সুব্রত মুখার্জি নেই, নেই মুকুল, সাধন-সোমেন। মমতা যাঁদের হাত ধরে তৃণমূলের শুরুর দিনে লড়াই করেছিলেন, তাঁদের কয়েকজন রয়েছেন এখন। মাঝের কাহিনি সকলের জানা। মমতা বিরোধী নেত্রী থেকে ক্ষমতার সিংহাসনে বসেছেন। তার জন্য বিরোধী দলের নেত্রী পেরিয়ে এসেছেন লম্বা লড়াইয়ের পথ। ঘাড় ধাক্কা খেয়েছেন, পথ অবরোধ করেছেন, তুমুল বিদ্রোহে রাজপথে নেমেছেন, বিধানসভায় ভাঙচুর করেছেন।
ঠিক ১৫ বছরের এদিক ওদিক। সিংহাসন, ক্ষমতার স্বাদ, চোখ বন্ধ করে দলের নেতাদের ভরসা, সেই নেতাদের বিরুদ্ধে সর্বস্তরে অসংখ্য চুরি-দুর্নীতির অভিযোগ, এবং চার নম্বর বার ক্ষমতা জেতার মাথায় একেবারে ভরাডুবি। দেড় দশকে তৃণমূলের উত্থান যতটা চোখে পড়েছে। পতন যেন চোখে পড়ছে তার থেকেও বেশি। কারণ, এক মাসও হয়নি, তৃণমূল হারার। তার মাঝেই একেবারে বে-আব্রু ঘাসফুল শিবিরের ভিতর। আজ এই নেতা, কাল ওই নেতা, পরশু অমুক সাংসদ, তরশু তুসুক কাউন্সিলর ভুরি ভুরি ক্ষোভ প্রকাশ করছেন। ৮০ বিধায়কের, ২ জন ইতিমধ্যেই দলের অন্দরের কেলেঙ্কারি সোজা বিধানসভায় 'কমপ্লেন' করে বহিষ্কৃত হয়েছেন। রইল বাকি ৭৮। তারও সিংহভাগ নাকি জল মাপছেন। সবথেকে উল্লেখযোগ্য এই বিক্ষুব্ধ নেতা-নেত্রীদের আবার বড় অংশের ক্ষোভ একজনের বিরুদ্ধে। বর্তমান মুখ্যমন্ত্রীর ভাষায়, 'আঞ্চলিক দলের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক' অভিষেক ব্যানার্জির বিরুদ্ধে। বলছেন দাদা নাকি দাদাগিরি করতেন, দাদার আই প্যাক-ক্যামাক স্ট্রিট মুখ বন্ধ করিয়ে রাখত, দাদা নাকি ছাপিয়ে যেতে চেয়েছিলেন দিদিকেও! দিদি, দাদাকে কিছুই বলতে পারেননি। উলটে হারের পর, দলের নেতাদের বলেছিলেন অভিষেকের জন্য স্ট্যান্ডিং ওবেশন দিতে। ধর্মতলায় এক নেত্রীকে এদিনও বলতে শোনা গেল, তাঁদের সঙ্গে তো মানুষের মতো আচরণই করা হত না এক সময়ে। মিছিল মিটিং ভরে থাকত কর্পোরেট কালচার, হাইভোল্টেজ, ঝ্যাঁকানাকা ভিডিওগ্রাফি, আর ঝাঁ-চকচকে নেতাদের উপস্থিতিতে। তৃণমূলের তৃণমূল স্তরে তাঁরা ছিলেন কি? ছিলেন না। দল হারার পরেও কি তাঁরা আছেন? নেই। নেই, মমতার মন্দির বানানো উচিত বলা 'বুদ্ধিজীবী'রাও। এমনকী ভোটের মুখে ধর্মতলায় মমতার ধরনা মঞ্চে যে উপচে পড়া ভিড়, বহু 'নেতা-নেত্রী'র 'দিদি'র নজরে আসার প্রয়াস ছিল, তাঁরাও কেমন যেন উধাও! সব মিলিয়ে, হারের পর, একসঙ্গে থাকার বদলে, মা-মাটি-মানুষের তৃণমূল একেবারে মুড়িয়ে যাওয়ার পথে। আর মুড়িয়ে না গেলেও, দুই ফুল, দু'ভাগ হয়ে যাওয়ার জল্পনা তুমুল।
