এই সময়: এক বছর আগে বিজ্ঞপ্তি জারি করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। সেই সময়ে বাংলায় তৎকালীন তৃণমূল সরকারের কাছেও এসেছিল জনগণনা প্রক্রিয়া শুরু করার চিঠি। তৎকালীন রাজ্য সরকার এ নিয়ে কোনও পদক্ষেপ করেনি। তবে জনগণনা নিয়ে রাজনীতি করা উচিত নয় বলে পরিষ্কার জানালেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শুক্রবার তিনি বলেন, ‘আমি এটা নিয়ে রাজনীতি করতেও চাই না। আগের সরকার যা করেছিল তা রাজনীতি ছাড়া কিছু নয়।’
বঙ্গে বিজেপির সরকার ক্ষমতায় আসার পরে ১১ মে রাজ্যে জনগণনার বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়। শেষ পর্যন্ত আগামী ১ অগস্ট থেকে রাজ্যে চালু হতে চলেছে জনগণনার কাজ। মুখ্যমন্ত্রী এ দিন সাংবাদিক বৈঠকে জানান, বাংলাদেশি অনুপ্রবেশকারীদের জন্য রাজ্যের জনবিন্যাস বদলে গিয়েছে। সেই জন্যই জনগণনা চালু হওয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে এ দিন দিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়ালও জানিয়েছেন, অবৈধ ভাবে ভারতে অনুপ্রবেশ করা ২৬৮০ জন বাংলাদেশি নাগরিকের তথ্য যাচাইয়ের জন্য সে দেশের সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে বিস্তারিত তথ্য এলেই ওই অনুপ্রবেশকারীদের বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হবে।
এ দিন নবান্নে সেন্সাস সংক্রান্ত বৈঠক শেষে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘জনগণনার সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। সাংবিধানিক দায়বদ্ধতা রয়েছে।’ জনগণনা প্রক্রিয়া নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করার জন্য পশ্চিমবঙ্গের সব স্তরের নাগরিকের সাহায্যও চেয়েছেন তিনি। শুভেন্দুর কথায়, ‘পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে বাংলাদেশের ৬০০ কিলোমিটার সীমান্তে কোনও বেড়া নেই। তাই অনুপ্রবেশের মাধ্যমে জনবিন্যাসের চরিত্রের পরিবর্তন হয়েছে ওই এলাকাগুলিতে। তার সঙ্গে সরাসরি সংযোগ না-থাকলেও আমাদের রাজ্যের ক্ষেত্রে এই জনগণনা খুব গুরুত্বপূর্ণ।’ পূর্বতন তৃণমূল সরকার বাংলাদেশ সীমান্তে নজরদারি চৌকি এবং বেড়া বসানোর জন্য বিএসএফকে জমি না দেওয়ায় বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ নিয়ন্ত্রণ করা যায়নি বলে অভিযোগ করে তিনি বলেন, ‘কী ভাবে লোক ঢুকেছে, তা আপনারা টিভিতে দেখেছেন।’
দেশে এই প্রথমবার সেন্সাস প্রক্রিয়াটি হবে ডিজিটাল পদ্ধতিতে। ফলে বাড়ি বাড়ি তাড়া তাড়া কাগজ নিয়ে গিয়ে তথ্য সংগ্রহের দিন শেষ। পুরো কাজটি হবে মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে। তার থেকেও বড় কথা জনগণনায় নাগরিকেরা নিজেদের তথ্য নিজেরাই পোর্টালে আপলোড করতে পারবেন। নির্দিষ্ট অ্যাপের মাধ্যমে সেলফ এনিউমারেশন বা স্ব-গণনা পদ্ধতিতে পরিবারের তথ্যও আপলোড করা যাবে। মোট দু’টি পর্যায়ে হবে পুরো জনগণনার কাজ। আগামী বছর সেপ্টেম্বরে শেষ হবে জনগণনার কাজ।
