• অন্যের সই করা অন্যায়, সাফ কথা শোভনদেবের, তোলপাড় তৃণমূলের অন্দরে
    এই সময় | ৩০ মে ২০২৬
  • এই সময়: কে সই করেছেন, আর কে করেননি? বিধানসভার বিরোধী দলনেতা বাছতে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের চিঠি ঘিরে তুমুল অস্বস্তি জোড়াফুলে!শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা বাছতে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের বৈঠকের পরে যে চিঠি পাঠানো হয়েছিল বিধানসভার সচিবালয়ে, সেই চিঠিতে কে সই করেছেন আর কে করেননি, কারও বদলে অন্য কেউ সই করে দিয়েছেন কি না— বিধানসভার সচিবের নালিশের ভিত্তিতে গোটা ঘটনার অনুসন্ধান শুরু করেছে সিআইডি। বৃহস্পতিবার তৃণমূল বিধায়ক নয়না বন্দ্যোপাধ্যায়, তাপস মাইতি ও বাহারুল ইসলামের বাড়িতে গিয়েছিল তদন্তকারীদের টিম। সিআইডি ইতিমধ্যে কথা বলেছে বেলেঘাটার বিধায়ক তথা তৃণমূলের এক মুখপাত্রের সঙ্গেও। শুক্রবার আবার তদন্তকারীরা যান রাজ্যের প্রাক্তন মন্ত্রী তথা বোলপুরের তৃণমূলের বিধায়ক চন্দ্রনাথ সিনহার বাড়িতে। এ নিয়ে সিআইডি অনুসন্ধান তো চলছেই, তবে দলের অন্দরে অস্বস্তি বাড়িয়েছে ক্যানিং পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক বাহারুলের মন্তব্য। তিনি স্পষ্ট বলেছেন, ‘৬ মের যে চিঠিতে সইয়ের কথা বলা হচ্ছে, সে দিন আমি বৈঠকেই যাইনি। তা হলে সইটা ভূতে করেছে। দল কেন আমার সঙ্গে এ রকম করল, সেটা আমি জানি না।’ বাহারুলের এই মন্তব্য নিয়ে অবিশ্বাসের বাতাবরণ তৈরি হয়েছে জোড়াফুলের অন্দরেই।

    অস্বস্তি কাটাতে এ দিন বিধানসভার বাইরে সাংবাদিক বৈঠক করেন শোভনদেব নিজে। তিনি বলেন, ‘বাহারুলের সবার আগে আমাদের সঙ্গে কথা বলা উচিত ছিল। তা হলে ব্যপারটা ক্লিয়ার হয়ে যেত। ও নতুন ছেলে। ও এখানকার নিয়মকানুন জানে না।’ কিন্তু বাহারুল কি ওই বৈঠকে উপস্থিত ছিলেন? শোভনদেবের সতর্ক উত্তর, ‘একটা সই রয়েছে দেখেছি। আমার পক্ষে তো প্রত্যেকটা ছেলেকে চেনা সম্ভব নয়। (৬ তারিখ) আমরা একদিকে বসেছিলাম, আর একটি ছেলে ঘুরে ঘুরে সই করাচ্ছিল। যারা বসেছিল, তাদের সবার সই করিয়েছে। কে সই করেছে, কে করেনি, সেটা বোঝার উপায় নেই। বাহারুল বলেছে, এটা ওর সই নয়। কে সই করেছে, সেটা তা হলে আমাদের সঙ্গে কথা বলে জানালে ভালো হতো।’ যদিও তৃণমূলের এক মুখপাত্রের যুক্তি, ‘বিরোধী দলনেতা পদটির সাংবিধানিক স্বীকৃতির জন্য যে সংখ্যা প্রয়োজন হয়, তার থেকে অনেক বেশি বিধায়ক সংখ্যা নিয়ে শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় তাঁর বক্তব্য জমা দিয়েছেন। তার পরের অংশ নিয়ে কোনও মন্তব্য করছি না। বিষয়টা সিনিয়ররা দেখছেন, দল দেখছে।’ ওই মুখপাত্রের বাড়িতে বৃহস্পতিবার সিআইডি টিম গিয়েছিল। সে সময়ে তিনি বাড়ি ছিলেন না। তাঁর দাবি, সিআইডি অফিসাররা এ দিন ফের আসবেন বলে জানালেও বিকেল ৩টে পর্যন্ত তদন্তকারীরা কেউ আসেননি।

