মিঠুন ভট্টাচার্য, শিলিগুড়ি
অনুপম রায় গেয়েছিলেন, 'তুমিও হেঁটে দেখো কলকাতা...।' কলকাতার বদলে শহরটা শিলিগুড়িও হতে পারত। কিন্তু আপাতত তা হবে না। কারণ, শিলিগুড়ি শহরটা হেঁটে দেখা যায় না। কারণ, অধিকাংশ ফুটপাথই দখল হয়ে গিয়েছে!
উত্তরবঙ্গের অঘোষিত রাজধানী শিলিগুড়ি গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র। ফলে শহরের বাসিন্দারা তো বটেই, আশপাশের জেলা এবং পাহাড় শিলিগুড়ি থেকেও বহু মানুষ এখানে আসেন। কর্মসূত্রে তো বটেই, এমনকী বড় মার্কেট এবং শপিং মল থাকায় কেনাকাটার জন্যও অনেকের প্রথম পছন্দ। পর্যটকদেরও এই শহর হয়ে পাহাড় কিংবা ডুয়ার্সে যেতে হয়। আবার ফিরতেও হয়। এই এত এত মানুষকে যতবারই প্রশ্ন করা হয়, শিলিগুড়ি শহরটা ভালো করে হেঁটে দেখতে পারেন? অধিকাংশই উত্তর দেন, 'ফুটপাথ বলে তো কিছু নেই, হাঁটব কেমন করে!'
উত্তরটা যে খুব ভুল নয়, তা শহরের রাস্তায় বেরোলেই বোঝা যায়। হিলকার্ট রোড, সেবক রোড, বিধান রোড, বর্ধমান রোড, শিলিগুড়ি জংশন, এনজেপি, দার্জিলিং মোড় কিংবা চম্পাসারিতে সর্বত্র চোখে পড়বে ফুটপাথ দখলের ছবি। বেশিরভাগ দখলীকৃত জায়গায় রয়েছে ছোট ছোট দোকান। জামাকাপড় থেকে ইলেক্ট্রনিক্স, প্লাস্টিকের দৈনন্দিন জিনিস থেকে খাবারের দোকান-এককথায় পিন থেকে আলপিন পর্যন্ত পাওয়া যায় এই সব দোকানে। দাম কম হওয়ায় কেনাবেচাও হয় ভালোই। কিন্তু এসবের চক্করে ফুটপাথ দিয়ে হাঁটাচলা প্রায় অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে ফুটপাথেই অবৈধ পার্কিং। ফুটপাথের সঙ্গে লাগোয়া বৈধ দোকানের ব্যবসায়ীরাও জিনিসপত্র ফুটপাথে ছড়িয়েছিটিয়ে রাখায় হাঁটাচলা করা যায় না।
অভিযোগ, মাঝেমধ্যে প্রশাসনের তরফে 'লোক দেখানো' অভিযান হলেও কিছুদিন পরে ফের যে কে-সেই! বিধান রোড, মহাবীর স্থান, নিবেদিতা মার্কেটের একাংশ ব্যবসায়ীদের ফুটপাথ দখল করে ব্যবসা কারও চোখ এড়ায় না। এমনকী, শিলিগুড়ি থানার উল্টোদিকেই ফুটপাথে সারি সারি দোকান গজিয়ে উঠেছে। অভিযোগ, সব দেখেও প্রশাসনের মুখে কুলুপ। দেশবন্ধুপাড়ার বাসিন্দা অম্লান জোয়ারদার বলেন, 'কয়েক দিন আগে নিবেদিতা মার্কেটের ভিতর দিয়ে মোটরবাইক চালিয়ে যাওয়ার সময়ে আটকে পড়ি। জিনিসপত্র রাস্তায় উপরে রেখে দেওয়ায় জ্যাম হয়ে যায়। এ ভাবে জিনিসপত্র রাস্তায় কেন, জিজ্ঞাসা করতেই এক ব্যবসায়ী চিৎকার করে হুমকি দিতে থাকেন। কোনও মতে সেখান থেকে সরে যাই।'
শিলিগুড়ি পুলিশ কমিশনারেটের ট্র্যাফিক বিভাগ সূত্রে খবর, গত এক বছরে শহরে ফুটপাথ দখলমুক্ত করতে প্রায় ১০০টি অভিযান হয়েছে। তার পরেও ছবিটা কেন বদলাচ্ছে না? ট্র্যাফিকে কর্মরত নিচুতলার এক আধিকারিক বলেন, 'জনপ্রতিনিধি এবং ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানগুলির সদিচ্ছা না-থাকলে কোনওদিন এই সমস্যা মিটবে না। আমরা সরিয়ে দেওয়ার পরে ফের জনপ্রতিনিধিরাই ব্যবসায়ীদের একই জায়গায় বসিয়ে দেন।' তবে এ বার থেকে এই অব্যবস্থা আর চলবে না বলে জানিয়েছেন শিলিগুড়ির বিধায়ক শঙ্কর ঘোষ। তাঁর কথায়, 'এমনটা একেবারেই চলতে পারে না। ছ'মাসের মধ্যে বেশ কিছু জায়গায় এই সমস্যা মেটানো হবে।'
একই আশ্বাস দিয়েছেন শিলিগুড়ির ডিসিপি (ট্র্যাফিক) কাজী শামসুদ্দিন আহমেদ। তিনি বলেন, 'খুব শিগগিরিই জংশন এলাকায় ফুটপাথ দখলমুক্ত করা হবে। রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা দূরপাল্লার বাসগুলিকে টার্মিনাসের ভিতর থেকে চালানো হবে। এতে ব্যবসার তাগিদেই ফুটপাথ ব্যবসায়ীরা অন্যত্র সরে যাবেন। এ নিয়ে বাস মালিকদের সংগঠনগুলির সঙ্গে আলোচনা চলছে।' পরের ধাপে শহরের অন্যত্র অভিযান চালানো হবে বলে ট্র্যাফিক সূত্রে খবর।