এই পরিস্থিতিতে, ঠিক ১৫ বছরের মাথায়, বাংলা মঙ্গলে সাক্ষী থাকল, ফের বিরোধী দলনেত্রী মমতা ব্যানার্জিকে পথে নামতে। মাত্র কয়েকশ কর্মী সমর্থক ছলছল চোখে বুঝিবা দেখলেন ঘাফুলের শিকড়কে। মমতা কী বললেন, মমতা এখনও কতটা 'ক্রাউড পুলার' সেসব অবশ্যই আলোচনার। কিন্তু ধর্মতলা যেন আরও স্পষ্ট করল, ক্ষমতা ছাড়া মমতার আসল সঙ্গী কারা। ওয়াই-চ্যানেলে, মেরেকেটে তিন-চারশো মানুষের মধ্যে, 'নেতা'র সংখ্যা? সাংসদের মধ্যে ছিলেন মালা রায়, দোলা সেন, ডেরেক ও'ব্রায়েন, কল্যাণ ব্যানার্জি। বিধায়কদ? ৭৮ জনের মধ্যে হাজির হলেন প্রায় এক হাতের আঙুলের সমান। মদন মিত্র, নয়না ব্যানার্জি, শোভনদেব চ্যাটার্জি, ফিরহাদ হাকিম, অশোক দেব, কুণাল ঘোষ, অসীমা পাত্র। তাছাড়া রইলেন, বৈশ্বানর, শীর্ষাণ্য, চন্দ্রিমা, অখিল, কৃষ্ণা, বিশ্বরূপ, তন্ময়, বীরবাহাদের মতো একেবারে হাতে গোনা কয়েকজন। অর্থাৎ, সেই মদন, সেই ফিরহাদ, সেই শোভনদেব, সেই মালা-চন্দ্রিমা! তাঁরা, যাঁরা মমতা যখন মুখ্যমন্ত্রী মমতা হননি, কিংবা ক্ষমতায় এসেছেন সবে, তখন থেকে মিটিং-মিছিল-ময়দানে হেঁটেছেন। তাঁদের বেশিরভাগ একেবারে তৃণমূল কংগ্রেসের শুরুর দিন থেকে মমতার সঙ্গে রয়েছেন। তাঁরা তখনও মমতার সঙ্গেই ছিলেন, যখন অভিষেক ব্যানার্জির নেতৃত্বে দলের মধ্যে নবীন-প্রবীণের দ্বন্দ্ব শুরু হয়েছিল। অভিষেকের আই প্যাক ধীরে ধীরে কোনঠাসা করছেন বর্ষীয়ানদের, কথা বলতে দিচ্ছেন না বলে একাধিক নেতা সরব হয়েছিলেন, তখনও। তখনও সঙ্গে ছিলেন, যখন একে একে যুব মুখ তুলে আনার কথা বলে বর্ষীয়ানদের সামনে 'বয়সের সীমা' সেট করতে চেয়েছিলেন অভিষেক। শোভনদেবতো গত বিধানসভা ভোটে মমতার জন্য নিজের জেতা আসন ছেড়েও দিয়েছিলেন। শনিবার অভিষেকের সোনারপুর কাণ্ডে মমতার পাশে ছিলেন আরেক শোভন। সায়নী, লাভলি, জুন, দেখা মেলেনি কারও। যুব সমাজের নেতারা কোথায় গেলেন এই সময়ে? যাঁরা আকাশে বাতাসে পজিটিভ এনার্জি মানে অভিষেক ব্যানার্জিকেই বুঝছিলেন! কোথায় গেলেন অল্প বয়সেই টিকিট পাওয়া দেবাংশু-তৃণাঙ্কুর? এই বয়সে, পথে নেমে, তুমুল বিক্ষোভ, হইচই করে সংগঠন ফিরিয়ে আনার কথা ছিল না তাঁদের? উলটে গত কয়েকদিন ধরেই দেখা যাচ্ছে পথে নামছেন সেই কল্যাণ, টিকিট না পাওয়া অসিত মজুমদাররা। আজ যখন মমতা ধর্মতলায় দাঁড়ালেন বিরোধী দলের নেত্রী হয়ে, দাঁড়ালেন ক্ষমতার ক্ষীর-দই থেকে সরে গিয়ে, তখন দেখা গেল, সেই মদন-ফিরহাদ-শোভনদেব-অশোক দেব রইলেন বসে, ভ্যাপসা গরমে। চাইলে এসি-তে বসে থাকতে পারতেন না? পারতেন। কিন্তু থাকেননি। যেমন ওই হাজার হাজার ভিড় শেষে, কয়েকশ কর্মী থাকেননি ঘরে বসে।