এই সময়: শনিবার সোনারপুরে আক্রান্ত হন তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক তথা সাংসদ অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। যা নিয়ে রাজ্য রাজনীতি নতুন করে উত্তপ্ত হয়ে উঠেছে। দলের 'সেনাপতি' আক্রান্ত হওয়ার প্রতিবাদে রবিবার নেতা-কর্মীদের রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ দেখানোর ডাক দিয়েছিলেন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গোটা উত্তরবঙ্গে একজন তৃণমূল নেতা-কর্মীকেও রাস্তায় প্রতিবাদ করতে দেখা গেল না। এমনকী, সোশ্যাল মিডিয়াতেও কেউ সরব হলেন না। দলের মধ্যে তথাকথিত অভিষেক ঘনিষ্ঠ নেতাদের কারও টিকি দেখা গেল না। নির্বাচনে পরাজয়ের পরে দলের নেতাদের এত তাড়াতাড়ি 'শামুকের খোলে' ঢুকে যাওয়ায় চোখ কপালে উঠেছে রাজনৈতিক মহলের।
মালদা
উত্তরবঙ্গে তৃণমূলের ভালো ফল হয়েছে মালদায়। এই জেলায় বিজেপির সঙ্গে সমানে সমানে টক্কর দিয়ে ১২টি আসনের মধ্যে ছ'টি আসন লাভ করে জোড়া ফুল। এখনও সিংহভাগ গ্রাম পঞ্চায়েত তৃণমূলের দখলে। ১৫টির মধ্যে ১৩টি পঞ্চায়েত সমিতি ও জেলা পরিষদেও ক্ষমতায় তৃণমূল। কিন্তু তারপরেও রবিবার অভিষেকের ঘটনায় কোন নেতা-নেত্রীদের একবারের জন্য প্রতিবাদ করতে দেখা গেল না। রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ আন্দোলন করা তো দূরের কথা, নিজেদের ফেসবুক পেজ অথবা সোশ্যাল মিডিয়াতেও ওই ঘটনায় কেউ একটি শব্দ খরচ করেননি। বরং কংগ্রেসের কেউ কেউ নিজেদের ফেসবুক পেজে সমালোচনা করেছেন। এ প্রসঙ্গে তৃণমূলের জেলা সভাপতি আব্দুর রহিম বক্সী বলেন, 'অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপরে হামলার ঘটনায় আমরা প্রথম থেকেই নিন্দা প্রকাশ করছি। যে হেতু কলকাতায় বিধায়করা রয়েছেন, তাই সাংসদের উপরে হামলার ঘটনা নিয়ে মালদায় নতুন কোনও কর্মসূচি তৈরি করা হয়নি। সোমবার মালদায় ফিরে এ ব্যাপারে দলগত ভাবে পদক্ষেপ করা হবে।'
উত্তর দিনাজপুর
উত্তরের এই জেলাতেই বিজেপিকে ছাপিয়ে গিয়েছে তৃণমূল। জেলায় ৯টি আসনের মধ্যে তৃণমূল পাঁচটি আসনে জয়লাভ করেছে। কিন্তু সোনারপুর-কাণ্ডে রবিবার এই জেলায় কোনও বিক্ষোভ কর্মসূচিতে দেখা মেলেনি পূর্বতন শাসকদলকে। শুধুমাত্র চোপড়ায় প্রতিবাদ কর্মসূচি পালন করে তৃণমূল বিধায়ক হামিদুল রহমান। হামিদুল বলেন, 'অভিষেকের উপরে এই হামলা খুবই নিন্দনীয়। দলনেত্রীর কথামতো আমরা চোপড়ায় প্রতিবাদ কর্মসূচিতে সামিল হয়েছি।' গোয়ালপোখর, চাকুলিয়া, ইসলামপুর ও ইটাহারে তৃণমূল জয়ী হলেও সেখানে কোনও প্রতিবাদ কর্মসূচি হয়নি। ইটাহারের তৃণমূল বিধায়ক মোশারফ হোসেন বলেন, 'আমরা কালীঘাটে আছি। দলীয় নির্দেশ পেলে জেলায় ফিরে প্রতিবাদ কর্মসূচি গ্রহণ করব।' ইসলামপুরের তৃণমূল বিধায়ক তথা উত্তর দিনাজপুর জেলা তৃণমূল সভাপতি কানাইয়ালাল আগরওয়াল বলেন, 'আমি কলকাতায় রয়েছি। দলীয় ভাবে তেমন কোনও নির্দেশ এখনও আসেনি। এলে কর্মসূচি গ্রহণ করা হবে।' তৃণমূলকে কটাক্ষ করে বিজেপির জেলা সভাপতি নিমাই কবিরাজ বলেন, 'তৃণমূলের নেতারা জানেন রাজ্যে তাঁদের বিরুদ্ধে জনরোষের সৃষ্টি হয়েছে। সাধারণ মানুষ তাঁদের প্রত্যাখ্যান করেছে। তাই প্রতিবাদ করার লোক পাচ্ছেন না। নেতারা হয়তো জনরোষের ভয়ে রাস্তায় নামছেন না।'
দক্ষিণ দিনাজপুর
কেন্দ্রীয় মন্ত্রী সুকান্ত মজুমদারের জেলায় ছ'টি আসনের মধ্যে দুটি আসন জিতে কিছুটা হলেও মুখরক্ষা করেছে তৃণমূল। জিতেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী বিপ্লব মিত্র ও তোরাফ হোসেন মণ্ডল। এই দুই বিধায়কের কেন্দ্র তো বটেই বাকি চারটি কেন্দ্রেও প্রতিবাদ করতে দেখা যায়নি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলকে। কয়েকজন তৃণমূল নেতা-কর্মী শুধুমাত্র সোশ্যাল মিডিয়ায় ঘটনার প্রতিবাদ জানিয়ে পোস্ট করেন। এ বিষয়ে তৃণমূলের জেলা সভাপতি সুভাষ ভাওয়াল বলেন, 'বিপ্লব মিত্র যেহেতু জেলার সিনিয়ার লিডার তাই ওঁর সঙ্গে এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। পাশাপাশি আমরা দলীয় নেতৃত্বদের সঙ্গেও আলোচনা করছি। তবে এখনও কোনও সিদ্ধান্ত হয়নি।' বিজেপির জেলা সাধারণ সম্পাদক বাপি সরকার বলেন, 'এই জেলার তৃণমূল নেতারাও ব্যাপক দুর্নীতিগ্রস্ত। জনরোষের মুখে পড়ার ভয়ে তাঁরা রাস্তায় নামছেন না।'
আলিপুরদুয়ার
একই দৃশ্য আলিপুরদুয়ারেও। এই জেলায় অবশ্য হোয়াইট ওয়াশ হয়ে গিয়েছে জোড়াফুল শিবির। অভিষেকের উপরে হামলার ঘটনায় এ দিন দিনভর রাস্তায় না-নেমে নিজেদের ঘরবন্দি করে রাখলেন তৃণমূল নেতারা। তবে ভোটে ধরাশায়ীর পরে কর্মীদের মনোবল যে তলানিতে, তা স্বীকার করে নিয়েছেন নেতারাই। দলের জেলা সভাপতি তথা রাজ্যসভার সাংসদ প্রকাশ চিকবরাইক বলেন, 'আসলে দলের পরাজয়ে কর্মীরা এতটাই ম্রিয়মাণ হয়ে আছেন যে, কেউ রাস্তায় নামতে চাইছেন না। তবে আমরা পথে নামছি।'
শিলিগুড়ি
