নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: বিধানসভা ভোটে বিপর্যয়ের একমাসের মধ্যেই কি আড়াআড়ি ভাগ হতে চলেছে তৃণমূল কংগ্রেস? মহারাষ্ট্র মডেলে শিবসেনার মতোই ভাঙছে প্রাক্তন শাসকদল? বাংলাতেও কি তবে ‘অপারেশন লোটাস’? বিধায়কদের সই জাল কাণ্ডের তদন্তের গতিপ্রকৃতি অন্তত সেরকমটাই নির্দেশ করছে! এমনকি সেই সই ‘জাল’ ফাঁস করে সোমবারই তৃণমূল থেকে বহিষ্কৃত হওয়া দুই বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও সন্দীপন সাহাকে সামনে রেখে যেভাবে বৈঠকে বসেছিলেন বিধায়করা, তাতে দল ভাঙার সম্ভাবনা আরও প্রকট হয়েছে। সূত্রের খবর, বিদ্রোহী তৃণমূল বিধায়করা বিরোধী দলনেতা বাছাই করে সর্বসম্মত প্রস্তাব জমা দেবেন বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন বসুর কাছে। এমনকি অধিবেশন কক্ষে বসার জন্য আলাদা ‘ব্লক’ও চাইবেন তাঁরা। বিদ্রোহীদের দাবি, ইতিমধ্যেই ৫৪ বিধায়কের সমর্থন মিলেছে। পরিষদীয় রীতি অনুযায়ী, মোট বিধায়কের দুই-তৃতীয়াংশের সমর্থন মিললে, দলের নির্বাচনি প্রতীক পাওয়ার অধিকার জন্মায়। তৃণমূলের বিদ্রোহীদের ক্ষেত্রে ৫২ জন বিধায়কের সমর্থন প্রয়োজন। সেই নিরিখে জোড়াফুলের বিদ্রোহীরা ‘সিম্বল’ চাইতে শিবসেনার ‘সিন্ধে’ ফরমুলা প্রয়োগ করেন কি না, তার উপরেই নজর রাখছে রাজনৈতিক মহল। সূত্রের খবর, বিদ্রোহীদের আপ্তবাক্য—‘আমিই প্রকৃত তৃণমূল’।
শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়কে বিরোধী দলনেতা করতে তৃণমূলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের পাঠানো ফরওয়ার্ডিং লেটারের সঙ্গে যে ৭০ জন বিধায়কের স্বাক্ষরিত কাগজ জমা পড়েছিল, তার মধ্যে অনেক এমএলএরই সই জাল। উলুবেড়িয়া পূর্বের তৃণমূল বিধায়ক ঋতব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় এবং এন্টালির বিধায়ক সন্দীপন সাহা বিষয়টি অভিযোগ আকারে লিখিতভাবে জানিয়েছিলেন বিধানসভার অধ্যক্ষ রথীন বসুকে। সোমবার সাংবাদিক সম্মেলনে বিষয়টি উল্লেখ করেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। তাঁর কটাক্ষ—‘সব চোরেদের পাঠশালা, কালীঘাটের টালির চালা!’ একইসঙ্গে তিনি জানান, ওই দুই বিধায়কের অভিযোগের ভিত্তিতেই হয়েছিল এফআইআর এবং সিআইডি তদন্ত। ১৪ জন বিধায়কের সই জাল করা হয়েছে। তার মধ্যে অরূপ রায়, শুভাশিস দাস এবং বাহারুল ইসলাম ইতিমধ্যেই স্বীকার করেছেন, ওই সই তাঁদের নয়। মুখ্যমন্ত্রীর সাংবাদিক সম্মেলনের পর তড়িঘড়ি সই ‘জাল’ ফাঁস কাণ্ডে ঋতব্রত এবং সন্দীপনকে বহিষ্কার করে তৃণমূল। পালটা তোপ দেগে দলের বিরুদ্ধে ‘বিদ্রোহ’ ঘোষণা করেন তৃণমূলের দুই তরুণ বিধায়ক। এই পর্বেই সই জাল কাণ্ডে এদিন সন্ধ্যায় অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাট রোডের বাড়িতে যান সিআইডির তদন্তকারীরা। এদিন তাঁর ভবানীভবনে হাজিরা দেওয়ার কথা ছিল। এদিন সকালে সিআইডিকে অভিষেক জানিয়েছিলেন, তিনি অসুস্থ। তাই দু’সপ্তাহ সময় চাইছেন। কিন্তু সময় দিতে নারাজ সিআইডি তদন্তকারীরা তাঁর বাড়িতে নোটিস পৌঁছে দিয়েছেন। আগামী ৮ জুন ভবানীভবনে হাজিরা দিতে হবে অভিষেককে।
রবিবার তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের কালীঘাটের বাড়ির বৈঠকে অনুপস্থিত থাকা ৬০ জন বিধায়ককে ঘিরে ‘নয়া তৃণমূল’ গঠনের প্রক্রিয়া চলছিল। সোমবার বিকালে ঋতব্রত-সন্দীপনের বহিষ্কারের পর তা জোরকদমে শুরু হয়ে যায়। ইএম বাইপাস লাগোয়া রুবির মোড়ের এক পাঁচতারা হোটেলে জমায়েত হন বিদ্রোহীরা। সেখানে অবশ্য ঋতব্রত-সন্দীপন ছিলেন না। এরপর কিড স্ট্রিটের এমএলএ হস্টেলে গিয়ে সবাই বৈঠকে বসেন। সেখানে পরবর্তী পদক্ষেপ এবং কৌশল নির্ধারণ করেন বিদ্রোহীরা। সেখানে উপস্থিত ছিলেন ঋতব্রত-সন্দীপন। সূত্রের খবর, গোটা অপারেশনের মাথা রয়েছে দিল্লিতে। আর উত্তর-পূর্বের একটি রাজ্য থেকে নাড়া হচ্ছে কলকাঠি। এদিনের বৈঠকে কারা এসেছিলেন? কলকাতা লাগোয়া দুই কেন্দ্রের পাশাপাশি হাওড়া, উত্তর ২৪ পরগনা, মুর্শিদাবাদ, নদীয়া, পশ্চিম মেদিনীপুর, মালদহ, উত্তর দিনাজপুর জেলার বেশ কয়েকজন বিধায়ক কিড স্ট্রিটের বৈঠকে হাজির ছিলেন। দক্ষিণবঙ্গের এক বিদ্রোহী বিধায়ক বলেন, ‘আমরা দিদিকে দেখে দল করতে এসেছিলাম। কারও গোলামি করতে নয়। ৬ মের কালীঘাটের বৈঠকে শুনতে হল, আমরা ভোটে কেউ কাজ করিনি। যা করেছেন, একা অভিষেক। তাই উঠে দাঁড়িয়ে তাঁকে অভিবাদন জানানোর নির্দেশ দেওয়া হয়। এটা কেন হবে? এটা মোটেও গণতন্ত্র নয়! এটা স্বৈরতন্ত্র!’ ওই বিধায়কের কথায়, ‘বিরোধী দলনেতা কে হবেন, তা নিয়ে ৬ তারিখ কোনো রেজল্যুশন হয়নি।’ তৃণমূল সুপ্রিমো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এরপরও দাবি করেছেন, ‘ওরা চক্রান্তের খেলায় নেমেছে। কিন্তু জানে না, আমি বড়ো খেলোয়াড়। সবাই বেরিয়ে গেলেও নতুন তৃণমূল গঠন করে নেব।’