• নিজের নামে চারটি, স্ত্রী-ছেলের নামে অ্যাকাউন্টেও ঢুকত টাকা, লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে বড় জালিয়াতি মুর্শিদাবাদে
    এই সময় | ৩১ মে ২০২৬
  • বাংলায় একটা প্রবাদ বাক্য রয়েছে, ‘কান টানলে মাথা আসে’। গত বুধবার বহরমপুর থানা এলাকার তৃণমূল কর্মী রাকিবুল ইসলাম ধরা পড়ার পরে যে ভাবে মুর্শিদাবাদ জেলায় লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পে একের পর এক ‘পুরুষ’ উপভোক্তা পুলিশের জালে ধরা পড়ছে, তাতে ওই প্রবাদ বাক্যের কথা স্মরণে আসছে জেলার মানুষের!

    রাকিবুলকে গ্রেপ্তারের পরে আদালতের নির্দেশে পুলিশ নিজেদের হেফাজতে নিয়ে জেরা করে জানতে পারে রঘুনাথগঞ্জের মুস্তাফিজুর রহমানের নাম। তাঁকে বৃহস্পতিবার রাতে গ্রেপ্তারের পরে শুক্রবার নিজেদের হেফাজতে নিয়ে বহরমপুর থানার পুলিশের জেরায় উঠে এসেছে রঘুনাথগঞ্জের তারিকুল ইসলামের নাম। শুক্রবার রাতে তারিকুলকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ শনিবার বহরমপুরে মুর্শিদাবাদ সিজেএম আদালতে হাজির করেছে।

    পুলিশ সূত্রে খবর, শুক্রবার রাতে রঘুনাথগঞ্জ থেকে তারিকুল ইসলাম নামে আরও একজনকে গ্রেপ্তার করে বহরমপুর থানার পুলিশ। তারিকুলের নামে চারটি, তাঁর স্ত্রী'র নামে তিনটি ও তাঁদের পাঁচ বছরের ছেলের নামে যে ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাতেও লক্ষীর ভাণ্ডারের টাকা ঢুকত।

    পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, ধৃত মুস্তাফিজুর প্রত্যেক মাসে লক্ষাধিক টাকা লক্ষীর ভাণ্ডার প্রকল্পের কমিশন বাবদ মোটা অঙ্কের টাকা পেতেন। সরকারি ওই প্রকল্পের টাকা পেতে রঘুনাথগঞ্জ এলাকায় কয়েকশো জনকে সুযোগ করে দিয়েছিলেন মুস্তাফিজুর। এ জন্য তাঁদের কাছ থেকে প্রতি মাসে অর্ধেক টাকা করে কমিশন বাবদ আয় করতেন।

    মুস্তাফিজুরকে জেরা করে তদন্তকারীরা জানতে পেরেছেন, মুর্শিদাবাদ জেলার শতাধিকের উপরে পুরুষ সদস্যের নামে ভুয়ো নথিপত্র তৈরি করে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের তালিকায় উপভোক্তা হিসেবে নথিভুক্ত করিয়েছিলেন। আধার কার্ড, ভোটার কার্ড ও লিঙ্কড মোবাইল নম্বরে কারচুপি করে পুরুষদের নাম মহিলাদের তালিকায় ঢুকিয়ে দেওয়া হতো। আরও চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো, এই উপভোক্তাদের অ্যাকাউন্টে সরকারি টাকা ঢোকা মাত্র সেই অর্থের অর্ধেক অংশ ‘কাটমানি’ হিসেবে তুলে দিতে হতো মূল পাণ্ডা মুস্তাফিজুরের হাতে।

    তদন্তে উঠে এসেছে, ধৃত হোটেল ব্যবসায়ী রাকিবুল শেখের রঘুনাথগঞ্জের রাজপুত বহড়া এলাকায় শ্বশুরবাড়ি। সেই সূত্রে কোনও এক আত্মীয়ের মাধ্যমে মুস্তাফিজুরের সঙ্গে পরিচয় হয় তাঁর। এর পর মুস্তাফিজুর ভুয়ো নথি বানিয়ে রাকিবুলের নামে একটি নয়, মোট তিনটি আলাদা অ্যাকাউন্টে বেআইনি ভাবে 'লক্ষ্মীর ভাণ্ডার'-এর টাকা ঢোকানোর ব্যবস্থা করে দিয়েছিলেন। প্রতি মাসের সেই দুর্নীতির টাকার অর্ধেক ভাগ চলে যেত মুস্তাফিজুরের পকেটে। শনিবার ওই একই কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে শফিকুল ইসলাম নামে এক তৃণমূল নেতাকে আটক করেছে ডোমকল থানার পুলিশ। শফিকুল সম্পর্কে ডোমকল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি তৃণমূলের সাহানা বিশ্বাসের স্বামী।

    ডোমকল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতি সাহানা বিশ্বাস বলেন, ‘বিষয়টি আমার জানা নেই। পুলিশ আমার স্বামীকে থানায় নিয়ে আসার পরে আমি এসেছি ডোমকল থানার আইসি-র কাছে বিষয়টি জানতে। পুলিশের সঙ্গে কথা বলার পরে ঠিক কী কারণে আমার স্বামীকে থানায় আটক করা হয়েছে, সে ব্যাপারে জানাতে পারব।’

    ডোমকল ব্লক কংগ্রেসের সভাপতি তৌহিদুল ইসলাম বলেন, ‘ডোমকল পঞ্চায়েত সমিতির সভাপতির স্বামী প্রভাব খাটিয়ে নিজের নামে লক্ষ্মী ভাণ্ডার প্রকল্পে নিয়মিত টাকা তুলতেন। সেই সঙ্গে ডোমকল ভাতশালাতে নিজের বাড়িতে এক রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাঙ্কের সিএসপি (কাস্টমার সার্ভিস পয়েন্ট) রয়েছে শফিকুলের নামে। সেখানে যাঁদের অ্যাকাউন্ট রয়েছে, তাঁদের আধার কার্ডের সঙ্গে নিজের মোবাইল নম্বর যোগ করে তাঁর অ্যাকাউন্ট নম্বর দিয়ে ওই সরকারি প্রকল্পের টাকা গত দু'বছর ধরে তুলেছেন। বিষয়টি ব্লক প্রশাসন জানতে পেরে তা বন্ধ করে পদক্ষেপ করেছে। ফলে পুলিশ তাঁকে আটক করেছে।’

  • Link to this news (এই সময়)