোষীদের কঠোর শাস্তি হোক এবং সরকারি টাকার এই 'হরির লুট' চিরতরে বন্ধ হোক।