শ্রেয়সী পাল: একসময় তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জির ডাক পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকতেন তাঁর দলের বিধায়ক থেকে শুরু করে সাধারণ নেতাকর্মীরা। রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের পর তিনি বারবার রবিবার দলের একটি বৈঠকে নির্বাচিত বিধায়কদের ডাকলেও সাড়া দিলেন না বেশিরভাগ জনপ্রতিনিধি। এই ঘটনার পরেই জোর জল্পনা শুরু হয়েছে তৃণমূলের পরিষদীয় দলের ভবিষ্যৎ নিয়ে।
২০২১-এর বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ জেলার ২২টি আসনের মধ্যে কুড়িটি আসনে জয়লাভ করেছিল তৃণমূল কংগ্রেস। তৃণমূল কংগ্রেসের সেই 'সুদিনের' সময়ে অভিষেক ব্যানার্জি বা মমতা ব্যানার্জি কলকাতায় কোনও বৈঠকের ডাক দিলে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে ডাক পাওয়া সমস্ত বিধায়করা প্রায় একদিন আগে থেকেই কলকাতায় হোটেল ভাড়া করে থাকতে চলে যেতেন, যাতে দলের সুপ্রিমোর বৈঠকে সঠিক সময়ে পৌঁছতে পারেন এবং পিছনের সারিতে বসতে না হয়।
২৬-এর বিধানসভা নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ জেলায় ২২ টি আসনের মধ্যে আটটি আসন থেকে জয়ী হয়েছে বিজেপি প্রার্থীরা। অন্যদিকে কংগ্রেস পেয়েছে দু'টি আসন, একটি আসন দখল করেছে সিপিএম। জেলায় এই মুহূর্তে তৃণমূল কংগ্রেসের ১১ জন বিধায়ক থাকলেও দল আর রাজ্যে ক্ষমতায় না থাকায় দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বের ডাকে সাড়া দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করেননি বিধায়করা।
রবিবার প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জির বাড়িতে তৃণমূল কংগ্রেসের পরিষদীয় দলের বৈঠক ডাকা হয়েছিল। দলের ৮০ জন বিধায়কের মধ্যে মাত্র ২০ জন সেখানে উপস্থিত ছিলেন। 'কোরাম' না হওয়ায় সেই বৈঠক বাতিল করে দিতে বাধ্য হন তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা ব্যানার্জি এবং তৃণমূলের পরিষদীয় দলনেতা শোভনদেব চ্যাটার্জি।
সূত্রের খবর, রবিবার কলকাতার কালীঘাটের বৈঠকে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে নির্বাচিত তৃণমূল কংগ্রেসের একজন বিধায়কও উপস্থিত ছিলেন না। জেলা তৃণমূলের অন্দরে কান পাতলেই শোনা যাচ্ছে, বিগত সরকারের আমলে বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পে হওয়া দুর্নীতি তদন্তে পুলিশ যেভাবে সক্রিয় হয়ে উঠেছে এবং একের পর এক তৃণমূল নেতা গ্রেপ্তার হচ্ছেন তাতেই অনেক তৃণমূল বিধায়ক 'ভীত' হয়ে পড়েছেন।
প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রীর বৈঠকে যোগ দিতে গেলে তৃণমূল বিধায়কদের বিরুদ্ধে জেলা পুলিশ আরও সক্রিয় হয়ে উঠতে পারে, সেই আতঙ্কেই গতকাল থেকে মুর্শিদাবাদের অনেক বিধায়ক নিজেদের মোবাইল ফোন অফ রেখেছেন অথবা অজানা নম্বর থেকে আসা ফোন ধরছেন না। আবার অনেক বিধায়ক তৃণমূল সুপ্রিমোর বৈঠকে না যাওয়ার বিভিন্ন 'অজুহাত' তৈরি করে রেখেছেন।