বাংলার পূর্বতন সরকারের ভূমিকাকে ‘দুর্ভাগ্যজনক’ বলে অভিযোগ করেছেন শুভেন্দু। তাঁর কথায়, ‘রাজনৈতিক কারণে জনগণনার কাজ শুরু করেনি আগের সরকার। এতে সরকারের অনুমতিরও প্রয়োজন ছিল না। পূর্বতন মুখ্যসচিব চাইলে বিজ্ঞপ্তি জারি করে তা চালু করে দিতে পারতেন। কিন্তু তিনি তা না করে রাজনৈতিক সম্মতির অপেক্ষায় ছিলেন।’ মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘আগের সরকার জনগণনার কোনও কাজ না-করার ফলে অন্য রাজ্যগুলি অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে। আমরা পিছিয়ে পড়েছি।’ সেই খামতি ঢাকতে তাঁর সরকার দ্রুত পদক্ষেপ করেছে বলে জানিয়ে শুভেন্দু বলেন, ‘দায়িত্ব নেওয়ার পরে আমি ১১ মে মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকে মুখ্যসচিবের উপস্থিতিতে কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। তার মধ্যে অন্যতম ছিল জনগণনার কাজ শুরু করা।’
শুভেন্দু জানিয়েছেন, আগামী ১ অগস্ট থেকে পশ্চিমবঙ্গে জনগণনার কাজ শুরু হবে। চলবে আগামী ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। জনগণনা সংক্রান্ত গোটা প্রক্রিয়ার দায়িত্বে থাকবেন ‘ডিরেক্টরেট অফ সেন্সাস অপারেশনস’-এর অধিকর্তা রশ্মি কমল। ১-১৫ অগস্ট প্রথম পর্বের জন্য তথ্য জমা নেওয়ার কাজ শুরু হবে। মুখ্যমন্ত্রী স্ব-গণনা পদ্ধতিতে নিজের তথ্য নিজে আপলোড করে তার সূচনা করবেন। প্রথম পর্বে হবে হাউস লিস্টিং অ্যান্ড হাউস সেন্সাস অপারেশন (এইচএলও)। পরের পর্ব— পপুলেশন এনিউমারেশন। ১৬ অগস্ট থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত চলবে এই প্রক্রিয়া। এই পর্বের বিষয়ে পরে বিশদে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা হবে। এর পরেও আনুষঙ্গিক কাজ চলতে থাকবে, যা শেষ হবে আগামী বছর ১ মার্চ।
দেশে শেষ বার জনগণনা হয়েছিল ২০১১–তে। প্রায় ১৫ বছর পরে এই জনগণনায় এ বার সরকারি কর্মচারীরা তথ্য সংগ্রহ করবেন নিজেদের মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। তাঁদের জন্য বিশেষ একটি অ্যাপ থাকবে। সংগৃহীত তথ্য সেই অ্যাপের মাধ্যমে কেন্দ্রীয় সার্ভারে আপলোড করতে হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের একটি সূত্র জানিয়েছে, বিশেষ সেই অ্যাপ তৈরির কাজ শেষের মুখে। রশ্মি কমল জানিয়েছেন, এই ডিজিটাল পরিকাঠামোর ফলে তথ্য সংগ্রহ যেমন নির্ভুল হবে তেমনই আসবে স্বচ্ছতাও। সময়ও লাগবে অনেক কম।
এ বার জনগণনার কাজে ব্যবহার করা হবে, সেন্সাস ম্যানেজমেন্ট অ্যান্ড মনিটরিং সিস্টেম (সিএমএমএস) পোর্টাল। গণনার কাজের সুবিধার্থে ‘এইচএলও’ এবং ‘এইচএলবিসি’ অ্যাপ ব্যবহার করা হবে। উন্নয়ন ও অগ্রগতির বার্তা সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে এই জনগণনার দু’টি বিশেষ ম্যাসকট বা প্রতীক উন্মোচন করা হয়, তাদের নাম দেওয়া হয়েছে ‘বিকাশ’ এবং ‘প্রগতি’।
বাংলাদেশি অনুপ্রবেশ প্রসঙ্গে এদিন দিল্লিতে বিদেশ মন্ত্রকের মুখপাত্র রণধীর জয়সওয়াল বলেন, ‘ভারতে বসবাসকারী সমস্ত অবৈধ বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ২,৬৮০টি বা তারও বেশি মামলা সে দেশের সরকারের কাছে পাঠানো হয়েছে। যাতে আমরা যে নামগুলি দিয়েছি, তাঁদের নাগরিকত্ব তারা যাচাই করতে পারে। এই নাগরিকত্ব যাচাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পন্ন হলেই আমরা ওই বাংলাদেশি নাগরিকদের দেশে ফেরত পাঠাতে সক্ষম হব।’
তিনি আরও বলেন, ‘অনেক ক্ষেত্রেই এই যাচাইকরণের কাজ পাঁচ বছর বা তারও বেশি সময় ধরে আটকে রয়েছে। আমাদের প্রত্যাশা, এই নির্দিষ্ট বিষয়ে আমরা বাংলাদেশের কাছ থেকে দ্রুত উত্তর পাব, যাতে দ্বিপাক্ষিক চুক্তির ভিত্তিতে এই মানুষগুলোকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো যায়।’