• শুনশান মুর্শিদাবাদের সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো! কেন?
    আজকাল | ৩১ মে ২০২৬
  • আজকাল ওয়েবডেস্ক: রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ থেকে অনুপ্রবেশ রুখতে এবং চোরাচালান বন্ধ করার জন্য সীমান্তবর্তী এলাকায় কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণের উদ্যোগী হতেই গত কয়েকদিনে মুর্শিদাবাদের বিস্তীর্ণ অংশ দিয়ে অনুপ্রবেশ এবং চোরাচালান প্রায় বন্ধ হয়ে গিয়েছে বলে দাবি সীমান্তবর্তী গ্রামে বসবাসকারী মানুষদের। 

    গত বেশ কয়েক বছর ধরে মুর্শিদাবাদের রঘুনাথগঞ্জ-২ নম্বর ব্লকের অন্তর্গত মিঠিপুর সহ একাধিক সীমান্তবর্তী গ্রামগুলো সন্ধ্যা নামলেই পাচারকারীদের স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠত। সেখানকার স্থানীয় মানুষের অভিযোগ, সন্ধ্যা নামলেই বহিরাগত এবং বাংলাদেশি দুষ্কৃতীরা আগ্নেয়াস্ত্র এবং ধারালো অস্ত্র নিয়ে অবাধে ভারত থেকে বাংলাদেশে গরু সহ অন্যান্য অনেক জিনিস পাচার করত। 

    রাজ্যে বিধানসভা নির্বাচনের পর বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসতেই সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া তৈরীর জন্য বিএসএফের হাতে প্রয়োজনীয় জমি হস্তান্তরের উদ্যোগ নিয়েছে।  এরফলে ইতিমধ্যে সীমান্ত বেড়েছে নজরদারি।  এই কারণে পাচার ও অনুপ্রবেশের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে বলে দাবি জলঙ্গী থেকে শুরু করে লালগোলা -ভগবানগোলা হয়ে রঘুনাথগঞ্জ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকার সীমান্তবর্তী গ্রামের বাসিন্দাদের। 

    পশ্চিমবঙ্গে, ভারত এবং বাংলাদেশের মধ্যে প্রায় ২২১৭ কিলোমিটার সীমান্ত রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ১৬০০ কিলোমিটার সীমান্তে ইতিমধ্যেই কাঁটাতারের বেড়া তৈরি করা সম্ভব হয়েছে। বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পরেই মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী বিএসএফকে নতুন করে আরও ১৪২.৭৯ একর জমির হস্তান্তর করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তার মধ্যে মুর্শিদাবাদ জেলাতেই সর্বোচ্চ ৩৮.৮০৫ একর জমির বিএসএফকে দেওয়া হচ্ছে। এই জমি ব্যবহার করে বিএসএফ বাংলাদেশ সীমান্ত বরাবর কাঁটাতারের বেড়া দেবে এবং  বিভিন্ন এলাকায় আউটপোস্ট তৈরি করবে। 

    মুর্শিদাবাদের ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী গ্রাম বড়জুমলার বাসিন্দা ধনঞ্জয় দাস বলেন," এবছরের বিধানসভা নির্বাচনের আগে থেকেই এলাকায় বিএসএফের প্রহরা বেড়েছে। তবে সীমান্ত এলাকায় জমি হস্তান্তরের কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই বিএসএফের উপস্থিতি আরও বাড়তে থাকায় চোরাচালানকারী এবং অনুপ্রবেশকারীদের আর আমরা নিজেদের এলাকায় দেখতে পাচ্ছি না। "ফখরুল ইসলাম নামে আরও এক বাসিন্দা বলেন," গত কয়েক বছর ধরে আমরা দেখে এসেছি লালগোলা, রঘুনাথগঞ্জ থানার অন্তর্গত ভারত -বাংলাদেশ সীমান্তর বিভিন্ন গ্রামে সন্ধ্যা নামলেই গরু পাচারকারীরা সক্রিয় হয়ে উঠতো। আর এই কাজে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের প্রত্যক্ষ মদত থাকতো।"

