• ভুয়ো ‘লক্ষ্মী’র অ্যাকাউন্টে ৪৫০ কোটি! তদন্তে সিট, ঘোষণা মুখ্যমন্ত্রীর
    এই সময় | ০২ জুন ২০২৬
  • এই সময়: অঙ্কটা অন্তত ৪৫০ কোটি টাকা!

    মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’র ভুয়ো উপভোক্তাদের যে সংখ্যা সোমবার দিয়েছেন, সেই অনুযায়ী ওই প্রকল্পে বছরে প্রায় সাড়ে চারশো কোটি টাকা গচ্চা গিয়েছে রাজ্য সরকারের। মুখ্যমন্ত্রীর ধারণা, এই অঙ্কটা আরও বাড়তে পারে। এই প্রকল্পে দুর্নীতির শিকড় খুঁজতে বিশেষ তদন্তকারী দল বা ‘সিট’ তৈরি করা হচ্ছে বলে সোমবার নবান্নে ঘোষণা করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। তিনি জানান, নতুন সরকারের চালু করা ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’র জন্য অনলাইনে আবেদন এ দিন থেকেই শুরু করা হয়েছে। অফলাইনে ফর্ম জমা দেওয়া প্রক্রিয়া আগেই শুরু হয়ে গিয়েছিল। শুভেন্দু জানান, ‘লক্ষ্মীর ভাণ্ডারে’ এখনও পর্যন্ত মোট ২২ জন এমন উপভোক্তা পাওয়া গিয়েছে, যাঁরা প্রত্যেকেই পুরুষ। এঁদের বেশিরভাগই মুর্শিদাবাদের। সব থেকে বেশি সংখ্যক ভুয়ো অ্যাকাউন্টের খোঁজ মিলেছে জঙ্গিপুরে।

    সোমবার নবান্নে সাংবাদিক বৈঠকে শুভেন্দু বলেন, ‘এখনও পর্যন্ত মোট ২২টি ভুয়ো ঘটনা সামনে এসেছে, যেখান থেকে পুরুষদের অ্যাকাউন্টে লক্ষ্মীর ভাণ্ডারের টাকা ঢুকছে। তার একটি অ্যাকাউন্ট রাকিবুলের, আরও ১৫টি মুস্তাফিজুর রহমান ও তাঁর স্ত্রী তুহিনার। বাকি ৬টি অ্যাকাউন্ট তারিকুল রহমানের।’ অন্নপূর্ণা যোজনার ১২ পাতার দীর্ঘ ফর্ম নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়ানোর অভিযোগ তুলে মুখ্যমন্ত্রীর সংযোজন, ‘যাঁরা ১২ পাতা, ১৬ পাতা, ১৮ পাতা করছেন— জনগণের দ্বারা প্রত্যাখ্যাত সেই নেতাদের দলকে বলব, সংখ্যাটা কত হবে আমরা জানি না। অনুপ্রবেশকারী, হাজার হাজার তৃণমূল নেতা, যাঁরা মহিলা নন, তাঁরা লক্ষ্মীর ভাণ্ডার লুট করেছেন।’ এর পরেই হুঁশিয়ারির সুরে তিনি বলেন, ‘আমরা কাউকে ছাড়ব না। ডিজিপি-কে সিট গঠন করতে বলেছি। আমরা হিসেব করে দেখেছি। রাকিবুল, মুস্তাফিজুরদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা হবে। লুটেরাদের পার্টি কী ভাবে লুট করেছে এটা তার প্রমাণ। তৃণমূল স্তর থেকে খতিয়ে দেখা হবে।’ এই অভিযুক্তদের কাছ থেকে কি ভাতার টাকা ফেরত নেওয়া হবে? এই প্রশ্নের জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘আমরা তদন্ত করে দেখি দুর্নীতির গভীরতা কতটা, টাকার অঙ্কটা কত। যে হেতু এটা আর্থিক দুর্নীতি এবং টাকা পাচার হয়েছে, ফলে মানি লন্ডারিং কেস। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট বিভাগেও তা পাঠানো হবে।’

    ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’ প্রকল্প প্রসঙ্গে এ দিন মুখ্যমন্ত্রী আরও বলেন, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা নিয়ে মিথ্যা প্রচার চলছে। ফর্ম পূরণ করতে এগিয়ে এসেছেন অনেকে। জনগণ সহযোগিতা করেছেন। সোমবার থেকে অনলাইনে চালু হয়ে গিয়েছে। আশা করছি, বুধবার আরও অনেকের ফর্ম ফিলআপের কাজ হয়ে যাবে।’ ওই দিনই পূর্ণাঙ্গ মন্ত্রিসভার বৈঠক হবে বলেও জানান মুখ্যমন্ত্রী। সে দিনই কয়েক জনের অ্যাকাউন্টে ভাতার টাকা ট্রান্সফার করে প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক সূচনা হবে।

    শুভেন্দু জানান, যে ৩০ লক্ষ ভুয়ো অ্যাকাউন্টের কথা বলা হয়েছে, তার মধ্যে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশনে (সার) বাদ যাওয়া নাম ও পুরুষ উপভোক্তা মিলিয়ে অন্তত ৩০ লক্ষ নাম বাদ যাবে। তিনি বলেন, ‘হিসেব বলছে, হাজার হাজার কোটি টাকা লুট করেছে পূর্বতন সরকার।’ দুর্নীতির প্রসঙ্গ তুলে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘৩০ লক্ষ এমন ভুয়ো অ্যাকাউন্টে টাকা ঢুকেছে। ৩০ লক্ষ অ্যাকাউন্টে যদি ১৫০০ টাকা করে ঢোকে, তা হলে কত টাকা লুট হচ্ছে, হিসেব করে দেখুন।’ পশ্চিম মেদিনীপুরের চন্দ্রকোণা–১ ব্লকের দোঁয়্যা ও মনোহরপুর এলাকায় তৃণমূলের পঞ্চায়েত সদস্য পূজা বাগরা ও তাঁর স্বামী সুকুমার বাগরা টাকা নিয়ে ভুয়ো উপভোক্তাদের নাম লক্ষ্মীর ভাণ্ডার তালিকায় তুলেছেন বলে অভিযোগ। গৌতম দণ্ডপাট নামের এক তৃণমূল নেতাও এই ঘটনায় জড়িত। শনিবার গৌতমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সোমবার গ্রেপ্তার হন পূজার স্বামী সুকুমার। এ দিন সুকুমারকে ঘাটাল মহকুমা আদালতে তোলা হলে ১৪ দিনের জেল হেফাজতের নির্দেশ দেন বিচারক। পুলিশ জানিয়েছে, গৌতমকে জেরা করে সুকুমারকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

    মুখ্যমন্ত্রীর দাবি, ‘অন্নপূর্ণা যোজনা’কে ঘিরে পরিকল্পিত ভাবে বিভ্রান্তি ছড়ানোর চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যাঁরা এতদিন প্রকল্প নিয়ে সমালোচনা করছিলেন, তাঁদের অনেককেই এখন বিভিন্ন এলাকায় আবেদনপত্র পূরণ করতে দেখা যাচ্ছে।’ মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ দ্রুত এগোচ্ছে। প্রধান সচিব পর্যায়ের ২০ জন আমলা জেলায় জেলায় প্রকল্পের অগ্রগতি খতিয়ে দেখছেন।’ তিনি জানান, প্রতিদিন অন্তত ২ লক্ষ আবেদনপত্র খতিয়ে দেখে তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। প্রশাসনের আশা, খুব শিগগিরই বিপুল সংখ্যক উপভোক্তার ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে অর্থ পাঠানোর কাজ শুরু হবে।

    আবেদনকারীর পাশাপাশি পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের তথ্য দেওয়া প্রসঙ্গে তাঁর বক্তব্য, ‘সরকার যখন আর্থিক সহায়তা দিচ্ছে, তখন প্রকৃত উপভোক্তা নির্বাচন নিশ্চিত করতে কিছু তথ্য যাচাই করা স্বাভাবিক। এক জন উপভোক্তাকে বছরে ৩৬ হাজার টাকা দেবে (সরকার), সহযোগিতা করুন না! আপনি ২০ টাকার ঢেঁড়স কিনতে গেলেও তো টিপে দেখেন। উপযুক্ত প্রাপকরা সবাই টাকা পাবেন।’ মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘সরকারি টাকা মানুষের টাকা। তাই কারা প্রকৃত ভাবে এই সুবিধা পাওয়ার যোগ্য, তা নিশ্চিত করা জরুরি। কোনও রকম তাড়াহুড়ো না করে সঠিক তথ্য দিয়ে আবেদন করার অনুরোধ করছি।’

  • Link to this news (এই সময়)