• নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্বের হোতা, দুঃসময়ে পুরনোদেরই পাশে পেলেন অভিষেক, শিক্ষা হল?
    প্রতিদিন | ০১ জুন ২০২৬
  • মা-মাটি-মানুষের আদর্শগত আচরণ ছেড়ে কর্পোরেট রাজনীতি, দলে নবীন-প্রবীণ দ্বন্দ্ব তৈরি, বয়স্কদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতির নামে ধীরে ধীরে সরিয়ে দেওয়া – এই সব কিছুর হোতা ছিলেন তিনি। দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পাওয়ার পর কখনও কখনও একতরফা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। বদলে দিয়েছেন কার্যপদ্ধতি। এমনকী দল উপর উপর এক পরিবার থাকলেও অন্দরে স্পষ্ট দু’ভাগ হয়ে গিয়েছিল – মমতাপন্থী তৃণমূল ও অভিষেকপন্থী তৃণমূল। তাদের চোরা দ্বন্দ্ব সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রকট হয়। আর ছাব্বিশের বিধানসভা ভোটে তৃণমূল কংগ্রেস ধরাশায়ী হওয়ার পর মুষল পর্ব শুরু হয়ে যায়। এ ওর দিকে, ও তার দিকে তাক করে অভিযোগ, সমালোচনার তির ছুড়তে থাকেন। ২৬ দিন পর বাইরে রাজনৈতিক কর্মসূচিতে বেরিয়ে প্রবল জনরোষের শিকার হন অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। আর ঠিক এখানেই রাজনীতির একটা বড় পাঠ পেলেন ৩৮ বছরের ‘নবীন’ অভিষেক। তাঁর এই দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়ালেন ‘প্রবীণ’রাই। শনিবার দুপুর থেকে রবিবার সন্ধ্যা – দেখা গেল না অভিষেক ঘনিষ্ঠ কোনও নবীন নেতাকেই।

    মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজ হাতে গড়া তৃণমূল কংগ্রেসের ক্যাচলাইন মা-মাটি-মানুষ যথার্থই। মাটির গন্ধ মিশে ছিল তাতে। মাঠে-ময়দানে আন্দোলন করে, শাসকের বেদম প্রহার সহ্য করে ধাপে ধাপে রাজনীতির সিঁড়ি বেয়ে ওঠা মমতা প্রকৃত অর্থে জননেত্রী। ২০১১ সালের আগে এবং পরে। মুখ্যমন্ত্রী থাকতেও তিনি রাস্তায় নেমে জনতার হাত ছুঁয়ে দীর্ঘ পথ হেঁটেছেন। রাস্তার পাশ থেকে শিশুকে কোলে তুলে দিয়েছেন উপহার। ‘দিদি’সুলভ ইমেজ তাঁর ক্ষুণ্ণ হয়নি এতটুকুও। দলনেত্রীর মতো অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ও চেষ্টা করেছেন, মানুষের এতটা কাছে পৌঁছতে। কিন্তু পারেননি, তার শত শত প্রমাণ রয়েছে। তিনি বরং দলে সংস্কারের নামে খোলনলচে বদলে দিতে চেয়ে ‘কর্পোরেট কালচার’ আমদানি করেছিলেন। ভোটকুশলী সংস্থা আইপ্যাককে দিয়ে নির্বাচনী কাজ করানো মোটেই দলের প্রবীণদের পছন্দ হয়নি। এর সমালোচনা করায় দলে প্রবীণ-নবীন সংঘাত তৈরি হয়, যা মেটানো আর সম্ভব হয়নি খোদ মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের পক্ষেও।

    অভিষেকের এহেন খেয়ালখুশি রাজনীতি নিয়ে কখনও দলের অন্দরেই সমালোচনার সুর চড়িয়েছেন মদন মিত্র, কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায়দের মতো প্রবীণ নেতারা। বারবার বোঝানোর চেষ্টা করেছিলেন, কোনও ভোটকুশলী সংস্থাকে দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী বাছাই করে অন্তত তৃণমূল সফল হতে পারে না। জনপ্রতিনিধি হওয়ার যোগ্যতা কার আছে, তা বুঝতে পথেই নামতে হয়। তাঁদের মূল্যবান পরামর্শ কানে তোলেননি অভিষেক। আইপ্যাক নির্ধারিত প্রার্থীদের নামেই সিলমোহর দিয়েছেন। যার মারাত্মক ফল পেলেন ছাব্বিশের ভোটে। ২৯৪ আসনের মধ্যে মাত্র ৮০ জন তৃণমূল প্রার্থীর জয়, যাঁদের বেশিরভাগই পুরনো। অভিজ্ঞতাকে হেলাফেলা করে ভুলই করেছেন অভিষেক, তা প্রমাণিত।

    তাঁর নবীন নির্ভরতার সিদ্ধান্ত যে অন্তঃসারশূন্য, তার প্রমাণ মিলল শনিবার পথে নেমে জনতার হাতে ব্যাপকভাবে আক্রান্ত হওয়া। এই ঘটনার পর যাঁরা ছুটে গিয়েছেন, তাঁরা সকলেই কিন্তু বয়স এবং অভিজ্ঞতায় প্রবীণ। আক্রান্ত অভিষেককে হাসপাতালে দেখতে ছুটে গিয়েছেন শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়, ডেরেক ও ব্রায়েন, ফিরহাদ হাকিমরা। এমনকী এতদিনের দূরত্ব ঘুচিয়ে মমতা-অভিষেকের পাশে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল কলকাতার প্রাক্তন মেয়র তথা ‘দিদি’র একসময়ের প্রিয় ভাই কানন অর্থাৎ শোভন চট্টোপাধ্যায়কে! রবিবার বাড়ি গিয়ে অভিষেককে দেখে এলেন মদন মিত্রও। অসুস্থ অভিষেকের মাথায় আশীর্বাদী হাত এক এক পুরনো নেতাদের। নতুনরা কই? কোথাও নেই। না পথে প্রতিবাদে, না ঘরের শুশ্রূষায়। এমন দুঃসময়ে এই থাকা আর না-থাকার তফাৎ কি উপলব্ধি করলেন ৩৮ বছরের অভিষেক? নিজের রাজনৈতিক কেরিয়ারের স্বার্থে গ্রহণ করলেন কোনও শিক্ষা? উত্তর জানতে চান অনেকেই।
  • Link to this news (প্রতিদিন)