    তিনি আরও বলেন," মুর্শিদাবাদ জেলায় ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তের বিস্তীর্ণ অংশে নদী থাকায় সেখানে বিএসএফের পক্ষে এখনও কাঁটাতারের বেড়া দেওয়া সম্ভব হয়নি। এর সুযোগ নিয়েই বিভিন্ন এলাকার তৃণমূল নেতাদের সাহায্যে চরের জমি ব্যবহার করে গঙ্গা-পদ্মা নদী পার করে অবাধে গরু ছাড়াও অন্য অনেক কিছু পাচার হতো। তবে রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিভিন্ন এলাকার পরিচিত পাচারকারীরা একেবারেই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছে অথবা তাদের আর এলাকায় দেখা যাচ্ছে না।"

    অন্যদিকে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সুতি, সামশেরগঞ্জ থানার অন্তর্গত একাধিক গ্রামের বাসিন্দারা পাচারকারীদের সম্পর্কে আরও গুরুতর অভিযোগ করেছেন। মিঠিপুর গ্রামের এক বাসিন্দা নাম না প্রকাশের শর্তে জানিয়েছেন," গত কয়েক বছরে ভারত থেকে বাংলাদেশে অবাধে গরু সহ আরও নানা জিনিস পাচার করে সীমান্তবর্তী এলাকার বেশ কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ বিপুল সম্পত্তির মালিক হয়ে গিয়েছেন। সীমান্তবর্তী যে সমস্ত গ্রামগুলোতে একসময়  সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ ছাড়াও অন্য সম্প্রদায়ের মানুষেরা বাস করতেন সেই গ্রামগুলোর বেশিরভাগ জমি ও বাড়ি এখন মুষ্টিমেয় কিছু সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষদের কব্জায় চলে গিয়েছে। তারা অন্য সম্প্রদায়ের মানুষদের কাছ থেকে এক প্রকার জোর করে জমি বাড়ি সব কিনে নিয়েছেন। এরফলে মুর্শিদাবাদের ভারত-বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক সীমান্ত বরাবর বেশ কিছু গ্রামে গত কয়েক বছরে  সামাজিক এবং জনসংখ্যার ভারসাম্য বড়সড় পরিবর্তন দেখা দিয়েছে। 

    এলাকাবাসীদের আরও অভিযোগ বাংলাদেশ থেকেও প্রচুর নাগরিক এসে স্থানীয় তৃণমূল নেতাদের মদতে অবৈধভাবে ভারতীয় পরিচয়পত্র তৈরি করেছেন এবং তারাও ভারতীয় নাগরিকদের কাছ থেকে প্রচুর জমি বাড়ি কিনেছেন। এছাড়াও অভিযোগ উঠেছে সীমান্তবর্তী বেশ কিছু গ্রামের দেবত্তর সম্পত্তি এবং সরকারি জমিও ভিনদেশী নাগরিকদের দখলে চলে গিয়েছে।

    জঙ্গিপুরের বিজেপি বিধায়ক চিত্ত মুখার্জি বলেন ,"তৃণমূলের জামানায় বাংলাদেশ থেকে দুষ্কৃতী এবং সে দেশের নাগরিকরা এমনভাবে এই দেশে অনুপ্রবেশ করতো , যেন মনে করতো এটাই তাদের দেশ। গত ১৫ বছরে মমতা ব্যানার্জি হিজাব পরে একটি বিশেষ সম্প্রদায়ের মানুষকে উস্কে পশ্চিমবঙ্গে ভয়ঙ্কর পরিবেশ তৈরী করেছিলেন। তবে বিজেপি সরকার এই রাজ্যে ক্ষমতায় আসার পর সীমান্ত এলাকার পরিবেশ সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়েছে। "

    তিনি বলেন ,"সামশেরগঞ্জের জাফরাবাদের ঘটনার পর শুভেন্দু অধিকারীর নজর মুর্শিদাবাদ জেলার উপর বিশেষভাবে রয়েছে। অনুপ্রবেশ এবং পাচার রুখতে বিএসএফও খুব ভাল ভূমিকা নিয়েছে। সম্প্রতি আমি সীমান্ত এলাকা পরিদর্শনে গিয়ে দেখেছি প্রচুর জমি ফাঁকা রয়েছে। বাংলাদেশে এই মুহূর্তে ২-৪ কোটি হিন্দু মানুষ রয়েছেন। তাঁরা অনেকেই সেখানে উৎপীড়নের শিকার।  কোচবিহার থেকে সুন্দরবন পর্যন্ত ফাঁকা পড়ে থাকা জমিতে তাঁদের এনে রাখার ব্যবস্থা করা যায় কিনা সেই প্রস্তাব আমি মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীকে ভেবে দেখতে অনুরোধ করবো।"

     
  • Link to this news (আজকাল)