দিগন্ত মান্না, পাঁশকুড়া
স্কুলে গরমের ছুটি চলছে। কিন্তু ‘ছুটি ছুটি’ মেজাজের মধ্যেই বেজে উঠছে ফোন। তারপরে এ কথায়, সে কথায় ঘুরে-ফিরে পাক খাচ্ছে একটাই প্রশ্ন— ‘কী, বন্দে মাতরম্ রেডি তো?’ শিক্ষক, পড়ুয়া, অভিভাবক, গানের শিক্ষিকা— সে প্রশ্ন থেকে রেহাই পাচ্ছেন না প্রায় কেউই!
রাজ্যে পালাবদলের পরেই বিজেপি সরকার প্রতিটি স্কুলে ‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক করেছে। গরমের ছুটিতে সরকারি নির্দেশিকা প্রকাশিত হওয়ায় মহড়ারও তেমন সুযোগ মেলেনি। এ দিকে, আগামী সোমবার খুলবে স্কুল। তাই বেশ কিছু স্কুলের হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপে ‘বন্দে মাতরম্’-এর ইউটিউব লিঙ্ক শেয়ার করে অভিভাবকদের উদ্দেশে বলা হয়েছে, ‘দায়িত্ব নিয়ে গানটি পড়ুয়াদের শেখান। যাতে ছুটির পরে স্কুলে গানটি গাইতে তাদের কোনও অসুবিধা না হয়।’ শিক্ষক-শিক্ষিকারাও দিনরাত ইউটিউব চালিয়ে সে গান শুনছেন। ‘বন্দে মাতরম্’ ‘তুলতে’ ভিড় বাড়ছে পাড়ার গানের স্যর কিংবা দিদিমণিদের বাড়িতেও।
গত ১৪ মে রাজ্য সরকার বিজ্ঞপ্তি দিয়ে জানিয়ে দেয়, সমস্ত সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রার্থনাসভায় ‘বন্দে মাতরম্’ গাইতে হবে। ১১ মে থেকে স্কুলে গরমের ছুটি শুরু হয়েছে। ৩১ মে ছুটি শেষ হয়ে স্কুল খুলবে আগামী ১ জুন, সোমবার।
পাঁশকুড়ার পূর্বচিল্কা লালচাঁদ হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক গৌতমকুমার দাস বলছেন, ‘সরকারি নির্দেশিকা আসার সঙ্গে সঙ্গে স্কুলের হোয়াটস্অ্যাপ গ্রুপে গানের কথা পোস্ট করে দিয়েছি। যাতে পড়ুয়ারা সঠিক উচ্চারণ করতে পারে। সেই সঙ্গে ইউটিউব থেকে বন্দে মাতরম্ গানটি ডাউনলোড করেও গ্রুপে দিয়েছি। সকলেই শুনছে। অনুশীলন করছে। আশা করছি, প্রেয়ার লাইনে গাইতে কোনও সমস্যা হবে না।’
কোলা ইউনিয়ন হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক বিপ্লব ভট্টাচার্যের কথায়, ‘আমাদের স্কুলে সাউন্ড সিস্টেম আছে। আমরা মেমোরি কার্ডে বন্দে মাতরম্ গানটি লোড করে নিয়েছি। সোমবার প্রার্থনা-সভায় সাউন্ড বক্সে বন্দে মাতরম্ বাজবে। পড়ুয়া-শিক্ষক সকলেই শুনে শুনে গলা মেলাবেন। প্রথম প্রথম হয়তো একটু বেসুরো হবে। তবে, কয়েক দিন পরে ঠিক হয়ে যাবে।’ সম্প্রতি পূর্ব মেদিনীপুরের একাধিক চক্রের অবর বিদ্যালয় পরিদর্শকরা প্রাথমিক স্কুলের প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে একটি ভার্চুয়াল মিটিং করেছেন। সেখানে প্রধান শিক্ষকদের একাংশ বন্দে মাতরম্-এর দু’টি স্তবক গাইবার প্রস্তাব দেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষকদের সেই প্রস্তাব পত্রপাঠ নাকচ করে জানিয়ে দেওয়া হয়, পুরো গানটিই গাইতে হবে। প্রয়োজনে সাউন্ড সিস্টেমের সাহায্য নিতে হবে।
নামপ্রকাশে অনিচ্ছুক পূর্ব মেদিনীপুর জেলার একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলছেন, ‘খালি গলায় গাইলে বেসুরো হতে পারে। স্কুলে সাউন্ড সিস্টেম নেই। কিন্তু সরকারি নির্দেশ তো মানতেই হবে। তাই স্কুলের নিজস্ব তহবিল থেকে একটি পোর্টেবল সাউন্ড সিস্টেম কিনেছি। সোমবার থেকে প্রেয়ার লাইনে সাউন্ড সিস্টেমেই বন্দে মাতরম্ চালিয়ে সকলে গলা মেলাব।’
হলদিয়া চকদীপা হাইস্কুলের সংস্কৃতের শিক্ষক কার্তিক সামন্ত বলেন, ‘সংস্কৃতের উচ্চারণ বেশ কঠিন। স্কুল খুললে পড়ুয়াদের বন্দে মাতরম্ গানের উচ্চারণ শেখাব। কয়েকদিন অভ্যাস করলে ছাত্রছাত্রীরা ঠিক শিখে নেবে।’ শিশুশিল্পী হিসেবে রাজ্যের অত্যন্ত পরিচিত মুখ কাঁথির অতনু মিশ্র। কন্টাই মডেল ইনস্টিটিউটের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র অতনুর কথায়, ‘আমি মঞ্চে বিভিন্ন শিল্পীর গান গাই। তবে বন্দে মাতরম্ কখনও গাওয়া হয়নি। সোমবার থেকে স্কুলের প্রার্থনাসভায় সমবেত কণ্ঠে গানটি গাইব। অনুষ্ঠানের ফাঁকে তাই গানটি মন দিয়ে শুনছি। যাতে স্কুলে শুদ্ধ ভাবে গাইতে পারি।’
‘বন্দে মাতরম্’ গাওয়া বাধ্যতামূলক হওয়ায় স্কুলের নিজস্ব প্রার্থনা সঙ্গীত বাদ পড়তে পারে— এমন আশঙ্কাও করছেন অনেকে। পাঁশকুড়ার পূর্ব বাকুলদা নিম্ন বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রবীন্দ্রনাথ শাসমল যেমন বলছেন, ‘প্রতিদিন প্রার্থনা-সভায় স্কুলের নিজস্ব একটি প্রার্থনা সঙ্গীত এবং জাতীয় সঙ্গীত গাওয়া হয়। এখন বন্দে মাতরম্ যুক্ত হলো। প্রার্থনা সভার সময়ও বেড়ে যাবে। তাই আমরা সিদ্ধান্ত নিয়েছি স্কুলের নিজস্ব প্রার্থনা সঙ্গীত আপাতত বন্ধ থাকবে। সরকারি নির্দেশ মেনে বন্দে মাতরম্ নিয়মিত গাওয়া হবে।’
পাঁশকুড়ার একটি সঙ্গীত সংস্থার অধ্যক্ষ অজিত মণ্ডলের কথায়, ‘আমার কাছে বহু ছাত্রছাত্রী গান শেখে। বহু অভিভাবক এখন ভিড় করছেন ছাত্রছাত্রীদের স্বরলিপি-সহ বন্দে মাতরম্ গানটি শিখিয়ে দেওয়ার জন্য। গানের তালিম চলছে। ইতিমধ্যে অনেকেই ভালো ভাবে গানটি শিখে নিয়েছে।’