    তবে বিষয়টি নিয়ে এ দিন তৃণমূলের পরিষদীয় দলে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সূত্রের দাবি। সেই বৈঠকে বিধানসভার প্রাক্তন স্পিকার বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন। সূত্রের দাবি, তাঁর বিরোধী দলনেতা হওয়া বিষয়টিতে যে ভাবে ‘সই জাল’ করার অভিযোগ উঠেছে, তাতে বর্ষীয়ান বিধায়ক শোভনদেব নিজেও অস্বস্তিতে। ঘনিষ্ঠ মহলে তিনি বলেছেন, ‘অন্যের সই করা অন্যায়। আমি অন্যায়কে সমর্থন করি না। তাতে আমি বিরোধী দলনেতা থাকি বা না থাকি।’ তবে এই ইস্যুতে রাজ্যের শাসকদল অতি–সক্রিয়তা দেখাচ্ছে বলেও অভিযোগ শোভনদেবের।

    পরিষদীয় দলের নেতা বা অন্যান্য পদাধিকারীর নির্বাচন পরিষদীয় দলের বৈঠকেই করতে হয়। বিধানসভার সচিবালয় সূত্রের খবর, তৃণমূলের ক্ষেত্রে প্রথমে সেটা হয়নি। সেই মর্মে দলের তরফে সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বাক্ষরিত একটি চিঠি পাঠানো হয় বিধানসভায়। কিন্তু তা গৃহীত হয়নি। ৬ মে বৈঠক থেকে বেরিয়ে একাধিক বিধায়ক সংবাদমাধ্যমে বলেছিলেন, পরিষদীয় দলের নেতা বা অন্যান্য পদাধিকারী কে হবেন, তা ঠিক করার ভার দেওয়া হয়েছে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। বিধানসভা অভিষেকের চিঠি প্রত্যাখ্যান করলে ১৯ মে কালীঘাটে ফের যে বৈঠক হয়, সেখানে পরিষদীয় দলের সিদ্ধান্তে স্বাক্ষর করানো হয় বিধায়কদের। একাধিক বিধায়ক তখন দাবি করেছিলেন, সেই সই তাঁদের করানো হয়েছিল ৬ মে তারিখের কার্যবিবরণীতে। এখানেই মূল জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে খবর।

    এই সংক্রান্ত অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্তে নেমে এ দিন সিআইডির তদন্তকারীরা যান বোলপুরের বিধায়ক চন্দ্রনাথের বাড়িতে৷ ছোট ও বড় হরফে বোলপুরের তৃণমূল বিধায়কের সই সংগ্রহ করে কলকাতা ফেরেন তদন্তকারীরা৷ এই প্রসঙ্গে চন্দ্রনাথ বলেন, ‘ওদের সন্দেহ আমরা নাকি বিরোধী দলনেতা নির্বাচন করিনি৷ তাই সই নিয়ে গেল, সেটা জাল কি না দেখার জন্য৷ আমি অফিসারদের পরামর্শ দিলাম, এ সবের মধ্যে দিয়ে বিভ্রান্তি না ছড়িয়ে বিধায়কদের ডেকে বললেই পারতেন, বিরোধী দলনেতাকে আমরা সমর্থন করি কি না৷ তার জন্য কেস করে মানুষকে হেনস্থা করা ঠিক নয়৷’

  • Link to this news (এই সময়)