• সংস্কার হয়নি দীর্ঘদিন, চরম অবহেলায় মাথা তুলে দাঁড়িয়ে সূর্য মন্দির
    এই সময় | ০১ জুন ২০২৬
  • দুর্গাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়, বাঁকুড়া

    লালমাটির সরু রাস্তা আর ধানখেতের আল পেরিয়ে চোখে পড়ে হাজার বছরেরও প্রাচীন সুদৃশ্য এক মন্দির। এটি সোনাতপলের সূর্য মন্দির বলে পরিচিত। বাঁকুড়ার মন্দির স্থাপত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ নিদর্শন। রাজ্য সরকারের সংরক্ষণের তালিকায় থাকার পরেও সেই ঐতিহাসিক সৌধের চেহারা ভগ্নপ্রায়। সংস্কার হয়নি দীর্ঘদিন।

    বাঁকুড়ার ওন্দা ব্লকের সানতোড় পঞ্চায়েতের সোনাতপল গ্রামে রয়েছে এই সূর্য মন্দির। বাঁকুড়া শহর থেকে প্রায় ছ’কিলোমিটার দূরে দ্বারকেশ্বরের দক্ষিণ তীরে অবস্থিত এই রেখ দেউল বাংলার অন্যতম ঐতিহাসিক পুরাকীর্তি। যদিও মন্দিরের প্রকৃত পরিচয় নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এটি সূর্য মন্দির নাকি জৈন, অথবা বৌদ্ধ স্থাপত্য, তা নিয়ে রয়েছে বিতর্ক। মন্দিরটি দেউল স্থাপত্য রীতিতে নির্মিত। লম্বা বক্ররেখার মতো উঁচু স্থাপত্য। উচ্চতা প্রায় ৬০ ফুট। চারদিকে চতুর্ভুজাকার বেষ্টনী ও সরু পুরোনো ইটের গাঁথনি। প্রবেশদ্বারের উপরে রয়েছে কারুকার্যময় চৈত্য-জানালা। মন্দিরের গায়ে সূক্ষ্ম ভাষ্কর্য শিল্প। বিশাল অর্ধ গোলাকার চূড়া দেখার মতো। মাঝেমধ্যে মন্দিরের ভিতর থেকে শোনা যায় ঘন্টাধ্বনি।

    নাম সূর্য মন্দির হলেও বর্তমানে মন্দিরের গর্ভগৃহে কোনও সূর্য মূর্তি নেই। বহু বছর ধরে ছোট একটি শিবলিঙ্গ পূজিত হয়ে আসছে। প্রতিদিন নিয়ম করে পুজো করেন স্থানীয় এক পুরোহিত। শোনা যায়, অতীতে মন্দির সংলগ্ন এলাকা থেকে সূর্য দেবের একটি মূর্তি উদ্ধার হয়েছিল। সেই কারণেই অনেকের মতে এটি সূর্য মন্দির। তা ছাড়া মন্দিরটি পূর্বমুখী এবং আশপাশে একটা সময়ে সূর্য-উপাসক ব্রাহ্মণদের বসবাস থাকায় এই ধারণা হয়েছে জোরালো। এ–ও শোনা যায়, পাল যুগের রাজা শালিবাহন এই মন্দির তৈরি করেছিলেন। সোনাতপলের প্রাচীন নাম ছিল হামিরডাঙা।

    মন্দিরের আশপাশে এখনও কয়েকটি প্রাচীন ঢিবি রয়েছে। স্থানীয়দের অনুমান, ওই ঢিবিগুলি রাজার গড়ের ধ্বংসাবশেষ। বাঁকুড়ার বাসিন্দা ও ক্ষেত্র সমীক্ষক সুকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় বলছেন, ‘পোড়া ইট ও টেরাকোটা টাইলসের এই প্রাচীন রেখ দেউল জেলার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পুরাকীর্তি। ব্রিটিশ ভারতের পূর্তবিদ্যা বিশারদ ও সমীক্ষক জে ডি বেগলার ১৮৭২-৭৩–য়ে এক্তেশ্বর হয়ে সোনাতপল পরিদর্শনে আসেন। তিনি এই দেবালয়গুলির নির্মাণকাল ১১ শতক বলে উল্লেখ করেছেন। এই সূর্য মন্দিরের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শাকদ্বীপীয় ব্রাহ্মণদের সম্পর্ক।’

    বর্তমানে মন্দিরটি রাজ্য প্রত্নতত্ত্ব ও সংগ্রহালয় দপ্তরের অধীন। চারদিক আগাছা আর জঙ্গলে ভরে উঠেছে। মন্দিরের গা ফুঁড়ে উঠেছে গাছপালা। মন্দির পর্যন্ত পৌঁছতে পার হতে হয় সরু, কাঁচা রাস্তা আর ধান জমির আল। সুকুমার বলছেন, ‘প্রাচীন এই সৌধ দীর্ঘদিন সংস্কারের অভাবে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। কোনও দেখভালের ব্যবস্থা নেই। মন্দিরের স্থাপত্যের টানে সারা বছর প্রচুর মানুষ এলেও রাস্তা, বিশ্রামাগার, পানীয় জলের কোনও ব্যবস্থা হয়নি।’

    ওন্দার বাসিন্দা সমু ভট্টাচার্য বলছেন, ‘আমাদের এই এলাকায় রয়েছে প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বহু মন্দির। সোনাতপল সূর্য মন্দির ওন্দার প্রাচীন সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এর সঠিক সংরক্ষণ প্রয়োজন। আগামী প্রজন্ম তা হলে এই ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হবে।’

  • Link to this news (এই সময়)