দলের সুপ্রিমোর ডাকা রবিবারের বৈঠকে না যাওয়ার কারণ জানতে চাইলে সুতির তৃণমূল বিধায়ক ইমানী বিশ্বাস বলেন,"আমি এখনও তৃণমূল কংগ্রেসেই আছি। রবিবার নিজের এলাকায় কিছু কাজ নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। সেই কারণে আমার পক্ষে বৈঠকে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এর পেছনে অন্য কোনও কারণ নেই।" অন্যদিকে সাগরদিঘির তৃণমূল বিধায়ক বাইরন বিশ্বাসকে রবিবারের দলীয় বৈঠকে অনুপস্থিতির কারণ জানতে চাইলে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেননি। তাঁর এক আপ্তসহায়ক বলেন,"এমএলএ সাহেবের শরীর খারাপ, তাই তিনি বৈঠকে যেতে পারেননি।" অন্যদিকে এই বিষয় নিয়ে প্রতিক্রিয়ার জন্য বিগত সরকারের আমলে বিদ্যুৎ দপ্তরের প্রতিমন্ত্রী তথা এবার রঘুনাথগঞ্জ থেকে নির্বাচিত তৃণমূল বিধায়ক আখরুজ্জামানকে ফোন করা হলে তিনি ফোন ধরেনি। লালগোলা এবং সামশেরগঞ্জের প্রথমবারের তৃণমূল বিধায়ক যথাক্রমে আব্দুল আজিজ এবং নুর আলমকে ফোন করা হলেও তাঁরা কেউ ফোন ধরে উত্তর দেননি। সংবাদ মাধ্যমের তোলা প্রশ্ন সকলেই এড়িয়ে চলতে শুরু করেছেন।
জেলা তৃণমূলের এক নেতা বলেন," তৃণমূল দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে মুর্শিদাবাদের কোনও তৃণমূল নেতা আর বিজেপি নেতৃত্ব বা পুলিশ প্রশাসনের বিরাগভাজন হতে চাইছেন না। এই কারণে সকলে নিজের নিজের এলাকায় 'লো প্রোফাইল' বজায় রেখে আপাতত কাজ করেছে বলে জানা গিয়েছে। বিজেপি দল বদলের জন্য দরজা একবার খুলে দিলে মুর্শিদাবাদের প্রায় সমস্ত তৃণমূল বিধায়কই দল পরিবর্তন করে নেবেন। গোটা বিষয়কে নিয়ে প্রতিক্রিয়ার জন্য তৃণমূল কংগ্রেসের বহরমপুর মুর্শিদাবাদ সাংগঠনিক জেলা সভাপতি অপূর্ব সরকারকে ফোন করা হলে তিনি বলেন,"এই সম্পর্কে আমার কাছে কোনও তথ্য নেই। আমি জানি না কে গিয়েছিল আর কে যায়নি। "
তৃণমূল বিধায়কদের এই 'অদ্ভুত' আচরণ নিয়ে প্রতিক্রিয়া দিতে গিয়ে বিজেপির বহরমপুর সাংগঠনিক জেলা সভাপতি মলয় মহাজন বলেন, "রাজ্যে পরিবর্তনের আভাস সব থেকে আগে দিয়েছিলো মুর্শিদাবাদের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের মানুষ। এবারের নির্বাচনে মুর্শিদাবাদ জেলা থেকে তৃণমূলের যে কয়েকজন বিধায়ক হয়েছেন তাঁদের বেশিরভাগ সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের। তাঁরা এখন ভাবছে দলে থাকলে কী পাবো আর দল ছাড়লে কী পাবো। তৃণমূল বিধায়করাও নিজেদের মধ্যে গোপনে এই নিয়ে আলোচনা চালাচ্ছেন বলে আমরা খবর পেয়েছি। তৃণমূলের অন্দরেই এখন দলের বিরুদ্ধে ক্ষোভ চরমে। বিধায়করা শক্ত-পোক্ত করে 'টান' মারার প্রস্তুতি নিচ্ছেন। হটাৎ করেই একদিন সকলের ক্ষোভ প্রকাশ্যে চলে আসবে।"