• জাপানি এনকেফালাইটিসের ছদ্মবেশ পাকড়াও, দিশা আইআইসিবি–র গবেষণায়
    এই সময় | ৩১ মে ২০২৬
  • অনির্বাণ ঘোষ

    জাপানি এনকেফালাইটিস (জেই) ভাইরাস কী ভাবে এক কোষ থেকে অন্য কোষে ছড়িয়ে পড়ে, কী ভাবেই বা ছদ্মবেশ ধরে ছারখার করে দেয় মস্তিষ্কের অন্দরমহল, তার পুঙ্খানুপুঙ্খ দিশা দেখালো যাদবপুরের ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ কেমিক্যাল বায়োলজি (আইআইসিবি)-র গবেষণা। যা এই ভাইরাসকে নিকেশ করার ক্ষেত্রে নতুন রাস্তার সন্ধান দিতে পারে—এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

    কেন না, জেই সংক্রমণ হলে, সেই ভাইরাসকে মেরে ফেলার কোনও চিকিৎসা নেই। চিকিৎসা হয় মূলত উপসর্গভিত্তিক। কয়েক দিন আগে আন্তর্জাতিক বিজ্ঞানপত্রিকা ‘এম-বায়ো’ জার্নালে প্রকাশিত গবেষণাপত্রের তাৎপর্য ঠিক সেখানেই। কারণ, আইআইসিবি-র গবেষকরা দেখিয়েছেন, কী ভাবে শরীরের নিজস্ব পরিবহণ ব্যবস্থাকে ব্যবহার করে রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থা বা ইমিউনিটির চোখ এড়িয়ে জেই ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ে শরীরে।

    এই গবেষণার নেতৃত্বে রয়েছেন আইআইসিবি-র ইনফেকশাস ডিজ়িজ়েস অ্যান্ড ইমিউনোলজি ডিভিশনের গবেষক সৌরীশ ঘোষ। গবেষণাপত্রের প্রথম লেখক (ফার্স্ট অথর) ভাগ্যশ্রী মল্লিক। এ ছাড়াও গবেষণায় সামিল ছিলেন অনন্যা মণ্ডল, অঙ্কিতা সরকার, তমোঘ্ন চক্রবর্তী, খাদিজা খান, দিলীপ কুমার এবং সুভাষচন্দ্র বিশ্বাস। তাঁদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জাপানি এনকেফালাইটিস ভাইরাস সংক্রমিত কোষ থেকে সরাসরি বেরিয়ে আসে না। বরং শরীরের নিজস্ব ক্ষুদ্র বুদবুদ-সদৃশ পরিবহণ ব্যবস্থা, যাকে ‘স্মল এক্সট্রাসেলুলার ভেসিকল’ বলা হয়, তার ভিতরে নিজেকে লুকিয়ে অন্য কোষে পৌঁছয়। বিজ্ঞানীদের মতে, এই পদ্ধতিতে ভাইরাস শরীরের প্রতিরোধ ব্যবস্থার নজর এড়িয়ে আরও দক্ষতার সঙ্গে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

    বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু)-র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এশিয়া ও পশ্চিম প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে ভাইরাল এনকেফালাইটিসের অন্যতম প্রধান কারণ জেই। প্রতি বছর প্রায় ৬৮ হাজার সংক্রমণের ঘটনা ঘটে বিশ্বজুড়ে। গুরুতর ক্ষেত্রে মৃত্যুঝুঁকি যেমন থাকে, তেমনই অনেকের দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক জটিলতাও দেখা দেয়। পক্ষাঘাতও বিরল নয়। এবং এ দেশে, এমনকী পশ্চিমবঙ্গেও এই কিউলেক্স মশাবাহিত এ সংক্রমণ প্রায়ই হানা দেয়।

    গবেষণার সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, ভাইরাসের সংক্রমণ ছড়ানোর নতুন কৌশল শনাক্ত করা। বিজ্ঞানীরা দেখেছেন, সংক্রমণের শুরুতেই কোষের ভিতরে থাকা ‘লিপিড ড্রপলেট’ বা চর্বি সঞ্চয়কারী ক্ষুদ্র গঠনটি দ্রুত বাড়তে থাকে। সাধারণত শক্তি সঞ্চয়ের কাজে ব্যবহৃত হলেও, ভাইরাস এই উপাদানটিকেই নিজের প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবহার করছে। এই লিপিড ড্রপলেট থেকেই পরে ভাইরাস বহনকারী ভেসিকল তৈরি হয়।

    সৌরীশ বলেন, ‘সাধারণত মনে করা হয়, ভাইরাস কোষ ভেঙে বাইরে বেরিয়ে আসে। কিন্তু আমাদের গবেষণায় দেখা গিয়েছে, জেই ভাইরাস অনেক সময়ে কোষকে না মেরেও শরীরের অন্য কোষে ছড়িয়ে পড়তে পারে। ভাইরাস শরীরের স্বাভাবিক কোষীয় ব্যবস্থাকেই নিজের গোপন পরিবহণ পদ্ধতি হিসেবে ব্যবহার করছে ছদ্মবেশে।’ গবেষকদের মতে, ভবিষ্যতে শুধুমাত্র ভাইরাসকে ধ্বংস নয়, বরং ভাইরাস যে কোষীয় ব্যবস্থাকে ব্যবহার করছে, সেই পথ বন্ধ করেও চিকিৎসার নতুন কৌশল তৈরি হতে পারে।

    যদিও প্যাথলজির বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্রণবকুমার ভট্টাচার্য মনে করেন, গবেষণাটি এখনও ল্যাবে অ্যানিমাল মডেলে (ইঁদুরের শরীরে) করা হয়েছে। মানুষের শরীরেও এই গবেষণা চালানো উচিত। তবে তিনিও মানেন, জাপানি এনকেফালাইটিসের বিরুদ্ধে চিকিৎসার নতুন সম্ভাবনা তৈরি করেছে এই আবিষ্কার। তিনি আরও বলেন, ‘জেই ভ্যাকসিন থাকার পরেও এ দেশে প্রায় প্রত্যি বছরই এই সংক্রমণের প্রাদুর্ভাব ঘটে। নতুন আবিষ্কৃত এই ভেসিকেল-মিডিয়েটেড ট্রান্সমিশনেই কি লুকিয়ে রয়েছে এর রহস্য? আগামী দিনে সে রহস্য উন্মোচনের জন্য এ নিয়ে আরও গবেষণা দরকার।’

  • Link to this news (এই সময়)