সোনারপুরে প্রবল বিক্ষোভের মুখে পড়লেন তৃণমূল সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। নিহত দলীয় কর্মীর বাড়িতে যাওয়ার সময়ে বিক্ষোভ প্রথম দিকে শুধু ‘চোর’ স্লোগানেই সীমিত ছিল। কিন্তু ধীরে ধীরে সেই জনরোষ বাড়ে। অভিষেককে লক্ষ্য করে ছোড়া হয় ডিম-জুতো-ঢিল। পরে তাঁকে রাস্তায় মারধরও করা হয় বলে অভিযোগ। ধস্তাধস্তিতে তৃণমূল সাংসদের জামাও ছিঁড়ে গিয়েছে।
শনিবার বিকেলে সোনারপুরে নিহত দলীয় কর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়িতে যান অভিষেক। পথে কামালগাছির কাছে তাঁকে কালো পতাকা দেখিয়ে একপ্রস্ত বিক্ষোভ চলে। তা উপেক্ষা করেই অভিষেক গাড়ি করে পৌঁছে যান গন্তব্যের উদ্দেশে। কিন্তু সঞ্জুর বাড়ির এলাকায় প্রবল বিক্ষোভের মুখে তাঁর গাড়ি আটকে যায়। এর পরে গাড়ি থেকে নেমে বাইকে চড়ে দলীয় কর্মীর বাড়ি যাওয়ার চেষ্টা করেন তৃণমূল সাংসদ। সেই সময়ে ভিড়ের মধ্য়ে থেকে তাঁকে মারার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগ, তাঁর মাথায়-ঘাড়ে-গায়ে চড়-ঘুষি মারা হয়। এই পরিস্থিতিতে অভিষেককে বাঁচাতে তাঁর মাথায় হেলমেট পরিয়ে দেন নিরাপত্তারক্ষীরা। ওই সময়ে অভিষেককে লক্ষ্য করে ডিম, জুতো ও ঢিল ছোড়া হয়। ঝাঁটা দিয়ে মারারও চেষ্টা হয় বলে অভিযোগ।
জনরোষের জেরে বাইকেও সঞ্জুর বাড়ি যেতে পারেননি অভিষেক। শেষমেশ তিনি হেঁটে যাওয়ারই সিদ্ধান্ত নেন। আর সেই সময়েই রাস্তায় তাঁকে মারধর করা হয় বলে অভিযোগ। হাতাহাতি, প্রবল ধস্তাধস্তিতে রাস্তায় পড়েও গিয়েছিলেন অভিষেক। তাঁর জামাও ছিঁড়ে গিয়েছে। সেই অবস্থাতেই তিনি উঠে নিহত দলীয় কর্মীর বাড়িতে যান। দেখা করেন তাঁর মা-বাবার সঙ্গে।
পরে সেই বাড়িতে বসেই অভিষেক অভিযোগ করেন, তাঁকে প্রাণে মারার চেষ্টা হচ্ছে। তৃণমূল সাংসদের কথায়, ‘আমাকে খুন করতে চাইছে। করুক না। আমার লাশ বেরোক এখান থেকে। আমি যে ভাবে এলাম, আমি সেই ভাবেই বেরিয়ে যেতে পারতাম। কিন্তু আমি বেরোব না। কারণ আমি বেরিয়ে গেলে এই পরিবারের লোকগুলোর কী হবে, সেটা ভেবে দেখুন।’
অভিষেকের দাবি, তাঁর কর্মসূচির কথা জেলা পুলিশ-প্রশাসনকে আগেই জানানো হয়েছিল। তার পরেও কোনও নিরাপত্তার আয়োজন করা হয়নি। কার্যত তাঁকে বিক্ষোভের মুখে ঠেলে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করেন। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকেও নিশানা করেছেন অভিষেক। বলেছেন, ‘যারা তৃণমূলকে চোর বলছে, তারা কোনও মুখ্যমন্ত্রীকে হাত বার করে ক্যামেরার সামনে টাকা নিতে দেখেছে? দু’কান কাটা, নির্লজ্জের মতো এখনকার মুখ্যমন্ত্রীকে টাকা নিতে দেখা গিয়েছে। ঘুষ নিয়েছিল।’
অভিষেকের বক্তব্য, সোনারপুরের মানুষ তাঁকে স্বাগত জানিয়েছেন। স্থানীয়েরা কেউ হামলায় জড়িত নন। উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভাবে আগে থেকে দক্ষিণ ২৪ পরগনার ওই এলাকায় লোক ঢুকিয়েছে বিজেপি। নিজের ভাঙা চশমা দেখিয়ে বললেন, ‘মেরে ফেলতে চেয়েছিল আমাকে। আমার মাথা দু’টুকরো হয়ে যেত আজকে। আমার সঙ্গে দু’তিনজন মহিলা সহকর্মী এসেছেন। তাঁদের লাথি মেরে রাস্তায় ফেলে দেওয়া হচ্ছে। এটা বাঙালির সংস্কৃতি? আমার দলের এক জন কর্মী মারা গিয়েছে। আমি সেই বাড়িতে দেখা করতে আসতে পারি না? আমার চোখে সাত বার অস্ত্রোপচার হয়েছে। ইট-পাটকেল ছুড়েছে। চশমার অবস্থা দেখুন। বিজেপি যদি এর সঙ্গে জড়িত না থাকে, তা হলে বিজেপি পদক্ষেপ করছে না কেন? আমি এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে হাইকোর্টেও যাব। সুপ্রিম কোর্টেও যাব।’
অভিষেক যখন নিহত দলীয় কর্মীর বাড়িতে, সেই সময়ে বিক্ষোভকারীদের একাংশকে ওই বাড়ির দরজায় ধাক্কা দিতেও দেখা গিয়েছে। সেখানে বিক্ষোভকারীদের মহিলাদের কেউ কেউ বলেন, ‘চোরের বাড়িতে চোর এসেছে! আমরা দিনের পর দিন বাড়ির বাইরে ছিলাম। তখন উনি কোথায় ছিলেন? এখন কেন এসেছেন।’ সেখানে দাঁড়িয়েও অভিষেককে পেটানোর হুঁশিয়ারি দিতে শোনা যায় কিছু বিক্ষোভকারী মহিলাকে।
বিকেল ৫টা নাগাদ নিহত দলীয় কর্মীর বাড়িতে পৌঁছেছিলেন অভিষেক। পরে পুলিশ এবং কেন্দ্রীয় বাহিনী সেখানে পৌঁছে সন্ধ্যা ৬টা নাগাদ তাঁকে বার করে আনে। সেই সময়েও তাঁকে ঘিরে স্লোগান দেওয়া হয়।
এই ঘটনা নিয়ে পরে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেন, ‘এই ঘটনার সঙ্গে বিজেপি যুক্ত নয়। তৃণমূল দক্ষিণ ২৪ পরগনায় গত পাঁচ বছর ধরে যে অত্যাচার করেছে, তাতে বিজেপি চাইলে, এখন তৃণমূলের নেতারা বাড়ি থেকেই বেরোতে পারতেন না। বিজেপি সংযম দেখিয়েছে বলেই তৃণমূলের নেতারা এ ভাবে বেরোতে পারছেন।’