এই সময়, সোনারপুর ও কলকাতা: শুরু হয়েছিল ‘চোর, চোর’ স্লোগান দিয়ে। তারপরে যত সময় গড়িয়েছে, তত পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। মুহুর্মুহু উড়ে এল কাঁচা ডিম, ইটের টুকরোও। এমনকী মাথায় হেলমেট লাগিয়েও রেহাই মিলল না। হেলমেট জোর করে টেনে খুলে চলল কিল–চড়–থাপ্পড়ও।
বিধানসভা ভোটের ফল ঘোষণার ২৬ দিন পরে শনিবারই প্রথম প্রকাশ্য কর্মসূচিতে গিয়ে দক্ষিণ শহরতলির সোনারপুরে এ ভাবেই জনরোষ আছড়ে পড়ল অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে। বিধানসভা নির্বাচনের ফল প্রকাশের পরে যখন জোড়াফুল নেতৃত্ব বিভিন্ন জায়গায় হিংসার অভিযোগ করছেন, তখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়, অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়রা কেন মাঠে নামছেন না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন তৃণমূলের কয়েকজন বিধায়কই। অবশেষে শনিবার ভোট পরবর্তী হিংসায় নিহত এক দলীয় কর্মীর বাড়িতে দেখা করতে গিয়েছিলেন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক। সেখানে যাওয়ার সময়েই বেনজির ভাবে তাঁকে বেধড়ক মারধর করা হলো। তাঁকে ঘিরে রাখা নিরাপত্তারক্ষী ও জনা কয়েক তৃণমূল কর্মী–সমর্থকও কোনও ভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে পারেননি। এরপরেও অবশ্য নিহত কর্মীর বাড়ির লোকজনের সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলেন অভিষেক। তখনও ওই বাড়ি ঘিরে চলতে থাকে ব্যাপক বিক্ষোভ। পরে বড় পুলিশ বাহিনী ও সেন্ট্রাল ফোর্স ঘটনাস্থলে গিয়ে অভিষেককে কোনওক্রমে বের করে গাড়িতে তুলে দেয়। সেখান থেকে সরাসরি তাঁকে প্রথমে ইএম বাইপাসের ধারে একটি বেসরকারি হাসপাতাল এবং সেখান থেকে মিন্টো পার্কের অন্য একটি বেসরকারি হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। ইএম বাইপাসের ধারের হাসপাতালে থাকাকালীনই তাঁকে দেখতে যান তৃণমূলনেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর গাড়িতেই অন্য বেসরকারি হাসপাতালে যান অভিষেক। প্রথম হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানান, এই মুহূর্তে সাংসদকে ভর্তির প্রয়োজন নেই। সেই কারণেই অন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া তাঁকে। সেখানে আইটিইউ–তে পরীক্ষা–নিরীক্ষা চলে অভিষেকের। যদিও সূত্রের খবর, অভিষেকের শরীরে কোনও গুরুতর আঘাতের চিহ্ন মেলেনি।
এ দিনের ঘটনার পরে বিজেপি নেতৃত্বকে প্রত্যাশিত ভাবেই তোপ দেগেছেন অভিষেক নিজে এবং মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। কারণ, ৪ মে ভোটের রেজ়াল্ট বেরনোর পরে বিক্ষিপ্ত ভাবে ভোট পরবর্তী হিংসার অভিযোগ উঠলেও তা কখনও এ রকম পর্যায়ে পৌঁছয়নি। যে ভাবে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদককে ঘিরে মহিলারা পর্যন্ত ইট ছুড়েছেন অথবা স্থানীয় লোকজন মারধর করেছেন, তা সম্পূর্ণ বেনজির। তাঁর গোটা জামা ডিমে মাখামাখি হয়ে যায়। চড়–থাপ্পড়ে ভাঙে চশমার ফ্রেমও। অভিষেক দাবি করেছেন, তাঁকে খুনের চেষ্টা পর্যন্ত হয়েছিল। এক্স হ্যান্ডলে মমতার অভিযোগ, ‘শাসকই ঘাতকে পরিণত হয়েছে।’ তবে এই অভিযোগ উড়িয়ে রাজ্য বিজেপি সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য জানিয়ে দিয়েছেন, এর সঙ্গে বিজেপির কোনও সংস্রব নেই। ভোটের প্রচারে যে ভাবে রেজ়াল্ট বেরনোর পরে ডিজে বাজাবেন বলে হুঁশিয়ারি দিতে শোনা গিয়েছে অভিষেককে, তার জেরেই এ দিন প্রথম কর্মসূচিতে অভিষেককে বেনজির জনরোষের মুখে পড়তে হলো বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অনেকে। বস্তুত, সোশ্যাল মিডিয়ায় অভিষেকের মার খাওয়ার ছবি–ভিডিয়ো ভাইরাল হওয়ার পরে নেটিজ়েনদের অনেকে কটাক্ষ ছুড়ে দিয়েছেন তৃণমূল সাংসদকেই।
পূর্বনির্ধারিত কর্মসূচি অনুযায়ী অভিষেক এ দিন ভোট পরবর্তী হিংসায় প্রাণ হারানো দুই নিহত তৃণমূলকর্মীর পরিবারের সঙ্গে দেখা করতে যান। সকালে তিনি যান কলকাতার বেলেঘাটায় তৃণমূলকর্মী বিশ্বজিৎ পট্টনায়কের বাড়িতে। সেখানে অবশ্য কোনও গোলমাল হয়নি। বেলেঘাটা থেকে বাড়ি ফিরে তিনি বিকেলে রওনা দেন সোনারপুরের তৃণমূলকর্মী সঞ্জু কর্মকারের বাড়ির উদ্দেশে। তার আগে অবশ্য সিআইডির নোটিস ইস্যুতে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাব দেওয়ার সময়েও অভিষেকের বডি ল্যাঙ্গোয়েজ ছিল যথেষ্ট আক্রমণাত্মক। যে ছবিটা সম্পূর্ণ বদলে যায় কয়েক ঘণ্টাতেই।
বিকেল ৪টে নাগাদ সোনারপুর স্টেশনের কাছে কামরাবাদে রেললাইন পার করে ফেন্ডস ক্লাব পর্যন্ত অভিষেকের গাড়ি যায়। পরের রাস্তা সংকীর্ণ হওয়ায় অভিষেক এক তৃণমূলকর্মীর মোটরবাইকে সওয়ার হন শরৎ সরণী হয়ে ভৌমিক পার্কের দিকে উদ্দেশে। একটি বাইকে দু’জনের মাঝে বসেছিলেন তিনি। অভিষেক ঘটনাস্থলে আসার আগেই ডিম আর কালো কাপড় হাতে সেখানে জমায়েত করতে শুরু করেন বহু মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা। কিছুটা যেতেই তাঁর পথ আটকানো হয়। সেই বাইক ছেড়ে আবার অন্য বাইকে উঠতেই ফের তাঁর পথ আটকে বিক্ষোভ দেখায় বিক্ষুব্ধ জনতা। বাইক ছেড়ে তখন হাঁটা লাগান অভিষেক। প্রায় এক কিলোমিটার সংকীর্ণ কাদা জল, এবড়ো খেবড়ো রাস্তায় পথচলা। সে সময়ে রাস্তার দু’পাশে থাকা পুরুষ-মহিলারা চড়াও হওয়ার চেষ্টা করেন অভিষেকের উপরে।
ঘটনাস্থলে পৌঁছনোর পরে কিছু বুঝে ওঠার আগেই চারপাশ থেকে মুহুর্মুহু ‘চোর, চোর’ স্লোগান উঠতে শুরু করে। বিক্ষোভকারীদের বক্তব্য, রাজ্যে শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে রেশন দুর্নীতিতে তৃণমূলের নেতাদের নাম জড়ানোর ফলে সাধারণ মানুষের মনে যে তীব্র ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল, এ দিন তারই এক বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বিক্ষোভ চলাকালীনই ভিড়ের মধ্যে