প্রদীপ চক্রবর্তী, সিঙ্গুর
ভোটের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষায় সিঙ্গুরে শিল্পের বার্তা দিলেন বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য। শুক্রবার মার্চেন্ট চেম্বার্স অফ কমার্সের অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের বিজেপির রাজ্য সভাপতি বলেন, ‘টাটাদের সিঙ্গুরেই ফেরাব। গাড়ির কারখানা না হলেও, অন্য কোনও কারখানা হবেই। এটা আমাদের চ্যালেঞ্জ। এ বিষয়ে কথাবার্তাও শুরু হয়ে গিয়েছে।’ বিজেপির রাজ্যসভার সাংসদ তথা দলের শীর্ষ নেতা শমীক ভট্টাচার্য বণিক সভায় এমনটা দাবি করার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই রাজ্যে শিল্প স্থাপন নিয়ে নতুন ভোরের স্বপ্ন দেখছেন গোটা সিঙ্গুরবাসী। গোপালনগর, বেড়াবেড়ি, বাজেমেলিয়া, খাসের ভেড়ি, সিংহের ভেড়ির মতো মৌজায় অবহেলিত ভাবে পড়ে থাকা জমিতে নতুন সম্ভাবনায় বুক বাঁধছেন আগের জমানার ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুক কৃষকরা। রাজ্যে পালাবদলের পরে বিজেপির সরকারের হাত ধরে জমি আন্দোলনের আঁতুড়ঘর সিঙ্গুরে শিল্পস্থাপনের মধ্য দিয়ে নতুন দিনের সূচনা হবে বলে দাবি করছেন বিজেপি নেতারা।
নতুন শিল্প স্থাপনের উদ্যোগে সিঙ্গুরবাসী জানিয়েছেন, ২০০৬ সালে জমির চরিত্র ও পরিবেশ অন্য ছিল। সেই সময়ে চাহিদাও অন্য ছিল।এখন ভাতা ও চাল চাই না। এখন কাজ চাই, শিল্প চাই। সিঙ্গুর বন্ধ্যা জমি পুনরুদ্ধার কমিটির সভাপতি দুধকুমার ধাড়া বলেন, ‘সিঙ্গুরে তিন হাজার ৬০০ জন ভাতা ও চাল পান। তার মধ্যে ১৪০০ খেত মজুর। যে সময়ে আইনি জটে জমি আটকেছিল, তখন চাহিদা অন্য রকম ছিল। পরিবেশের উপরে মানুষের চাহিদা নির্ভর করে। এখন ডাবল ইঞ্জিন সরকার হয়েছে। আমাদের এখানে একজন চিকিৎসক জিতেছেন। আমরা চাই, প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হয়ে সিঙ্গুরে শিল্প স্থাপন করুন।’
সিঙ্গুরের নব নির্বাচিত বিধায়ক, চিকিৎসক অরূপকুমার দাস বলেন, ‘আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও মুখ্যমন্ত্রী ভোটের আগেই সিঙ্গুরে শিল্প নিয়ে আশার কথা শুনিয়েছিলেন। বিজেপি রাজ্যে সরকার গঠন করার পরেই আমাদের ডাবল ইঞ্জিন সরকার সিঙ্গুরে শিল্প করবে। কৃষকরা ইতিমধ্যেই আমাদের সঙ্গে কথা বলেছেন। ইচ্ছুক ও অনিচ্ছুকদের একজোট করে, তাঁদের সম্মতি নিয়ে সেই জমিতে শিল্প করা হবে। এর ফলে দক্ষ, অদক্ষ, সমস্ত তরুণ–তরুণীর কর্মসংস্থানের পথ সুগম হবে।’ ২০০৬ সালে বামেরা একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরেই সিঙ্গুরে গাড়ি তৈরির কারখানার জন্য কৃষিজমি অধিগ্রহণ করে। কৃষকদের সঙ্গে আলোচনা না করে, জোর করে কৃষিজমি অধিগ্রহণের ঘটনাকে ঘিরে রাজ্য রাজনীতি উত্তাল হয়ে হয়ে ওঠে। একলাখি গাড়ি তৈরির কারখানার কাজ শুরু হতেই কর্মসংস্থানের আশায় বুক বাঁধেন এলাকার তরুণরা। জমি দিলে পরিবারের ছেলেমেয়েরা কারখানায় কাজ পাবে, এই শর্তে অনেকে জমিও দেন। কিন্তু জমি অধিগ্রহণের পদ্ধতি নিয়ে ইচ্ছুক, অনিচ্ছুকদের বিভাজন ও রাজনৈতিক অশান্তির আবহে গাড়ি কারখানা গুজরাটে চলে যায়। কৃষি ও শিল্পের সংঘাতে থমকে যায় কর্মসংস্থান ও নতুন শিল্পের সম্ভাবনা। তার পরে ২০১১ সালে রাজ্যে পালাবদল ঘটলেও, সিঙ্গুরের জমি না–হওয়া কারখানার স্মৃতিচিহ্ন নিয়েই দাঁড়িয়েছিল। ২০১৬ সালে দ্বিতীয় বার রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পরে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পরে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে কৃষকদের জমি ফিরিয়ে দেয় তৃণমূল সরকার। কিন্তু ফিরে পাওয়া ৯৯৭ একর জমিতে পুরোপুরি চাষ করা যায়নি। কিছু কিছু মৌজার জমিতে চাষ হলেও, বাকি জমিতে শিল্পের দাবি উঠেছিল। জমি ফেরতের পরে ১০ বছর কেটে গেলেও, সিঙ্গুরের পড়ে থাকা জমিতে কৃষিশিল্প সে ভাবে মাথা তুলে দাঁড়াতে পাড়েনি। তবে অনিচ্ছুকদের এত দিন মাসে দু’হাজার টাকা ও ১৫ কেজি করে চাল দিত বিদায়ী সরকার।
সিঙ্গুর শিল্প বিকাশ উন্নয়ন কমিটির সভাপতি উদয়ন দাস বলেন, ‘আমরা আগাগোড়া সিঙ্গুরে শিল্প চেয়েছিলাম। সেই কারণেই জমি দিয়েছিলাম। এখনও আমরা শিল্প চাই। প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীরা একাধিক বার সিঙ্গুরে নতুন শিল্প স্থাপনের কথা বলেছেন। আমরা সেই শিল্প চাই। যত দিন শিল্প না হচ্ছে, তত দিন ইচ্ছুক, অনিচ্ছুকদের মধ্যে বিভাজন না ঘটিয়ে, সবাইকে ভাতা ও চাল দিক নতুন সরকার।’ এ বিষয়ে সিঙ্গুর কৃষিজমি আন্দোলনের নেতা তথা বিদায়ী বিধায়ক বেচারাম মান্নাকে ফোন করা হলে, তিনি ফোন ধরেননি।