ভরা জ্যৈষ্ঠে বাড়ছে তাপমাত্রা। দার্জিলিং শহরেও মাথার উপরে ঘুরছে পাখা। তার উপর ভরা পর্যটন মরশুমে পানীয় জলের সংকট উদ্বেগ বাড়িয়েছে। তুলনামূলক কম বৃষ্টির কারণে বিভিন্ন জলাধারে জলের পরিমাণ কমেছে। তারই জেরে অনেক এলাকায় সময়মতো জল সরবরাহ করা সম্ভব হচ্ছে না বলে বিভিন্ন মহলে অভিযোগ উঠেছে। জলের জন্য ড্রাম, জারিক্যান নিয়ে বাসিন্দাদের দীর্ঘ লাইন এখন শৈলশহরে প্রাত্যহিক দৃশ্য। পুরসভার তরফে হোটেলগুলোতে জলের অপচয় বন্ধ এবং ব্যবহার কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ওই ফাঁকে বেড়েছে পানীয় জলের কালোবাজারি।
শৈলশহরে দিনে তাপমাত্রার পারদ ১৯ ডিগ্রি সেলসিয়াসের নীচে নামছে না। উলটে রোদ উঠলে সেটা পৌঁছে যাচ্ছে ২২ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ঘরে। একে গ্রীষ্ম মরশুমে পর্যটকদের ভিড়ে ঠাসা পাহাড়। তীব্র যানজট। তার দোসর হয়েছে বেড়ে চলা তাপমাত্রা এবং পানীয় জলের সংকট। পাহাড়ে কিছুটা হেটে বেড়াতে সমতলের মতোই ঘামছে শরীর। চৌরাস্তার বিভিন্ন দোকানে মাথার উপরে ঘুরছে পাখা। আইসক্রিম পার্লারগুলোতে ভিড় বাড়ছে। হোটেল অথবা হোমস্টেগুলোতে পা রাখতে মিলছে নির্দেশ ‘জলের অপচয় করবেন না।’ মে মাসের শেষ প্রান্তে অন্য শৈলশহর। পরিস্থিতি সামাল দিতে নড়েচড়ে বসেছে প্রশাসন। হোটেল ও ব্যবসায়ীদের জল অপচয় বন্ধ করতে সতর্ক করা হয়েছে। প্রয়োজনে বিকল্প জল সরবরাহের আশ্বাস মিলেছে।
কিন্তু কেন ওই পরিস্থিতি? দার্জিলিং পুরসভা কতৃর্পক্ষের দাবি, শহরের চাহিদা মেটাতে প্রতিদিন অন্তত সাড়ে ১৮ লক্ষ গ্যালন জল প্রয়োজন। কিন্তু এখন ৫ লক্ষ গ্যালনের কিছু বেশি পরিমাণ জল মিলছে। স্বভাবতই ঘাটতি থেকে যাচ্ছে।তীব্র পানীয় জলকষ্টের ছবি ধরা পড়ছে দার্জিলিংয়ের বিভিন্ন রাস্তায়। পাহাড়ের বিভিন্ন ঝোরার থেকে নামিয়ে আনা পাইপের সামনে জলের জন্য লম্বা লাইন। যদিও জিটিএ ভাইস চেয়ারম্যান রাজেশ চৌহান দাবি করেন, বাড়তি ট্যাঙ্কার ব্যবহার করে যতটা দ্রুত সম্ভব পানীয় জল সরবরাহ স্বাভাবিক করার চেষ্টা চলছে। কিন্তু বাস্তব ছবি ভিন্ন কথা বলছে।
দার্জিলিং শহরের বাসিন্দা অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক দাওয়া শেরপা জানান, কয়েকটি উৎস থেকে জল সংগ্রহ করে দার্জিলিং শহরের চাহিদা মেটানো হয়। উৎসগুলোর মধ্যে অন্যতম ঘুম-জোরবাংলো অঞ্চলের সিনচেল হ্রদ। ওই হ্রদের একটি দিক ১৯১০ সালে এবং অন্যদিক ১৯৩২ সালে নির্মাণ করেন তৎকালীন দার্জিলিং পুরসভার প্রথম ইঞ্জিনিয়ার থমাস কেন। ১৯৩২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে দার্জিলিং শহর সিনচেলের জোড়া পুকুর থেকে পানীয় জল পেয়ে আসছে। এছাড়াও সিদ্ধাপ হ্রদে প্রায় ১০ লক্ষ গ্যালন পানীয় জল ধারণের ক্ষমতা রয়েছে। কাং-খোলাও অন্যতম উৎস যেখান থেকে ৫ হাজার গ্যালন জল পাওয়া যায়। পাশাপাশি রম্বি জলাধার-সহ শহরজুড়ে অন্তত ১৬টি ঝোরা থেকে জল সংগ্রহ করে শোধন করা হয়। কিন্তু সমস্যা হয়েছে গরমের শুরুতেই ঝোরাগুলোর বেশিরভাগ শুকিয়েছে। মূল জলাধার যেমন সিনচেল হ্রদ থেকে চাহিদা মতো জল আনা কঠিন হয়েছে। এছাড়াও মনে রাখতে হবে, সিনচেলের জলাধারগুলো ব্রিটিশরা শহরের প্রায় ২৫ থেকে ৩০ হাজার জনসংখ্যার জন্য নির্মাণ করেছিল।
ওই সময় জলাধার এলাকার মধ্যে অন্তত ২৬টি ছোট নদী ছিল। কিন্তু সিনচেল জলাধার এলাকার চারপাশের জঙ্গল ধ্বংস এবং উন্নয়নমূলক কাজের পরিধি বাড়ার ফলে বর্তমানে এখন মাত্র পাঁচ থেকে ছয়টি জলের উৎস রয়েছে। বর্ষাকালে এই সংখ্যা ১০ পর্যন্ত পৌঁছয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী দার্জিলিং শহরের জনসংখ্যা দাঁড়িয়েছে প্রায় ১ লক্ষ ২০ হাজার ৪১৪। এছাড়াও রয়েছে পর্যটক, স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থী এবং পার্শ্ববর্তী এলাকা থেকে দার্জিলিং শহরে আসা মানুষ। সেই সংখ্যা যোগ করলে দার্জিলিং শহরের দৈনিক জলের ২ লক্ষেরও বেশি মানুষের জলের চাহিদা মেটানোর চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্বভাবতই শহরের পানীয় জলের চাহিদা মেটাতে এখন অন্য উৎস থেকে জল আনতে হচ্ছে। সেখানেও পর্যাপ্ত জল মিলছে না। তাই পুরসভা জলের চাহিদা মেটাতে পারছে না। ওই অবস্থায় রমরমিয়ে চলছে জলের কালোবাজারি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, প্রাকৃতিক উত্স থেকে পিক আপ ভ্যানে আনা ২টি ট্যাঙ্ক জল বিক্রি হচ্ছে সাড়ে ৫০০ টাকায়। দূরের এলাকা হলে সেটাই বেড়ে হচ্ছে ৮০০ টাকা। দার্জিলিংয়ের হোটেল মালিক বিজয় খান্না জানান, গ্রীষ্মের মরশুমে প্রতিবছর দিনে ৫ ট্রাক বোঝাই জলের ড্রাম কিনতে হয়। ট্রাকে ৪ হাজার লিটার করে জল থাকে। একটি ট্রাকের জন্য খরচ পড়ে ১ হাজার টাকা। স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, রাতে পিক আপ ভ্যান আসে। তার জন্য অপেক্ষা করতে হয়। পুরসভার ম্যানেজমেন্টের ত্রুটির কারণে জল কিনতে হচ্ছে।