থেকে আচমকা তৃণমূল সাংসদকে লক্ষ্য করে বেশ কয়েকটি কাঁচা ডিম ছোড়া হয়। বেগতিক দেখে মাথায় একটি হেলমেটও পরেন তিনি। কিন্তু ভিড়ের মধ্যে দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময়ে ওই অবস্থাতেই চড়–চাপড় পড়তে থাকে তাঁর উপরে। অভিষেকের নিরাপত্তারক্ষীরা তাঁকে আড়াল করার আপ্রাণ চেষ্টা করলেও জনতার বিপুল চাপের মুখে তাঁরা তখন কার্যত দিশেহারা। এমনকী, ভিড়ের মধ্যে অভিষেকের হেলমেট টেনে খুলেও মারধর শুরু করে জনতা। ছিঁড়ে যায় তাঁর জামা, ভাঙে চশমাও।
বিক্ষোভরত সাধারণ মানুষের চোখেমুখে এ দিন ছিল তীব্র ক্ষোভ এবং চরম হতাশার স্পষ্ট ছাপ। এই বিক্ষোভে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে অংশ নেওয়া এক স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরার সামনে ক্ষোভ উগরে দিয়ে বলেন, ‘বছরের পর বছর ধরে সাধারণ মানুষের হকের টাকা লুট করা হয়েছে। আমাদের ছেলেমেয়েরা যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও চাকরি না পেয়ে দিনের পর দিন রাস্তায় বসে কাঁদছে, আর এঁরা কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি করে বহাল তবিয়তে ঘুরে বেড়াচ্ছেন।’ এক ক্ষুব্ধ স্থানীয় মহিলা চিৎকার করে বলেন, ‘আমরা চোরদের আর নিজেদের এলাকায় বরদাস্ত করব না। চোখের সামনে আমাদের ভবিষ্যৎ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে, আর নেতারা বড় বড় কথা বলছেন।’
প্রবল কিল-চড়-চাপড় খেতে খেতেই অভিষেক পৌঁছন নিহত সঞ্জুর বাড়িতে। সেই বাড়িও ঝাঁটা–জুতো হাতে সেখানেও সাধারণ মানুষ, বিশেষ করে মহিলারা ঘিরে ধরেন। ভিতর থেকে দরজা বন্ধ করে দেওয়া হয়। ওই প্রবল বিক্ষোভের মুখে অভিষেক বলেন, ‘আমাকে মেরে ফেললে ফেলুক। তবু যতদিন বাঁচব, রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার হয়েই বাঁচব। যতক্ষণ না কেন্দ্রীয় বাহিনী আর পুলিশ আসছে, ততক্ষণ পর্যন্ত আমি আমার কর্মীদের, এই পরিবারকে (নিহত সঞ্জুর পরিবার) একা রেখে বেরবো না।’ একই সঙ্গে তিনি কলকাতা হাইকোর্ট এবং রাজ্যপালের দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন বলেও জানিয়েছেন। তাঁর অভিযোগ, ‘এখানে আসার আগে পুলিশ সুপার, থানার আইসিকে মেল করেছিলাম, হোয়াটসঅ্যাপ করেছিলাম। তারপরেও একজন ফোর্স নেই, পুলিশের প্ররোচনায় এটা হলো।’ অভিষেক ওই বাড়িতে থাকার সময়েই অবশ্য বড় পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনী এলাকায় পৌঁছয়। মানবশৃঙ্খল তৈরি করে বাহিনী কোনওক্রমে সাংসদকে উত্তেজিত জনতার হাত থেকে বের করে গাড়িতে তুলে দেয়। তখনও উত্তেজিত জনতার রাগ কমেনি। আশপাশের বাড়ি থেকে তখনও ‘চোর, চোর’ স্লোগান চলতে থাকে।
