• ঘরে ঘরে সুখ-সমৃদ্ধির নতুন সকাল, প্রথম বীজ বপন শুরু করলেন হাজার হাজার কৃষক
    News18 বাংলা | ৩০ মে ২০২৬
  • “বারো দিনে বারনি, তেরো দিনে রহনি” – এই প্রাচীন লোকপ্রবাদকে সঙ্গী করেই জঙ্গলমহলের গ্রামবাংলা মানুষ মেতে উঠলেন। কৃষিজীবী মানুষের অন্যতম প্রাচীন লোকউৎসব ‘রহিন’ পরবে। মাটির গন্ধ, লোকবিশ্বাস, কৃষি সংস্কার ও লোকঐতিহ্যের এক অপূর্ব মেলবন্ধনে এদিন যেন নতুন করে প্রাণ ফিরে পেল জঙ্গলমহলের গ্রামাঞ্চল। ১৩ জৈষ্ঠ্যের এই বিশেষ দিনটিকেই কৃষিজীবী মানুষ নতুন কৃষিবর্ষের সূচনা হিসেবে মানেন। ভোরের আলো ফুটতেই গ্রাম বাংলার উঠোনে শুরু হয় উৎসবের প্রস্তুতি। বাড়ির মহিলারা গোবরের রেখা টেনে দেওয়ালে গণ্ডি কাটেন।

    লোকবিশ্বাস, এর ফলে অশুভ শক্তি, কীটপতঙ্গ ও অপদেবতা গৃহে প্রবেশ করতে পারে না। সেই সঙ্গে ঘরে আসে সুখ, সমৃদ্ধি ও ভাল ফসলের আশীর্বাদ। রহিন পরব মানেই মাঠে নামার প্রস্তুতি। এদিন থেকেই কৃষকেরা চাষের জমিতে প্রথম বীজ বপন শুরু করেন। সাতদিন ধরে চলা এই প্রথাকে স্থানীয় ভাষায় বলা হয় ‘ধূলা বতর’। কৃষকদের বিশ্বাস, এই সময়ে বীজ ফেললে ফসলে রোগপোকা কম হয় এবং ফলন ভাল হয়। তাই রহিন শুধুমাত্র উৎসব নয়, কৃষকের আশা-ভরসারও দিন। শুধু কৃষিকাজ নয়, এই উৎসব ঘিরে রয়েছে নানা লোকাচারও। অনেক পরিবার এদিন নতুন তুলসী মঞ্চ প্রতিষ্ঠা করেন। বিকেলে গ্রামের মহিলারা মাঠ থেকে পবিত্র মাটি সংগ্রহ করে বাড়ির তুলসী তলা বা ঘরের এক কোণে রেখে পুজো করেন।

    এই মাটিকে তারা উর্বরতা ও শুভ শক্তির প্রতীক বলে মনে করেন। উৎসবের আনন্দে সামিল হয় গ্রামের ছোটরাও। মুখে রং ও কালি মেখে, হাতে দেশীয় বাদ্যযন্ত্র নিয়ে পাড়ায় পাড়ায় ঘুরে বেড়ায় তারা। কোথাও শোনা যায় ঢাকের আওয়াজ, কোথাও আবার লোকগানের সুর। বাড়ির সকলেই এদিন ‘রহিন ফল’ বা ‘আষাঢ়ি ফল’ খেয়ে থাকেন। লোকবিশ্বাস, এই ফল শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে সাহায্য করে। আধুনিকতার যান্ত্রিক ছোঁয়ায় যখন বহু লোকসংস্কৃতি হারিয়ে যাওয়ার মুখে, তখনও জঙ্গলমহলের কৃষিজীবী মানুষ যুগ যুগ ধরে বাঁচিয়ে রেখেছেন এই কৃষিভিত্তিক ঐতিহ্য।

    রহিন পরব শুধু একটি উৎসব নয়, এটি মাটি, মানুষ ও কৃষির সঙ্গে আত্মিক সম্পর্কের এক জীবন্ত প্রতীক। এ বিষয়ে আদিবাসী কুড়মি সমাজের পুরুলিয়া জেলা যুব কমিটির সভাপতি ফাল্গুনী মাহাতো বলেন, এটা জঙ্গলমহলের দীর্ঘদিনের উৎসব। এই দিন তারা জমিতে বীজ ফেলেন এটা জঙ্গলমহলের ঐতিহ্য। এই দিন প্রায় প্রতিটি ঘরে ঘরেই মাংস পিঠা হাঁস মাংস বিভিন্ন জিনিস রান্না করা হয়। উৎসবের চেহারা নেয় চারিদিক। লোকঐতিহ্যের রঙে রাঙানো এই রহিন পরব আবারও মনে করিয়ে দিল মাটির সঙ্গে সম্পর্ক যতদিন থাকবে, ততদিন বেঁচে থাকবে বাংলার লোকসংস্কৃতিও।
  • Link to this news (News18 বাংলা)