কুবলয় বন্দ্যোপাধ্যায়
শুক্রবারের কালবৈশাখীতে শহর জুড়ে গাছ পড়ার ঘটনা উদ্বেগ বাড়িয়েছে পরিবেশবিদদের। ওই দিন শহরে বাতাসের সর্বোচ্চ গতি ছিল ঘণ্টায় ৮৮ কিমি।
গত কয়েক বছরের মধ্যে একমাত্র ২০২৩–এর ১৫ মে–র কালবৈশাখীতেই বাতাসের সর্বোচ্চ গতিবেগ (ঘণ্টায় ৮৪ কিমি) এর কাছাকাছি জায়গায় ছিল। শুক্রবারের ঝড়ের তীব্র বেগের বলি হয়েছে শহরের প্রায় ৩০০–র কাছাকাছি গাছ। সে দিন ঝড়ে বাতাসের বেগ অবশ্যই খুব বেশি ছিল। কিন্তু তার চেয়ে অনেক কম বেগে ঝড় হলেও যে ভাবে শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গাছ পড়ার ঘটনা ঘটছে, তাতেই চিন্তায় পরিবেশবিদরা। তা হলে কি শহরে যে ধরনের গাছ রয়েছে, তারা ঝড়ে দাঁড়িয়ে থাকতে পারছে না? নাকি অন্য কোনও গভীর কারণ রয়েছে — তারই জবাব খুঁজছে শহর।
‘আসল সমস্যা শহরের ভূগর্ভস্থ জলস্তরে এবং মাটির গভীরের ঢালে’, এমনটাই বলছেন জিওমর্ফোলজিস্ট (ভূমিরূপ বিশেষজ্ঞ) সুজীব কর। তাঁর যুক্তি, প্রতিদিন কলকাতা ও সংলগ্ন অনেকটা এলাকার বাসিন্দাদের পান এবং অন্য দৈনন্দিন কাজের জন্য যে ভাবে বিপুল পরিমাণে ভৌম জলস্তর তুলে নেওয়া হচ্ছে, তাতেই মাটির গভীরের স্তর আলগা হয়ে যাচ্ছে। এই যুক্তির সমর্থন পাওয়া গিয়েছে জলবায়ু ও পরিবেশ নিয়ে কর্মরত জনকল্যাণকর সংস্থা ‘সুইচঅন ফাউন্ডেশন’–এর সমীক্ষাতেও। সংস্থার প্রধান বিনয় জাজু তাঁর কয়েক বছরের সংগ্রহ করা তথ্য পেশ করে দেখিয়েছেন, ২০১৭ থেকে ২০২১ পর্যন্ত পাঁচ বছরে কলকাতায় ভূগর্ভস্থ জলস্তর ২.১২ মিটার (১৮.৬ শতাংশ) নেমে গিয়েছে। ওই পাঁচ বছরে দক্ষিণ ২৪ পরগনায় জলস্তর ২.৫৩ মিটার (২৭.৮ শতাংশ) কমেছে। পূর্ব মেদিনীপুরের জলস্তর কমেছে ০.২৯ মিটার (২.৫৩ শতাংশ)। এই তথ্য থেকেই বোঝা যায় যে এই তিন জায়গায় কোন হারে মাটি থেকে জল তুলে নেওয়া হচ্ছে। ভূতত্ত্ববিদরা জানাচ্ছেন, যে ভাবে ভূগর্ভস্থ জল তোলা হচ্ছে, সেটা বার্ষিক বৃষ্টিপাতের মাধ্যমে যে জল পুনর্ভরণ (রিচার্জ) দিয়ে সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। ২০২৫–এর অবস্থা নিয়ে কোনও রিপোর্ট এখনও প্রকাশ করা হয়নি। কিন্তু আশঙ্কা করা হচ্ছে, কলকাতায় ২০২৫–এ ভূগর্ভস্থ জলের স্তর ৪৪ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেতে পারে।
জলস্তর হ্রাস পাওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করার পাশাপাশি সুজীব কর বলছেন, ‘কলকাতার ভূগর্ভে দু’টো প্রাকৃতিক ঢাল রয়েছে। একটি ঢাল হুগলি নদীর দিকে এবং অন্যটি বাগজোলা খালের দিকে। এর জন্য ভূগর্ভস্থ সেডিমেন্ট ক্রমাগত গঙ্গা ও খালের দিকে বয়ে যায়। ফলে মাটির নীচে একটা গভীরতার পরে তার স্তর আলগা হয়ে যাচ্ছে। এই কারণেই শহরের বিভিন্ন প্রান্তে গাছের শিকড় বেশি গভীর পর্যন্ত নামতে পারে না। জোরে হাওয়া দিলেই গাছ পড়ে যায়।’
জিওমর্ফোলজিস্ট বলছেন, ‘কলকাতায় মাটির একেবারে উপরের যে স্তর রয়েছে, ভূতত্ত্ববিদ্যার পরিভাষায় তার নাম ‘কালীঘাট ফর্মেশন’। পলিমাটির এই স্তরটি ২–৪ মিটার পুরু। কোথাও কোথাও ১০ মিটার পর্যন্তও পুরু। কিন্তু এর নীচের স্তরটি নুড়ি ও বালির স্তর। ঢালের ফলে নীচের স্তরটিই ক্রমশ ক্ষয়ে যাচ্ছে।’ এ ছাড়াও কলকাতার নীচে ‘ইওসিন হিঞ্জ’ এবং ‘পদ্মা–পাবনা–কলকাতা’ চ্যুতিরেখা রয়েছে। ‘বাঁকুড়া ফল্টলাইন’–টি সরাসরি কলকাতার নীচে না থাকলেও শহরের খুব কাছ দিয়ে গিয়েছে। এর ফলে ভূতত্ত্বগত ভাবে খুব স্বস্তিতে নেই কলকাতা। ভূগর্ভস্থ বাঁধ বা ‘ডাইক’ দিয়ে মাটির নীচের ওই জলের প্রবাহ আটকানো সম্ভব বলে মনে করেন ভূতত্ত্ববিদদের অনেকেই।