এই ঘটনা নিয়ে রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যের প্রতিক্রিয়া, ‘সুস্থ সমাজে এই ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। ক্ষোভ থাকতে পারে, বিদ্বেষ থাকতে পারে, কিন্তু এই ধরনের ঘটনা কাম্য নয়। আমাদের কোনও কর্মী এর মধ্যে ছিলেন না।’ তা হলে এই ঘটনা ঘটল কেন? শমীকের স্পষ্ট কথা, ‘তৃণমূল যে অত্যাচার আমাদের কর্মীদের উপরে করেছে...আমরা সংযত আছি বলে তৃণমূল এখনও অক্ষত আছে। তৃণমূলের নেতা, বিধায়ক, সাংসদরা বিবৃতি দিতে পারছেন, কারণ দলটার নাম বিজেপি। যদি তৃণমূল ক্ষমতায় ফিরত, এতক্ষণে আমাদের ৫০০ কর্মী খুন হয়ে যেতেন।’ অভিষেককে সরাসরি নিশানা করে তাঁর তোপ, ‘ডায়মন্ড মডেল? এলেন না কেন ফলতায় প্রচার করতে? এ সব দিন চলে গিয়েছে। রাজনীতিতে আর এ সব চলবে না।’ তৃণমূল জমানায় এই দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেই প্রাক্তন বিজেপি সভাপতি জেপি নাড্ডার গাড়িতে আক্রমণ-সহ একাধিক হামলার উদাহরণও তুলে ধরেন শমীক। কেন্দ্রীয় প্রতিমন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের কথায়, ‘আমি এই ঘটনার নিন্দা জানাই। সাধারণ মানুষের উদ্দেশে বলব, আইন যাতে কেউ হাতে তুলে না নেন।’ তাঁর সংযোজন, ‘তৃণমূল কংগ্রেস, বিশেষ করে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের ক্ষোভ রয়েছে। ওরা যখন ক্ষমতায় ছিল, যে ভাবে সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলতেন, যে ভাবে বিজেপি নেতাদের সঙ্গে কথা বলতেন, যে ভাবে আক্রমণ করা হয়েছে... আমার উপরেও হামলা হয়েছিল, জেপি নাড্ডার কনভয়ের উপরে হামলা হয়েছিল... এই ধরনের ঘটনার জেরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ক্ষোভ রয়েছে। কিন্তু, সাধারণ মানুষকে বলব শান্তি বজায় রাখতে।’
তৃণমূলের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ নেতার উপরে এই হামলার খবর প্রকাশ্যে আসতে জাতীয় রাজনীতিতেও শোরগোল পড়ে যায়। এক্স হ্যান্ডলে সরব হন কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে। একজন প্রথম সারির বিরোধী নেতার সুরক্ষায় কেন পর্যাপ্ত পুলিশ ছিল না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তিনি লেখেন, ‘একজন বিশিষ্ট বিরোধী নেতার জন্য পর্যাপ্ত পুলিশি সুরক্ষার এই ইচ্ছাকৃত অভাব বিজেপির প্রতিহিংসা ও নিপীড়নের রাজনীতিকেই স্পষ্ট করে দেয়। পশ্চিমবঙ্গ সরকার এবং কেন্দ্রীয় সরকার— উভয়েরই উচিত, সমস্ত বিরোধী নেতার নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করা এবং এই ধরনের হামলা রুখতে অবিলম্বে কড়া পদক্ষেপ করা। রাজনৈতিক মতপার্থক্য কখনও কোনও ধরনের হিংসাকে মান্যতা দিতে পারে না।’
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবও এই ঘটনাকে অভিষেককে ‘খুনের চেষ্টা’ বলে অভিহিত করেছেন। এক্স হ্যান্ডলে লেখেন, ‘বাংলার নৈরাজ্যবাদী বিজেপি সরকার প্রমাণ করে দিল যে তারা ঘৃণা, নেতিবাচকতা এবং হিংসার রাজনীতি ছাড়া আর কিছুই পারে না। এমন একটি উত্তপ্ত ও সংবেদনশীল পরিবেশেও পুলিশের কোনও ব্যবস্থা না থাকা এক গভীর চক্রান্তের দিকেই ইঙ্গিত করে।’