এই সময়: আরজি করে তরুণী চিকিৎসকের ধর্ষণ–খুনের ঘটনায় পরিবারের দাবিতে হাইকোর্ট নতুন করে তদন্তের নির্দেশ দেওয়ার পরে এখন সিবিআইয়ের নজরে রয়েছে এমন ৩৮টি বিষয় বা খামতি যা এ যাবৎ তদন্তে গুরুত্ব পায়নি বলে অভিযোগ। প্রথমে পুলিশ ও পরে সিবিআই দায়িত্ব নেওয়ার পরেও তদন্তে গুচ্ছ গুচ্ছ ত্রুটি থেকে গিয়েছে বলেই অভিযোগ ছিল পরিবারের। নতুন করে সিবিআই তদন্তভার নেওয়ার পরে পরিবারের তরফে আদালতে জমা দেওয়া ত্রুটির তালিকাও এখন নজরে তদন্তকারীদের।
পরিবারের প্রধান অভিযোগ, ওই ঘটনায় লাস্ট সিন টুগেদার থিয়োরি বা শেষ বার একসাথে দেখা যাওয়ার বিষয়টি গুরুত্ব পায়নি। এই থিয়োরি অনুযায়ী, কোনও ভিক্টিমকে শেষ বার জীবিত অবস্থায় যাঁদের সঙ্গে দেখা গিয়েছিল, যদি তাঁকে পরে মৃত অবস্থায় পাওয়া যায়, তবে তাঁদের বিচ্ছিন্ন হওয়ার পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করার দায় অন্যদের উপরেই বর্তায়। এ ক্ষেত্রে প্রথমে পুলিশ, পরে সিবিআই—কেউই এই বিষয়টিতে গুরুত্ব দেয়নি বলে অভিযোগ পরিবারের। ওই তরুণী চিকিৎসক যাঁদের সঙ্গে ডিনার সেরেছিলেন, তাঁদের ভূমিকা এ বার ফের আতশকাচের নীচে।
২০২৪–এর ৯ অগস্ট সকালে দেহ উদ্ধারের পরে হলঘরের ভিতরের বিভিন্ন ফুটেজে বার বার বেডশিট বদলাতে দেখা গিয়েছে। এক বার নীল হয়েছে, এক বার আকাশি, আবার সবুজ। ঘটনাস্থল বলে দাবি করা হলঘরে তরুণীর দু’পাটি চটিও পাশাপাশি রাখা অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল। আইনজীবীদের যুক্তি, যদি একজন ধর্ষিত ও নিহত হন, তা হলে এমন পরিপাটি ভাবে চ’টি এক জায়গায় থাকার কথা নয়। এই বিষয়টিও এ বার খতিয়ে দেখে ব্যাখ্যা দিতে হবে সিবিআইয়ের সিটকে।
বিভিন্ন মোবাইল ফুটেজে তরুণীর মৃতদেহ কখনও একটি প্ল্যাটফর্মে, কখনও গদির উপরে শায়িত দেখা গিয়েছে। ভিডিয়ো অনুযায়ী, তরুণীর পা দু’টি একেবারে সমান্তরাল ভাবে ছিল। যদি খুনের জায়গাতেই দেহ পড়ে থাকে তা হলে ওই ভাবে পা থাকতে পারে না বলেও দাবি পরিবারের। কোনও ভিডিয়োয় তাঁর শরীরের বিভিন্ন অংশ অনাবৃত, আবার পরের ছবিতে দেখা গিয়েছে—দেহ ঢেকে রাখা। হাইকোর্টে পরিবারের তরফে সওয়ালকারী অন্যতম আইনজীবী শীর্ষেন্দু সিংহ রায়ের বক্তব্য, ‘আদালতে জমা দেওয়া সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে আমরা দেখেছি, মৃতদেহ ঘিরে ওই ফ্লোরে অন্তত ৬২ জন ঘোরাফেরা করেছেন। তার কত জনকে আদৌ জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে?’
পরিবারের তরফে গোটা ঘটনার রিপোর্ট ও ভিডিয়ো ফুটেজ দেখিয়ে মতামত নেওয়া হয়েছিল অবসরপ্রাপ্ত ফরেন্সিক এক্সপার্ট অজয়কুমার গুপ্তার। তাঁর মতামতও আদালতে জমা দেওয়া হয়েছে। তিনি জানিয়েছেন, একা একজন কারও পক্ষে গোটা ঘটনা ঘটানো সম্ভব নয়। পরিবারের অভিযোগ, ইনকোয়েস্ট রিপোর্টে যে ক্ষতচিহ্নের উল্লেখ রয়েছে, তার মধ্যে অন্তত ১০টি ক্ষতচিহ্নের হদিশই নেই পোস্টমর্টেম রিপোর্টে! পরিবারে দাবি, প্লেস অফ অকারেন্স বা ঘটনাস্থলও পরিবর্তন করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত একটি হলঘরকেই ঘটনাস্থল বলে দাবি করে তদন্ত এগিয়েছে। এতে বহু তথ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়েছে।
পরিবারের আরও প্রশ্ন, টালা থানার ওসি গ্রেপ্তার হলেও তাঁর বক্তব্যের উপরে ভিত্তি করে নতুন কোনও গ্রেপ্তারি হলো না কেন? তিনি যদি সত্যি প্রমাণ লোপাট করে থাকেন—ওসির বিরুদ্ধে অভিযোগ তেমনই—তা হলে কার নির্দেশে তিনি প্রমাণ লোপাট করেছেন? হাইকোর্ট নির্দেশ দেওয়ার পরেও সাজাপ্রাপ্ত সঞ্জয় রায়কে নতুন করে কেন আর জিজ্ঞাসাবাদ করা হলো না, তা নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। একই সঙ্গে পরিবারের দাবি, তৃণমূলের চিকিৎসক নেতা শান্তনু সেনের মতো প্রভাবশালী, যাঁরা পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে নিজেরাই আরজি কর নিয়ে বলতে চাইছেন, তাঁদের দ্রুত জিজ্ঞাসাবাদ করে তদন্তে দিশা দেখাক সিবিআই।