• পাক ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টের সঙ্গে লিঙ্ক? পহেলগাম জঙ্গিদের কাছ থেকে পাওয়া ফোন বহু তথ্যের চাবিকাঠি
    এই সময় | ০১ জুন ২০২৬
  • জম্মু-কাশ্মীরের পহেলগামে জঙ্গি হামলার এক বছর পরেও থামেনি তদন্ত। নৃশংস সেই জঙ্গি হামলার তদন্তে এ বার উঠে এসেছে পাকিস্তানের করাচির একটি ব্যাঙ্কের নাম। তদন্তকারীদের দাবি, হামলাকারীদের ব্যবহৃত একটি মোবাইল ফোনের সঙ্গে লিঙ্ক রয়েছে পাকিস্তানের এক ব্যাঙ্কের। সেই সূত্র ধরেই নতুন করে পাকিস্তানের যোগসূত্র, আর্থিক লেনদেন ও জঙ্গি নেটওয়ার্কের খুঁটিনাটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।

    তদন্তকারীদের মতে, হামলাকারীদের কাছে দু'টি শাওমি রেডমি সিরিজের ফোন ছিল – একটি ২০২১ সালে আমদানি করা কমলা রঙের Redmi 9T, অন্যটি ২০২৩ সালে আমদানি করা কালো রঙের Redmi Note 12।

    ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুসারে, ২০২৫ সালের ২৮ জুলাই জম্মু-কাশ্মীরের দাচিগাম জঙ্গলের মুলনার মহাদেব এলাকায় সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে নিহত হয় তিন হামলাকারী। সেই তিন জঙ্গি, ফয়সাল জাট ওরফে সুলেমান শাহ, হাবিব তাহির ওরফে জিবরান এবং হামজ়া আফগানির কাছ থেকে ফোনগুলি উদ্ধার করা হয়েছিল।

    তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, হামলায় ব্যবহৃত Redmi 9T ফোনটি ২০২১ সালে পাকিস্তানে আমদানি করা হয়েছিল। শাওমির দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, চালানটি ২০২১ সালের ১ জানুয়ারি পাকিস্তানে সরবরাহ করা হয়েছিল। আমদানির বিল ও চালানে ছিল পাকিস্তানের ঠিকানা। এমনকী, করাচির শাহরাহ এলাকায় অবস্থিত পাকিস্তানের ফয়সাল ব্যাঙ্কের (Faysal Bank) প্রধান শাখার ঠিকানাও সেখানে উল্লেখ করা ছিল। তদন্তকারী সংস্থার অনুমান, বড় আন্তর্জাতিক চালানের ক্ষেত্রে যেভাবে ব্যাঙ্ক ‘লেটার অফ ক্রেডিট’ বা আর্থিক গ্যারান্টি দেয়, এই ক্ষেত্রেও সেই ধরনের ভূমিকা থাকতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত সরাসরি ব্যাঙ্কের বিরুদ্ধে জঙ্গি হামলায় জড়িত থাকার প্রমাণ মেলেনি।

    ভারতের তদন্তকারী সংস্থা ন্যাশনাল ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (NIA) এবং জম্মু-কাশ্মীর পুলিশ জানতে পেরেছে, ফোনটি পাকিস্তানে ঢোকার পরে দীর্ঘদিন সক্রিয় ছিল না। পরে পহেলগাম হামলার আগে হঠাৎ সেটি চালু করা হয়। এক তদন্তকারী আধিকারিকের বক্তব্য অনুযায়ী, ফোনটি সম্ভবত মূল চালান অর্থাৎ কনসাইনমেন্ট থেকে সরিয়ে রেখে বিশেষভাবে জঙ্গিদের হাতে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল।

    তদন্তকারীরা আরও জানতে পেরেছেন, হামলাকারীরা সাধারণ মোবাইল নেটওয়ার্ক ব্যবহার না করে লং রেঞ্জ রেডিয়ো যোগাযোগ ব্যবস্থার উপর নির্ভর করেছিল। ফলে কল রেকর্ড বা ইন্টারনেট ডেটা খুব বেশি পাওয়া যায়নি। তবে ফোন দু’টি থেকে কিছু ছবি ও ম্যাপ উদ্ধার হয়েছে। তার মধ্যে ছিল পহেলগামের বৈসরন ময়দান এবং আশপাশের এলাকার ছবি। এমনকী, জঙ্গিদের ব্যবহৃত বলে সন্দেহ একটি তাঁবুর ছবিও উদ্ধার হয়েছে, যা সম্ভবত নিরাপত্তা বাহিনীর গতিবিধির উপর নজরদারি চালানোর জন্য নির্দিষ্ট জায়গায় খাটানো হয়েছিল।

    তদন্তে আরও একটি রেডমি নোট 12 ফোনের খোঁজ মিলেছে, যা ২০২৩ সালে পাকিস্তানের লাহোর-ভিত্তিক একটি সংস্থা আমদানি করেছিল। সেই ফোনটিও দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর হামলার আগে সক্রিয় হয় বলে জানা গিয়েছে।

    ফয়সাল ব্যাঙ্কের নাম এর আগেও আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদ সংক্রান্ত কিছু রিপোর্টে উঠেছিল। আমেরিকার একটি আদালতের পুরোনো নথি ও আন্তর্জাতিক রিপোর্টে দাবি করা হয়েছিল, পাকিস্তানের কয়েকটি সংগঠন—যাদের বিরুদ্ধে জঙ্গি সংগঠনকে আর্থিক সহায়তার অভিযোগ উঠেছিল, তাদের অ্যাকাউন্ট ওই ব্যাঙ্কেই ছিল। যদিও ব্যাঙ্ক কর্তৃপক্ষ অতীতে এই অভিযোগ অস্বীকার করে জানিয়েছিল, নিষিদ্ধ বলে ঘোষিত সংগঠনের অ্যাকাউন্ট আগেই ফ্রিজ করে দেওয়া হয়েছিল।

    দ্য নিউ ইয়র্ক টাইমস-এর ২০০৭ সালের একটি প্রতিবেদনে দাবি করা হয়, ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার পর দায়ের করা মামলাগুলো থেকে দেখা যায় যে, লস্কর-ই-তৈবা এবং আল-কায়েদার সঙ্গে যোগসূত্র রয়েছে এই ব্যাঙ্কের সঙ্গে। কুয়েত-ভিত্তিক নিষিদ্ধ সংগঠন লাজনাত-আল-দাওয়ার সঙ্গে লস্করের যোগসূত্র রয়েছে। এই লাজনাত-আল-দাওয়ারও ফয়সাল ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট ছিল। পাকিস্তানের ডন পত্রিকার ২০০২ সালের একটি প্রতিবেদনেও উঠে আসে ফয়সাল ব্যাঙ্কের নাম। সেখানে বলা হয়েছিল নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনগুলির বেশ কিছু অ্যাকাউন্ট রয়েছে ওই ব্যাঙ্কের বিভিন্ন শাখায়।

    উল্লেখ্য, পহেলগাম হামলায় ২৬ জন নিহত হন। ঘটনার পর থেকেই সীমান্তপারের জঙ্গি মদত, অস্ত্র ও যোগাযোগ ব্যবস্থার উৎস খুঁজতে একাধিক দিক খতিয়ে দেখছে ভারতীয় গোয়েন্দা ও তদন্তকারী সংস্থাগুলি।

  • Link to this news (এই সময়)