প্রচার-কর্মসূচি-বৈঠক-সমাবেশই সার! বাল্যবিবাহের অভিশাপ-মুক্ত একবিংশ শতাব্দীতে হতে পারেনি এই ‘অভাগা দেশ’! পূর্ব এবং মধ্য ভারতের বেশ কিছু অংশে আজও আঠেরো পেরোনোর আগেই বিয়ে হয়ে যাচ্ছে বহু কিশোরীর। আইনের ফাঁকফোকর গলেই চার হাত এক করে দেওয়া হচ্ছে চুপিসারে। যে বয়সে এক উজ্জ্বল তথা সফল কেরিয়ার গড়ার লক্ষ্যে পূর্ণ উদ্যম নিয়ে পা বাড়াতে পারত ‘লক্ষ্মী’রা, ঠিক তখনই তাঁদের স্বপ্ন-ডানা ছেঁটে, জোর-জবরদস্তি ‘স্বামীর ঘর’ করতে পাঠিয়ে দেওয়ার দুষ্টচক্র জেন-জি যুগেও স্বমহিমায় বর্তমান। চমকপ্রদভাবে, রাজ্যনিরিখে বিচার করলে যে দু’টি নাম সর্বাগ্রে আসে, তারা হল বাংলা এবং ঝাড়খণ্ড। বিশেষ করে বাংলার শহরাঞ্চল এবং গ্রামাঞ্চল, দুই দিকেই বাল্যবিবাহের ধারা দুরন্ত গতিতে চলেছে।
স্যাম্পল রেজিস্ট্রেশন সিস্টেম (এসআরএস) স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিপোর্ট, ২০২৪-এর সার্ভে-ভিত্তিক পরিসংখ্যানই এ কথা বলছে। তাৎপর্যপূর্ণভাবে, এই দিক দিয়ে বিচার করলে দিল্লির ‘পারফরম্যান্স’ বেশ ভাল। কারণ পরিসংখ্যানের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে, দিল্লিতে বাল্যবিবাহের কোনও ঘটনাই নথিবদ্ধ হয়নি। ‘জিরো চাইল্ড ম্যারেজ’। কেরলের ফলও সন্তোষজনক। মাত্র ০.০৪ শতাংশ। রেজিস্ট্রার জেনারেল অফ ইন্ডিয়ার তরফে প্রকাশিত সার্ভে-রিপোর্টের যাবতীয় পরিসংখ্যান খুঁটিয়ে দেখলেই বোঝা যাবে– প্রসঙ্গ যখন বাল্যবিবাহ, তখন দেশের সামগ্রিক পরিস্থিতিটা ঠিক কী রকম? দেখা গিয়েছে, দেশের অধিকাংশ মেয়েরা ২১-এর গণ্ডি পেরিয়ে তবেই ছাঁদনাতলায় যান। কিন্তু মধ্য এবং পূর্ব ভারতের কিছু অংশে ছবিটা বিপরীত। সেখানে এখনও বাল্যবিবাহ বহাল তবিয়তে চলছে।
২০২৪ সালে দেশে প্রায় ২.১ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়েছে আঠেরো পেরোনোর আগেই। ১৮ থেকে ২০ বছরের মধ্যে বিয়ে করেছেন, এমন মেয়েদের হার ২৪.৫ শতাংশ। আর ২১ পেরিয়ে বা তারও বেশি বয়সে বিয়ের পিঁড়িতে বসেছেন, এই সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। প্রায় ৭৩.৫ শতাংশ বা তিন-চতুর্থাংশ। সব মিলিয়ে বলতে গেলে সার্ভের ফল অনুযায়ী দেখা যাচ্ছে, ২০২৪ সালে দেশের প্রতি চার জন মেয়ের মধ্যে একের বেশির বিয়ে ২১-এ পা দেওয়ার আগেই হয়ে গিয়েছে। আর এই নিরিখেই ‘এগিয়ে বাংলা’। কারণ পরিসংখ্যান বলছে, দেশের রাজ্যগুলির মধ্যে সবচেয়ে বেশি মেয়েরা, যাঁদের বিয়ে আঠেরো পেরোনোর আগে হয়েছে–বাংলারই বাসিন্দা। প্রায় ৬.৩ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গের পর রয়েছে ঝাড়খণ্ড। সেখানে হার ৪.৯ শতাংশ। তৃতীয় ছত্তিশগড় ২.৯ শতাংশ। গ্রামীণ ভারতে আঠেরো পেরোনোর আগেই বিয়ে করেছেন, এমন মেয়েদের হার ২.৪ শতাংশ। শহুরে ভারতে তা ১.১ শতাংশ।
গ্রামাঞ্চলের নিরিখেও বাংলায় বাল্যবিবাহের হার বেশি ৫.৯ শতাংশ। দ্বিতীয় সেই ঝাড়খণ্ড ৫.৮ শতাংশ। শহরেও এই ক্ষেত্রে মুকুট ধরে রেখেছে বাংলা। হার ৭.৬ শতাংশ। শহরভিত্তিক হিসাবে জাতীয় গড় যেখানে ১.১ শতাংশ! দিল্লি, কেরলের পাশাপাশি হরিয়ানা, হিমাচলের ফলও যথেষ্ট আশাপ্রদ। রিপোর্ট অনুযায়ী, ভারতে মেয়েদের বিয়ের গড় বয়স ২৩.১ বছর। বিশেষজ্ঞদের দাবি, বাল্যবিবাহের সঙ্গে এক গুচ্ছ সামাজিক সমস্যা তথা ব্যধি সম্পর্কিত। যেমন মেয়েদের স্কুলছুটের বর্ধিত হার, উপযুক্ত বয়সের আগেই অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়া, তাড়াতাড়ি মা হওয়ার ফলে বিবিধ স্বাস্থ্যগত জটিলতা প্রভৃতি। প্রসঙ্গত, অসমের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা আগেই ঘোষণা করেছিলেন, চলতি বছরের মধ্যে রাজ্যে বাল্যবিবাহ বন্ধ করবেন। এই ধরনের উদ্যোগ এহেন ঘৃণ্য প্রথা দূরীকরণে অবশ্যই প্রশংসনীয়।