ইন্দ্রনীল খাঁ: নার্সারি থেকেই ফার্স্ট বয়, মন্ত্রী হিসেবে শপথ চিকিৎসক পরিবারের ইন্দ্রনীলের
চিকিৎসক হিসেবে পরিচিতি আগেই ছিল। এবার সেই পরিচয়ের সঙ্গে যুক্ত হল মন্ত্রিত্ব। সোমবার রাজ্যের মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ডা. ইন্দ্রনীল খাঁ। নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় তাঁর অন্তর্ভুক্তিকে অনেকেই তরুণ, শিক্ষিত এবং পেশাদার নেতৃত্বের প্রতি আস্থার প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। সম্ভ্রান্ত চিকিৎসক পরিবারে বেড়ে ওঠা ইন্দ্রনীলের বাবা ডা. চঞ্চল খাঁ এবং মা দীপালি খাঁ দু’জনেই সমাজে সুপরিচিত ছিলেন।
পরিবারের সদস্যদের কথায়, ছোটবেলা থেকেই মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। তাঁর দিদি দেবপ্রিয়া খাঁ, বর্তমানে আমডাঙার জয়েন্ট বিডিও। তিনি জানান নার্সারি থেকেই প্রায় প্রতিটি পরীক্ষায় প্রথম হতেন ইন্দ্রনীল। চিকিৎসা পেশার পাশাপাশি রাজনীতির প্রতিও বরাবর আকর্ষণ ছিল তাঁর। ছাত্রজীবন থেকেই রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন তিনি। রোগী দেখা এবং জনজীবনের কাজ, দুই ক্ষেত্রেই সমান গুরুত্ব দিয়ে এগিয়েছেন। পরিবারের মতে, সমাজসেবার মানসিকতা তিনি পেয়েছেন বাবার কাছ থেকেই। ডা. চঞ্চল খাঁ বহু মানুষকে বিনামূল্যে চিকিৎসা পরিষেবা দিতেন।
রাজনীতিতে তাঁর উত্থান অবশ্য খুব দ্রুত। পেশাদারদের রাজনীতিতে আনার যে নীতি বিজেপি গ্রহণ করেছিল, ইন্দ্রনীলকে তার সফল উদাহরণ বলে মনে করা হয়। সাংগঠনিক দক্ষতা এবং যুব সমাজের মধ্যে প্রভাবের জেরে তিনি বিজেপি যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতির দায়িত্ব পান। সেই দায়িত্বে থেকে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ঘুরে সংগঠনকে শক্তিশালী করার কাজ করেছেন। দুর্নীতিবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সামাজিক ইস্যুতে রাজপথে সক্রিয় ভূমিকা নিতে দেখা গিয়েছে তাঁকে। রাজনৈতিক মহলের মতে, অল্প সময়ের মধ্যেই তিনি দলের শীর্ষ নেতৃত্বের আস্থা অর্জন করেন। বিশেষ করে শুভেন্দু অধিকারীর ঘনিষ্ঠ ও বিশ্বস্ত মুখ হিসেবেও পরিচিতি তৈরি হয়েছে তাঁর। এবার মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়ে সেই রাজনৈতিক যাত্রায় আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পালক যোগ হল।
দুধ কুমার মণ্ডল: অনুব্রতদের গড়ে বিজেপির পতাকা ধরে রাখা দুধকুমার-ই এবার পূর্ণমন্ত্রী
বীরভূমে বিজেপির সংগঠন গড়ে তোলার লড়াইয়ে যাঁদের নাম প্রথম সারিতে উঠে আসে, তাঁদের অন্যতম দুধ কুমার মণ্ডল। দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর এবার তিনি রাজ্যের মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন। ময়ূরেশ্বরের ব্রাহ্মণবহড়া গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম তাঁর। ছোটবেলা থেকেই দুধ খেতে ভীষণ ভালোবাসতেন বলে মা ভাগীরথী দেবী আদর করে তাঁর নাম রাখেন ‘দুধকুমার’।
সময়ের সঙ্গে সেই নামই হয়ে ওঠে তাঁর পরিচয়ের অংশ। রাজনীতির ময়দানে সাফল্য সহজে আসেনি। ২০১১ এবং ২০১৬ সালের বিধানসভা নির্বাচন, এমনকি ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটেও পরাজয়ের মুখ দেখতে হয়েছিল তাঁকে। কিন্তু প্রতিটি ব্যর্থতার পরেও সংগঠনের কাজে আরও বেশি মন দেন তিনি। ২০১৫ সালে বিজেপির বীরভূম জেলা সভাপতির দায়িত্ব পাওয়ার পর জেলার বিভিন্ন প্রান্তে সংগঠন বিস্তারে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, যে সময়ে বীরভূমে অনুব্রত মণ্ডল ও কাজল শেখের মতো প্রভাবশালী নেতাদের দাপট ছিল, সেই সময়েও বিজেপির সংগঠনকে টিকিয়ে রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন দুধ কুমার। মন্ত্রীত্ব পাওয়ার পর তাঁর লক্ষ্যও স্পষ্ট। বীরভূমে তোলাবাজি, সন্ত্রাস ও গুন্ডারাজের পরিবর্তে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়নের গতি আরও বাড়িয়ে তোলার কথা জানিয়েছেন তিনি। দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াইয়ের পর ২০২৬ সালে এসে সেই অধ্যবসায়েরই পুরস্কার পেলেন বিজেপির এই প্রবীণ নেতা।
গৌরীশঙ্কর ঘোষ: ‘তোষণ আর বিভাজনের রাজনীতি থেকে মুর্শিদাবাদকে বের করব’, মন্ত্রী হয়ে বার্তা গৌরীশঙ্করের
