ব্যাকফুটে বিজেপি, বৃদ্ধের বাড়িতে গিয়ে ভুল স্বীকার, মেয়ে সহ মুসলিম জামাইকে পাড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার ফতোয়া রাজারহাটে
বর্তমান | ০১ জুন ২০২৬
নিজস্ব প্রতিনিধি, বিধাননগর: দৃশ্য-১: হিন্দু পরিবারের প্রবীণ সদস্য। গ্রীষ্মের দুপুরে তাঁর খালি গা। কাঁধে লাল গামছা। তাঁরই বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে ফতোয়া দিচ্ছেন বিজেপির স্থানীয় নেতা। মেয়ে সহ জামাইকে হিন্দুপাড়া ছেড়ে চলে যেতে হবে! নেতার পরণে টি-শার্ট। চোখে সানগ্লাস। পিছনে তাঁর কয়েকজন অনুগামী।
দৃশ্য-২: সেই একই উঠান। পরিবারের সেই প্রবীণ সদস্যের পরণে হাফ পাঞ্জাবি। কাঁধে সেই লাল গামছা। ফতোয়া দেওয়া বিজেপি নেতা তাঁর সামনে দাঁড়িয়ে। তবে এবার কোনো হুমকি বা ফতোয়া নয়। তাঁর সুর নরম। চোখে সানগ্লাস নেই। হাফশার্টের বুক পকেটে রাখা সেটি! কাঁচুমাচু হয়ে ভুল স্বীকার করছেন তিনি!
মাত্র তিন সপ্তাহ আগে বাংলায় সরকার গঠন করেছে বিজেপি। নতুন সরকারের বয়স এক মাস হওয়ার আগেই রাজারহাটে হিন্দুপাড়া ছাড়ার ফতোয়া দিয়েছিলেন এক বিজেপি নেতা। সেই খবর প্রকাশ্যে আসতেই শোরগোল ছড়ায়। নিন্দার ঝড় ওঠে। বেকায়দায় পড়ে বিজেপি। তাই যাঁকে ফতোয়া দিয়েছিলেন, তাঁর বাড়িতে গিয়েই ভুল স্বীকার করতে হল স্থানীয় ওই বিজেপি নেতাকে!
রাজারহাটের নারায়ণপুর থানার বেড়াবেড়ি ঘোষপাড়ায় ওই বৃদ্ধের বাড়ি। তাঁর এক মেয়ের সঙ্গে ১০ বছর আগে বিয়ে হয় এক মুসলিম যুবকের। সেই যুবক ওই বাড়িতেই থাকেন। তাঁদের পারিবারিক এই বিষয় নিয়ে এত বছরে কেউ কোনো আপত্তি তোলেনি। কিন্তু বকরি ইদের সময় এক বিজেপি নেতা দলবল নিয়ে হাজির হন ওই বৃদ্ধের বাড়িতে। তাঁর মেয়ে-জামাইকে হিন্দুপাড়া ছেড়ে চলে যাওয়ার ফতোয়া দেন। সেই ঘটনার ভিডিয়ো দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে।
ওই নেতা বৃদ্ধের মেয়ের নাম করে বলেছিলেন, ‘ধর্ম চেঞ্জ করে নিয়েছে? তাহলে ওকে চলে যেতে হবে। হিন্দুপাড়ার মধ্যে একটা মুসলিম ফ্যামিলি থাকবে! আশপাশের কালচার নষ্ট হচ্ছে। কমপ্লেন আসছে।’ বৃদ্ধ তখন বলেন, ‘আমাদের বুড়ো-বুড়ির দেখাশোনা করার কেউ নেই।’ বিজেপি নেতা উত্তর দিয়েছিলেন, ‘তাহলে জামাইকে ধর্ম চেঞ্জ করতে বল। এগুলো আর টলারেট করা যাবে না। আমাদের মুখ্যমন্ত্রীও একথা বলেছেন। একে লাভ জিহাদ বলে। আর চলবে না। পরিষ্কার বলে দিয়ে গেলাম।’
তবে বিপাকে পড়তেই ওই বিজেপি নেতা সেই বৃদ্ধের বাড়িতে গিয়ে ভুল স্বীকার করেছেন। সেই ভিডিয়ো রবিবার সামনে এসেছে। তাতে দেখা যায়, ফতোয়া দেওয়া নেতা নরম সুরে বলছেন, ‘শোনো দাদা, আগের দিন আমাদের একটা ভিডিয়ো ভাইরাল হয়েছে। সেই কারণেই আসা। আশপাশের লোকজন যারা ফোন করেছিল, সেটা হয়তো কিছু কারণে ভুল জিনিসটা হয়েছিল। আমরা ভুল শুনেছিলাম। যে জিনিসটা হয়েছে, তার জন্য সোশ্যাল মিডিয়ায় ভুলভাল কথাও হচ্ছে।’
বৃদ্ধ তখন বলেন, ‘সেদিন যা হয়েছে, ভালো হয়নি প্রথমত। তবে যা হয়েছে, হয়েছে। আমরা নিজেদের মধ্যে মিটিয়ে নিয়েছি।’ ওই নেতা বলেন, ‘কিছু ছোটো ছোটো সোশ্যাল মিডিয়া, মিডিয়া আছে। তারা এই জিনিসটা ছড়িয়েছে। ভুল বোঝাচ্ছে।’ উত্তরে বৃদ্ধ বলেন, ‘তবে সোশ্যাল মিডিয়ায় কে কী বলবে, তার মুখ বন্ধ করতে পারব না। তবে মিডিয়ার যাঁরা এসেছিলেন, তাঁদের সঙ্গে কথা বলিনি’। যাওয়ার আগে নেতার শেষ বক্তব্য—‘সব কিছু মিটে গেছে তো?’ বৃদ্ধের উত্তর—‘হ্যাঁ, মিটে গিয়েছে মোটামুটি।’