বিভাস ভট্টাচার্য: দলের মধ্যে 'মুষল পর্ব'। বিধানসভা নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর প্রতিদিনই কেউ না কেউ 'বিদ্রোহী' হয়ে উঠছেন। কেউ বলছেন সব দায় অভিষেক ব্যানার্জির, আবার কেউ বলছেন দলের মধ্যে কথা বলার সুযোগ ছিল না। গোঁদের উপর বিষফোঁড়ার মতো বিধানসভায় সই কেলেঙ্কারি। পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ। ভ্রাতুষ্পুত্রকে সিআইডি দপ্তরে হাজিরা দেওয়ার নির্দেশ। একের পর এক ঘটনায় এই মুহূর্তে তৃণমূল রীতিমতো অস্বস্তিতে। সেই আবহেই দলকে ঘুরিয়ে দাঁড় করাতে ধর্মতলার ওয়াই চ্যানেলে মমতা ব্যানার্জির সভা বা ধর্না।
মঙ্গলবার দুপুরে হাঁসফাঁস করা গরমে পাশে পুরনো কয়েকজন সঙ্গী। যার মধ্যে রয়েছেন কল্যাণ ব্যানার্জি, মদন মিত্র, দোলা সেন, অসীমা পাত্র, নয়না ব্যানার্জি, অখিল গিরি, সঞ্জয় বক্সীর মতো বেশ কিছু নেতা-নেত্রী। ছিলেন কুণাল ঘোষ, ডেরেক ও ব্রায়েন। হয়ত চেষ্টা করেও ভিড় ঠেলে ঢুকতে পারেননি। তাই বর্ধমানের তৃণমূল নেতা স্বপন দেবনাথ কিছুটা দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন। আর সামনে ছিলেন দলের এই দু: সময়ে দাঁড়িয়ে থাকা কর্মীরা।
যদি সামান্য দেড় দু'মাস আগের দিকেও ফিরে তাকানো যায় তাহলে এই চিত্রটাই ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। যেখানে মমতার ডাকা সভায় মঞ্চ আলো করে দাঁড়িয়ে থাকতেন রূপালি জগতের নায়ক-নায়িকা বা কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবীরা। যারা তাঁদের 'দিদি' বা নেত্রীর প্রতি কথায় ঘাড় নাড়তেন বা বুঝে না বুঝে হাততালি দিয়ে উঠতেন। মমতা ব্যানার্জি মঞ্চে এলে কে কত আগে দাঁড়িয়ে মিষ্টি মিষ্টি হাসি হেসে তাঁর দৃষ্টি আকর্ষণ করবেন সেই চেষ্টা চালাতেন। অখন্ড মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকতেন মমতার দিকে। নামটা বললেন কি বললেন না শোনার জন্য।
না, সেই চকমকে হাসি হাসা লোকজন এদিন ছিল না। যারা ছিলেন তাঁদের মধ্যে কতজন তাঁদের নেত্রী বা দিদির কাছে যাওয়ার সুযোগ পেয়েছেন সেটা নিয়ে রীতিমতো বাজি ধরা চলে। সংখ্যাটা বিরাট কিছু নয়। কিন্তু এই সংখ্যার মধ্যে রয়েছেন তরুণ, মধ্য বয়সী এবং প্রবীণরা। দলের এই দুর্দিনে যারা এসেছেন তাঁদের নেত্রীর ডাকে।
অমিতাভ বচ্চনের সিনেমার নাম তুলে প্রশ্ন করা যায়, "ওরা কারা"। সঙ্গে প্রশ্ন ওঠে, এরাই কি মমতার মিছিলে একদম শেষের দিকে হাঁটতেন? কারণ, সামনে যাওয়ার তো সুযোগ ছিল না। সেটা তো পাজামা, পাঞ্জাবি আর স্নিকার পরা দাদা-নেতাদের দখলে থাকত। তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতায় থাকার সময় যে কোনও সভায় বা মিছিলে তাঁরাই তো টিভি ক্যামেরার আশেপাশে ঘুরঘুর করতেন। মঞ্চ আলো করে হাঁটাহাটি করে বেড়াতেন।
আজ রাজ্যপাট নেই। সাজানো বাগান মাঝেমাঝেই ঝড়ের দাপটে এলোমেলো হয়ে উঠছে। কিন্তু রয়ে গিয়েছেন এঁরা। এই কর্মী বা নেতারা। ভিড়ের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে এরকম কিছু নেতার আক্ষেপ, "কী ছিল কী হল! যখন দলটা তৈরি হয় তখন কত আন্দোলন করেছি। ক্ষমতায় আসার পর ধীরে ধীরে সব কেমন যেন পাল্টে গেল। আমাদের মতো বেশ কিছু লোক দূরে চলে গেল! আবেগ ছাড়া একটা রাজনীতির আবহাওয়া তৈরি করা হল। যেখানে সব কিছুই চলেছিল কর্পোরেট কালচার-এ।"
নেত্রী হয়ত এই আলোচনা শুনতে পাননি। কিন্তু মনে মনে এটা হয়ত ভেবেছেন এঁরাই আসল তৃণমূলের সৈনিক। হয়ত ঘরটা কাঁচা, কিন্তু এটা কিন্তু একেবারেই নিজের।