মুর্শিদাবাদ থেকে বিধায়ক নির্বাচিত হওয়ার পর এবার রাজ্যের মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রীর দায়িত্ব পেলেন গৌরীশঙ্কর ঘোষ। মন্ত্রিত্ব পেয়েই তিনি স্পষ্ট বার্তা দিয়েছেন, মানুষের প্রত্যাশা পূরণ করাই তাঁর প্রধান দায়িত্ব। গৌরীশঙ্করের কথায়, ভোট দিয়ে মানুষ যে আস্থা দেখিয়েছেন, তার মর্যাদা রাখা এখন সরকারের কর্তব্য। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নের নিরিখে পিছিয়ে থাকা মুর্শিদাবাদকে নতুন করে গড়ে তোলার প্রয়োজন রয়েছে।
সীমান্তবর্তী এই জেলার নানা সমস্যার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর সীমান্ত এলাকায় জমি অধিগ্রহণ এবং ফেন্সিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। এর ফলে নিরাপত্তা এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ আরও শক্তিশালী হবে বলে তাঁর বিশ্বাস। গৌরীশঙ্করের অভিযোগ, এতদিন তোষণ, রাজনৈতিক হিংসা এবং বিভাজনের রাজনীতি জেলার উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করেছে। সেই পরিস্থিতি বদলে মুর্শিদাবাদকে উন্নয়নের মূলস্রোতে ফিরিয়ে আনাই তাঁর লক্ষ্য। মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর জেলার পরিকাঠামো, নিরাপত্তা ও সামগ্রিক উন্নয়নকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও জানিয়েছেন তিনি।
সুমনা সরকার: জেলা পরিষদ থেকে মন্ত্রীসভা, দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পেরিয়ে মন্ত্রী সুমনা
বলাগড়ের রাজনৈতিক পরিবারে বেড়ে ওঠা সুমনা সরকারের। বিধায়ক হিসেবে জয়ের পর এবার রাজ্যের মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নিলেন তিনি। কংগ্রেসের প্রাক্তন বিধায়ক বীরেন সরকারের কন্যা সুমনা। মা গীতা সরকার। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সঙ্গীত এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। বর্তমানে শিবপুরের হাজরাপাড়ায় স্বামী বিদ্যুৎ সরকার, শাশুড়ি নিভা সরকার এবং ছেলে শুভায়ুকে নিয়ে তাঁর সংসার। স্বামী ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত, আর ছেলে নবম শ্রেণিতে পড়াশোনা করছে।বাবার রাজনৈতিক জীবন থেকেই রাজনীতির প্রতি আগ্রহ তৈরি হয়েছিল তাঁর। ২০১৩ সালে হুগলি জেলা পরিষদের সদস্য হিসেবে রাজনৈতিক যাত্রা শুরু।
পরে সহ-সভাধিপতির দায়িত্বও সামলেছেন। ২০২১ সালে মুকুল রায়ের হাত ধরে বিজেপিতে যোগ দেন তিনি। এবার বিধানসভা নির্বাচনে প্রায় ৪৩ হাজার ভোটের ব্যবধানে জয়ী হন সুমনা। মন্ত্রিত্ব পাওয়ার খবর পেয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন তিনি। তাঁর কথায়, কখনও ভাবেননি এত বড় দায়িত্ব তাঁর হাতে তুলে দেওয়া হবে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘বলাগড়ের মানুষের উন্নয়নই এখন তাঁর প্রধান লক্ষ্য।’ একই সঙ্গে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের পৈতৃক ভিটে সংরক্ষণ এবং তা ঘিরে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়েও আশাবাদী সুমনা। সকলকে সঙ্গে নিয়েই এলাকার উন্নয়নের কাজ এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার করেছেন নবনিযুক্ত এই মন্ত্রী।
অরূপকুমার দাস: শুভেন্দুর গড় কাঁথি থেকে মন্ত্রীসভায়, পূর্ণমন্ত্রী হলেন অরূপকুমার দাস
দক্ষিণ কাঁথির বিধায়ক অরূপকুমার দাস এবার রাজ্যের মন্ত্রিসভায় পূর্ণমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেওয়ায় পূর্ব মেদিনীপুরে উৎসবের আবহ তৈরি হয়েছে। স্থানীয় স্তর থেকে উঠে আসা এই নেতার সাফল্যে খুশি দলের কর্মী-সমর্থকরাও। কাঁথি পুরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা অরূপ দীর্ঘদিন ধরে এলাকার রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাৎপর্যপূর্ণভাবে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর এলাকার বিধায়কও তিনি। কাউন্সিলর হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতার পাশাপাশি তিনি বিজেপির কাঁথি সাংগঠনিক জেলার সভাপতির দায়িত্বও সামলেছেন। সংগঠনের কাজে সক্রিয় ভূমিকার সুবাদে ধীরে ধীরে জেলার রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ মুখ হয়ে ওঠেন তিনি। ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে দ্বিতীয়বারের জন্য দক্ষিণ কাঁথি কেন্দ্র থেকে জয়ী হওয়ার পরই মন্ত্রিসভায় জায়গা পেলেন তিনি।