• ভোট মিটতেই বারাসতে সক্রিয় সাট্টা-জুয়া! ছোটো দোকানের আড়ালে ‘নম্বর সাম্রাজ্য’
    বর্তমান | ০১ জুন ২০২৬
  • নিজস্ব প্রতিনিধি, বারাসত: দিনের বেলায় দেখলে মনে হবে সাধারণ চায়ের দোকান, কিংবা সবজির দোকান, কোথাও আবার মোবাইল সারাইয়ের ছোট্ট গুমটি। বাইরে থেকে দেখলে আর পাঁচটা সাধারণ ব্যবসার মতোই। কিন্তু সন্ধ্যা নামলেই বদলে যায় ছবিটা। দোকানের পিছনে অন্ধকার ঘর, আধখোলা টিনের চালা কিংবা পর্দা টানা ছোট্ট কামরায় চলে ‘নম্বরের খেলা’। সেই খেলাকে কেন্দ্র করেই ফের মাথাচাড়া দিয়েছে জুয়া ও সাট্টার কারবার— এমনই অভিযোগ বারাসত থানা এলাকার বিভিন্ন প্রান্তে।

    স্থানীয়দের দাবি, ভোটের সময় এই কারবার কিছুটা চাপা থাকলেও ভোট মিটতেই ফের সক্রিয় হয়ে উঠেছে এই চক্র। শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে শুরু করে গ্রাম লাগোয়া অঞ্চল— সর্বত্রই ছড়িয়ে পড়েছে সাট্টার জাল। বহুদিন ধরে এই অভিযোগ উঠলেও এ নিয়ে এতদিন টানা-হ্যাঁচড়া করেনি প্রশাসন। এই সুযোগে সাট্টার কারবার আরও ফুলে ফেঁপে উঠেছে এবং সংগঠিত আকার নিয়েছে বলে মনে করছেন এলাকার মানুষ। 

    তবে, এই পর্বে সাধারণ মানুষকে আশার বাণী শুনিয়েছেন বিধায়ক শংকর চট্টোপাধ্যায়। বলেছেন, এই চক্র ভাঙা হবে। স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, এখন আর শুধু কাগজে নম্বর লিখে খেলা নয়। প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে। কোথাও মোবাইল ফোনে হোয়াটসঅ্যাপ মেসেজের মাধ্যমে নম্বর পাঠানো হচ্ছে, কোথাও আবার নির্দিষ্ট অ্যাপ ব্যবহার করে হিসাব রাখা হচ্ছে। অভিযোগ, এলাকায় কিছু ‘লাইনম্যান’ প্রতিদিন বাড়ি বাড়ি বা দোকানে দোকানে ঘুরে বাজির টাকা সংগ্রহ করেন। পরে সেই নম্বর পৌঁছে যায় মূল চক্রের কাছে। খেলার ধরনও বেশ পরিচিত। ১০ টাকা বা ২০ টাকা দিয়ে শুরু। নির্দিষ্ট সংখ্যার উপর বাজি ধরা হয়। অনেক সময় ‘ওপেন’ ও ‘ক্লোজ’ নম্বরের নামে আলাদা আলাদা রাউন্ড চলে। প্রথম দিকে দু’-একবার জিতিয়ে খেলোয়াড়কে টেনে আনা হয়। তারপরই শুরু হয় আসল ফাঁদ। দ্রুত লাভের আশায় সাধারণ মানুষ ধীরে ধীরে বড়ো অঙ্কের টাকা ঢালতে শুরু করেন। শেষে ক্ষতির মুখে পড়ে ঋণ, সংসারে অশান্তি— সব মিলিয়ে বহু পরিবার কার্যত ভেঙে পড়ছে বলে অভিযোগ।

    নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বারাসতের এক বাসিন্দার কথায়, এখন এই ব্যবসা এতটাই ছড়িয়ে গিয়েছে যে, এলাকার মানুষ সহজেই বুঝতে পারেন কোন দোকানে কী চলছে। শহরের বিভিন্ন এলাকায় এই কারবার চলছে। সন্ধ্যার পর কিছু নির্দিষ্ট দোকানে অস্বাভাবিক ভিড় হয়। বাইরে থেকে কেউ বুঝবে না, ভিতরে কী হচ্ছে! ভিতরের ঘরে চলছে নম্বরের কারবার। আগে আড়ালে-আবডালে চলত এই ঠেক। এখন তা কার্যত প্রকাশ্যেই হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই চক্রের পিছনে রয়েছে সংগঠিত নেটওয়ার্ক। এলাকার ছোটো দোকানগুলিকে ব্যবহার করা হচ্ছে ‘সেফ পয়েন্ট’ হিসাবে। রাতে নির্দিষ্ট সময়ে ‘রেজাল্ট’ ঘোষণার পর অনেক এলাকায় হঠাৎ উত্তেজনা বাড়তে দেখা যায় বলে দাবি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, এই চক্রে ক্রমশ জড়িয়ে পড়ছে যুব সমাজ। এনিয়ে বারাসতের বিধায়ক শংকর চট্টোপাধ্যায় দ্ব্যর্থহীন ভাষায় বলেছেন, জুয়া ও সাট্টার বিরুদ্ধে প্রশাসনকে কড়া পদক্ষেপ করতে বলা হয়েছে। মানুষের অভিযোগ খতিয়ে দেখে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। অসাধু কাজ বারাসতে চলবে না।

    তবে, প্রশ্ন থেকেই যাচ্ছে— আশ্বাসের পর আদৌ কি বন্ধ হবে ‘নম্বর সাম্রাজ্য’? নাকি ছোটো দোকানের আড়ালে রাতের অন্ধকারে আগের মতোই চলতে থাকবে সাট্টার গোপন খেলা? উত্তর খুঁজছে বারাসত।
  • Link to this news (বর্তমান)