• রূপা-রুদ্রনীল নন, মন্ত্রী অর্জুন! মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণে বিজেপির রাজনৈতিক বার্তা কী
    eTV Bharat | ০২ জুন ২০২৬
  • কলকাতা, 1 জুন: ভোটের ফলাফল কি শুধুই ক্ষমতার চাবিকাঠি ? নাকি মন্ত্রিসভার দরজাও খুলে দেয় ? শুভেন্দু অধিকারী সরকারের প্রথম বড় মন্ত্রিসভা সম্প্রসারণের পরে রাজনৈতিক মহলে এখন সবচেয়ে বেশি চর্চার বিষয় সেটাই ।

    2026 সালের বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যের 23 জেলার মধ্যে 9 জেলায় 'ক্লিন সুইপ' করেছে বিজেপি । পূর্ব মেদিনীপুর, ঝাড়গ্রাম, বাঁকুড়া, পুরুলিয়া, পশ্চিম বর্ধমান, আলিপুরদুয়ার, জলপাইগুড়ি, দার্জিলিং এবং কালিম্পং- এই জেলাগুলির প্রতিটি আসনই গিয়েছিল গেরুয়া শিবিরের ঝুলিতে । ফলে মন্ত্রিসভা গঠনের সময় এই জেলাগুলির গুরুত্ব বাড়বে বলেই মনে করেছিলেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা । বাস্তব ছবিও অনেকাংশে সেই ইঙ্গিতই দিচ্ছে ।

    সবচেয়ে বড় লাভবান পূর্ব মেদিনীপুর । মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর রাজনৈতিক দুর্গ হিসেবে পরিচিত জেলায় 16টির 16টিই জিতেছে বিজেপি । জেলার চার বিধায়ককে মন্ত্রিসভায় স্থান দেওয়া হয়েছে । কাঁথি দক্ষিণের অরূপ কুমার দাস হয়েছেন পূর্ণমন্ত্রী । তমলুকের হরেকৃষ্ণ বেরা, ময়নার অশোক দিন্দা এবং ভগবানপুরের শান্তনু প্রামাণিক পেয়েছেন প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব । এক জেলা থেকেই চার মন্ত্রী !

    জঙ্গলমহলেও ভোটের ফলের প্রতিফলন স্পষ্ট । ঝাড়গ্রামের চারটি আসনেই বিজেপির জয় । ফলে গোপীবল্লভপুরের রাজেশ মাহাতোকে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং নয়াগ্রামের অমিয় কিস্কুকে প্রতিমন্ত্রী করা হয়েছে । বাঁকুড়ার 12টি এবং পুরুলিয়ার 9টি আসনের সবকটিই বিজেপির দখলে গেলেও প্রতিনিধিত্ব তুলনায় কম । রানিবাঁধের ক্ষুদিরাম টুডুকে আগেই মন্ত্রিসভায় জায়গা দেওয়া হয়েছিল । নতুন করে জায়গা পেয়েছেন সোনামুখীর দিবাকর ঘরামি । পুরুলিয়া থেকে প্রতিমন্ত্রী হয়েছেন নাদিয়ার চাঁদ বাউড়ি ।

    পশ্চিম বর্ধমানের 9টি আসনের সবকটিতেই জয়ী হয়েছে পদ্ম শিবির ৷ এই জেলা থেকে আগেই মন্ত্রী করা হয়েছিল আসানসোল দক্ষিণের বিধায়ক অগ্নিমিত্রা পালকে ৷ এদিন সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভায় কুলটির অজয় পোদ্দারকেও পূর্ণমন্ত্রী করা হল ৷

    মন্ত্রিসভায় বিশেষ গুরুত্ব পেয়েছে উত্তর 24 পরগনাও । জেলার 33টি আসনের মধ্যে 23টিতে জয়ী হয়েছিল বিজেপি । বনগাঁ উত্তরের অশোক কীর্তনিয়া আগেই মন্ত্রী ছিলেন। সম্প্রসারিত তালিকায় পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন বিধাননগরের শারদ্বত মুখোপাধ্যায়, নোয়াপাড়ার অর্জুন সিং এবং খড়দহের কল্যাণ চক্রবর্তী । ফলে এক জেলা থেকেই চার পূর্ণমন্ত্রী ।

    রাজধানী কলকাতার গুরুত্বও অটুট । 11টির মধ্যে 6টি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি । ভবানীপুর থেকে জয়ী মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর পাশাপাশি পূর্ণমন্ত্রী হয়েছেন মানিকতলার তাপস রায় ও রাসবিহারীর স্বপন দাশগুপ্ত । শ্যামপুকুরের পূর্ণিমা চক্রবর্তী হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী । রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক গুরুত্বের নিরিখে কলকাতার এই প্রতিনিধিত্ব তাৎপর্যপূর্ণ বলেই মত রাজনৈতিক মহলের ।

