মডেল-অভিনেত্রী ত্বিষা শর্মার রহস্যমৃত্যু মামলার তদন্তে নতুন মোড়। কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা CBI এ বার তাঁর স্বামী সমর্থ সিং-এর গতিবিধি খতিয়ে দেখছে। বিশেষ করে ত্বিষার মৃত্যুর পরে কয়েকদিন তাঁকে কারা আশ্রয় দিয়েছিলেন, কাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন এবং কেন হঠাৎ ‘আন্ডারগ্রাউন্ড’ হয়ে গিয়েছিলেন— সেই বিষয়গুলিই এখন তদন্তের মূল কেন্দ্রবিন্দু।
সংবাদ সংস্থা সূত্রে খবর, CBI সমর্থ সিংয়ের মোবাইল লোকেশন, গাড়ির গতিবিধি, টোল প্লাজা রেকর্ড এবং CCTV ফুটেজ বিশ্লেষণ করছে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ত্বিষার মৃত্যুর পরে তিনি কেন কয়েকদিন ধরাছোঁয়ার বাইরে ছিলেন এবং সেই সময়ে কোনও প্রভাবশালী ব্যক্তি বা চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ হয়েছিল কি না। তদন্তকারী সূত্রের দাবি, সমর্থের একাধিক বক্তব্যের মধ্যে অসঙ্গতি পাওয়া গিয়েছে বলে তদন্তকারীদের অভিযোগ।
সূত্রের দাবি, সমর্থ সিং CBI কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন যে, ত্বিষার মৃত্যুর পরে তিনি দু'দিন ভোপালে ছিলেন এবং এর পরে জব্বলপুর রওনা হন। ২২ মে, যে দিন তিনি স্থানীয় আদালতে আত্মসমর্পণ করেন। ওই দিন পর্যন্ত তিনি জবলপুরেই ছিলেন। পলাতক থাকাকালীন কারা সমর্থকে সহায়তা করেছিলেন তাঁদের চিহ্নিত করার প্রক্রিয়া চলছে। জিজ্ঞাসাবাদের সময়ে সমর্থ এই বিষয়ে মুখ খোলেননি।
এ বার তদন্তের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে ভোপালের বাগ মুঘালিয়া এলাকার গিরিবালা সিং-এর বাড়িতে ‘ক্রাইম সিন রিক্রিয়েশন’ বা ঘটনাস্থলের পুনর্নির্মাণ করতে চলেছে CBI। তদন্তকারীরা একটি ডামি বা সমান ওজনের পুতুল ব্যবহার করে ত্বিষার শেষ মুহূর্তের পরিস্থিতি পুনর্নির্মাণ করবেন। এর মাধ্যমে দেখা হবে, ঘটনাস্থলের পরিস্থিতি এবং অভিযুক্তদের বয়ানের মধ্যে কোনও অসঙ্গতি রয়েছে কি না। ইতিমধ্যেই CID-র হাতে ৩৪ মিনিটের একটি ভিডিয়ো এসেছে। যেখানে দেহ উদ্ধারের সময়ের ও তার পরে ঘটনাস্থলের যা অবস্থা তাতে রেকর্ড রয়েছে।
CBI সূত্রে খবর, এই পুনর্নির্মাণের সময় সমর্থ সিং এবং তাঁর মা গিরিবালা সিং— দু’জনকেই ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাখা হতে পারে। তদন্তকারীরা জানতে চাইছেন, ত্বিষার দেহ যে অবস্থায় উদ্ধার হয়েছিল, সেই পরিস্থিতি আদৌ আত্মহত্যার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না। AIIMS-Delhi-এর ফরেনসিক বিশেষজ্ঞদের দ্বিতীয় ময়নাতদন্ত রিপোর্টও এই তদন্তে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
তদন্তে আরও জানা গিয়েছে, ত্বিষার গর্ভপাত করানো নিয়ে পরিচিত তাঁর পরিচত চিকিৎসকদের, মনোবিদদের এবং চিকিৎসার সঙ্গে যুক্ত অন্যদেরও সিবিআই জিজ্ঞাসাবাদ করতে পারে। ত্বিষার মানসিক অবস্থার উপরে কোনও চাপ তৈরি করা হয়েছিল কি না, অথবা চিকিৎসা সংক্রান্ত কোনও তথ্য গোপন করা হয়েছিল কি না, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
সূত্রের খবর, সমর্থ সিং জেরায় দাবি করেছেন যে ত্বিষার গর্ভপাতের ঘটনার পরে তিনি মানসিক চাপে ছিলেন। একই সঙ্গে তিনি ৭ লক্ষ টাকার আর্থিক লেনদেন সংক্রান্ত একটি বিষয়ও তদন্তকারীদের সামনে তুলেছেন। তবে SIT-এর তদন্তে উঠে এসেছে, তিনি নিজের ‘নিখোঁজ’ থাকার সময়কাল নিয়ে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছেন।
উল্লেখ্য, গত ১২ মে ভোপালের শ্বশুরবাড়িতে ত্বিষা শর্মার ঝুলন্ত দেহ উদ্ধার হয়। পরিবারের অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই তাঁকে পণ ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছিল। এই ঘটনায় সমর্থ সিং এবং তাঁর মা, অবসরপ্রাপ্ত বিচারক গিরিবালা সিংয়ের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের হয়। পরে মধ্যপ্রদেশ হাই কোর্ট গিরিবালা সিংয়ের আগাম জামিন খারিজ করে দেয়। আদালত পর্যবেক্ষণে জানায়, হোয়াটসঅ্যাপ চ্যাট, আঘাতের চিহ্ন এবং সাক্ষীদের বয়ানে নির্যাতনের অভিযোগের ইঙ্গিত মিলেছে।
বর্তমানে সমর্থ সিং ও গিরিবালা সিং দু’জনেই CBI হেফাজতে রয়েছেন। আদালত তাঁদের ২ জুন পর্যন্ত পাঁচ দিনের CBI হেপাজতে পাঠিয়েছে। তদন্তকারীরা মুখোমুখি বসিয়ে জেরা করছেন এবং ডিজিটাল প্রমাণ, মেডিক্যাল রেকর্ড, ফরেন্সিক রিপোর্ট ও ঘটনাস্থলের পুনর্নির্মাণ— সব মিলিয়ে গোটা ঘটনার টাইমলাইন পুনর্গঠন করার চেষ্টা চলছে।