শিলিগুড়ি পুরসভা ও শিলিগুড়ি মহকুমা পরিষদ তৃণমূলের দখলে থাকলেও শিলিগুড়ি ও তার আশপাশের সব ক'টি কেন্দ্রেই তৃণমূলের লজ্জার ফল হয়েছে। পুরসভা নিয়েও ডামাডোল চলছে। ডেপুটি মেয়র রঞ্জন সরকার পরিষদীয় দলনেতার পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। এই অবস্থায় শুধু কর্মীরা নন, নেতারাও কার্যত ঘরবন্দি। তাই দলের সেকেন্ড ইন কমান্ড অভিষেক আক্রান্ত হলেও রাস্তায় নেমে প্রতিবাদ কর্মসূচি করার মতো মানসিক অবস্থা বোধহয় নেই নেতাদের। যদিও বিষয়টিকে আড়াল করতে দলের নির্দেশ না আসাকে ঢাল করেছেন তৃণমূল কংগ্রেসের শিলিগুড়ির জেলা চেয়ারম্যান সঞ্জয় টিব্রেওয়াল। তিনি বলেন, 'বিক্ষোভের ব্যাপারে রাজ্য থেকে এখনও কোনও নির্দেশ আমি পাইনি।' তবে প্রশ্ন উঠছে, অভিষেকের উপর হামলার ঘটনার প্রতিবাদে রাস্তায় নামার জন্য কি দলীয় নেতৃত্বের নির্দেশের অপেক্ষা করতে হবে?
জলপাইগুড়ি
বিধানসভায় ৭-০ হারের ভুত এখনও ঘাড় থেকে নামেনি জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূলে। শনিবার দলের সেনাপতি সোনারপুরে আক্রান্ত হলেও রবিবার দলের একজনও নেতা-কর্মীকে প্রতিবাদে রাস্তায় নামতে দেখা গেল না। জেলার কোনও ব্লকেই প্রতিবাদ এই বিষয়ে জলপাইগুড়ি জেলা তৃণমূল সভাপতি মহুয়া গোপ বলেন, 'মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জেলায় এই ধরনের কোনও নির্দেশ দেননি। আগামী দিনে কী ভাবে প্রতিবাদ হবে, তা রাজ্য নেতৃত্ব ঠিক করবেন।' জেলা বিজেপির মুখপাত্র শ্যাম প্রসাদ বলেন, 'বিক্ষুব্ধ তৃণমূল কর্মীরাই অভিষেককে মেরেছেন। পুলিশ যাঁদের গ্রেপ্তার করেছে, তাঁরা সবাই তৃণমূল কর্মী। ওই ঘটনা দলের গোষ্ঠীকোন্দল। সুতরাং জেলার নেতারা কাদের বিরুদ্ধে পথে নামবেন?'
কোচবিহার
নির্বাচনের আগে জেলায় তৃণমূলের আস্ফালন ছিল চোখে পড়ার মতো। একাধিক ঘটনায় বিজেপির নেতা-কর্মী বা মিছিলের উপরে হামলার অভিযোগ ওঠে জোড়াফুল শিবিরের বিরুদ্ধে। ভোটে সিতাই ছাড়া বাকি আটটি কেন্দ্রে পর্যদুস্ত হয় তৃণমূল। তার পর থেকে ময়দানে নেই নেতারা। প্রাক্তন মন্ত্রী-সহ অনেকেই গা ঢাকা দিয়েছেন। এই অবস্থায় অভিষেক-কান্ডের প্রতিবাদে রাস্তায় না-নামার বিষয়টিতে অস্বাভাবিক কিছু দেখছে না রাজনৈতিক মহল। এ দিন কোথাও প্রতিবাদ হয়নি। মন্তব্য করেননি জেলা তৃণমূলের চেয়ারম্যান গিরীন্দ্রনাথ বর্মন। এ বিষয়ে জেলা সভাপতি-চেয়ারম্যানের কোর্টে বল ঠেলেছেন প্রাক্তন মন্ত্রী রবীন্দ্রনাথ ঘোষ।