    দক্ষিণ 24 পরগনায় বিজেপি ও তৃণমূলের লড়াই ছিল হাড্ডাহাড্ডি । 16টি আসনে জয় পেয়েছিল বিজেপি । এখানকার কাকদ্বীপের দীপঙ্কর জানা পূর্ণমন্ত্রী এবং বেহালা পশ্চিমের ইন্দ্রনীল খাঁকে স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী করা হয়েছে ।

    তবে মন্ত্রিসভার তালিকা প্রকাশের পর সবচেয়ে বেশি আলোচনা শুরু হয়েছে উত্তরবঙ্গকে ঘিরে । 41 সদস্যের মন্ত্রিসভায় উত্তরবঙ্গ থেকে রয়েছেন 11 জন । চার জন পূর্ণমন্ত্রী, এক জন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং ছয় জন প্রতিমন্ত্রী । কোচবিহারের নিশীথ প্রামাণিকের পাশাপাশি তুফানগঞ্জের মালতী রাভা রায়ত পেয়েছেন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর দায়িত্ব ।

    আলিপুরদুয়ারে পাঁচটির পাঁচটি আসনে জয়ের পুরস্কার হিসেবে দীপক বর্মন ও মনোজ কুমার ওঁরাও-কে পূর্ণমন্ত্রী করা হয়েছে । বিশাল লামা হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী । দার্জিলিংয়ের পাঁচটি আসনেই জয় পাওয়ার প্রতিফলন হিসেবে শঙ্কর ঘোষ পেয়েছেন পূর্ণমন্ত্রীর পদ । মাটিগাড়া-নকশালবাড়ির আনন্দময় বর্মন হয়েছেন প্রতিমন্ত্রী ।

    তবে বিস্ময়ও রয়েছে। জলপাইগুড়ির সাতটি আসনের সাতটিতেই জয় পেয়েছে বিজেপি । অথচ সেই জেলা থেকে একজন বিধায়কও মন্ত্রিসভায় জায়গা পাননি । একই ছবি কালিম্পংয়ে । আবার দীর্ঘদিনের বিজেপি মুখ রুদ্রনীল ঘোষ কিংবা রূপা গঙ্গোপাধ্যায়ের নামও তালিকায় নেই । অন্যদিকে একাধিকবার দলবদলের পরও নোয়াপাড়ার অর্জুন সিং সরাসরি পূর্ণমন্ত্রীর পদ পেয়েছেন । যা নিয়ে দলের অন্দরেই অনেকে উষ্মা প্রকাশ করে বলছেন, "অর্জুনও মন্ত্রিসভায় জায়গা পেয়ে গেল !"

    আরও একটি প্রশ্ন উঠে এসেছে নারী প্রতিনিধিত্ব নিয়ে । 41 সদস্যের মন্ত্রিসভায় মহিলা মন্ত্রী মাত্র সাত জন । একজন পূর্ণমন্ত্রী, একজন স্বাধীন দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রী এবং পাঁচ জন প্রতিমন্ত্রী । শতকরা হিসেবে 17.07 শতাংশ ৷ 2023 সালের 'নারী শক্তি বন্দন আইনে' সংসদ ও রাজ্যের বিধানসভাগুলিতে নারীদের জন্য 33 শতাংশ আসন সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছে ৷ সেদিক থেকে বিজেপির মন্ত্রিসভায় মহিলাদের সীমিত উপস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক মহলে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে ।

    যদিও বিজেপি সূত্রের দাবি, ভবিষ্যতে মন্ত্রিসভায় আরও দুই বা তিনজন মহিলা সদস্য যুক্ত করা হতে পারে ৷ বস্তুত, 294 আসনের বিধানসভায় সর্বোচ্চ 44জনের মন্ত্রিসভা গঠন করা যেতে পারে ৷

    সব মিলিয়ে সম্প্রসারিত মন্ত্রিসভার গঠন একটাই ইঙ্গিত দিচ্ছে, ভোটের বাক্সে যে জেলা বিজেপিকে যত বেশি আসন উপহার দিয়েছে, মন্ত্রিসভার টেবিলে তার প্রভাবও ততটাই বেশি । ব্যতিক্রম অবশ্য রয়েছে । কিন্তু সামগ্রিক ছবিতে 'ভোটের পুরস্কার' এবং 'মন্ত্রীত্বের ভাগ'-দুইয়ের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে পাচ্ছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা ।
  • Link to this news (eTV Bharat)