• জিনাতের ‘রয়্যাল টাচ’-এ সিমলিপালের শাপমোচন! ফুটফুটে ৪ শাবকের জন্ম দিল বাঘিনী
    প্রতিদিন | ০৩ জুন ২০২৬
  • টানা ৮ মাসের জল্পনার অবসান। মা হলেন বাঘিনী জিনাত। একসাথে চার-চারটি শাবকের জন্ম দিয়েছে ওই বাঘিনী। আর তার চার-চারটি ফুটফুটে শাবক মায়ের মতোই হলুদ ডোরাকাটা। এই সৌন্দর্য-ই সুন্দরবনের দক্ষিণরায়কে রয়্যাল করে তুলেছে। কিন্তু তা হারিয়ে যেতে বসেছিল ওড়িশার সিমলিপালে। জিনগঠিত কারণে রূপ বদলে সিমলিপালের রয়্যাল বেঙ্গল হয়ে গিয়েছিল কালো। যার পোশাকি নাম ‘সিউডো-মেলানিস্টিক টাইগার’। সেই কারণেই হলুদ ডোরাকাটার সৌন্দর্য ফেরাতে মহারাষ্ট্রের তাডোবা-আন্ধারি ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে জিনাতকে নিয়ে আসে ওড়িশার সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভে। সেই জিনাত ওরফে গঙ্গার হাত ধরে যেন শাপমোচন সিমলিপালের! দেশের দ্বিতীয় ইন্টার স্টেট টাইগার ট্রানসলোকেশন সফল হল।

    মঙ্গলবার ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী মোহনচরণ মাঝি টুইট করে জানিয়েছেন, “রাজ্যের বন্যপ্রাণ সংরক্ষণের যাত্রায় এটি একটি গৌরবময় মাইলফলক।” তবে এই কৃতিত্বের অংশীদার খানিকটা হলেও বাংলা। সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে ঘরছাড়া হয়ে ঝাড়খন্ড, বাংলা ঘুরে ২০২৪-র ২৯ ডিসেম্বর বাঁকুড়ায় জিনাত বন্দি করেছিল পশ্চিমবঙ্গ বনবিভাগ। সুস্থভাবে তাকে ফিরিয়ে দেওয়ার পরই চলতি বছরের ১ জানুয়ারি থেকে সিমলিপালে যেন নতুন জীবন শুরু করেছিল ওই বাঘিনী। সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের গত ২৮ মে সকাল ১০ টা ৩৭ মিনিট নাগাদ ক্যামেরা ট্র্যাপে জিনাতের ওই শাবকের ছবি ধরা পড়ে। বাঘিনী জিনাত এক এক করে চারটি শাবক এক জায়গা থেকে অন্যত্র নিয়ে যাচ্ছিল। এই ছবি পাওয়ার পরেই নজরদারিতে আরও নিশ্চিত হয়ে মঙ্গলবার ওড়িশার মুখ্যমন্ত্রী টুইট করে এই সুখবর জানান।

    সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প কর্তৃপক্ষের ফিল্ড ডিরেক্টর প্রকাশচাঁদ গোগিনানি বলেন, “ওই চারটি শাবকের মধ্যে কটা পুরুষ, কটা স্ত্রী তা এখনই আমরা বলতে পারছি না। সিমলিপালের উত্তর এবং দক্ষিণ বিভাগকে মিলিয়ে একেবারে কোর এলাকায় জিনাত তার শাবকদেরকে নিয়ে সুস্থ, স্বাভাবিক আছে। আমাদের ২৪ ঘণ্টা নজরদারি চলছে। ওই শাবকগুলোর রঙ মেলানিস্টিক অর্থাৎ কালো ডোরাকাটা নয়। রয়্যাল বেঙ্গল টাইগারের যে সৌন্দর্য হলুদের ওপর ডোরাকাটা সেটাই দেখা মিলেছে। আমাদের অনুমান শাবকগুলির বয়স ২০ থেকে ২৫ দিন। সম্ভবত জানুয়ারি মাস নাগাদ অন্তঃস্বত্তা হয়েছিল জিনাত।”

    সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্প কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা গিয়েছে, চলতি বছরের ১ জানুয়ারি বাংলা থেকে উদ্ধারের পর সিমলিপাল ব্যাঘ্র প্রকল্পের মাটিতে তাকে একটি এনক্লোজারে রাখা হয়। সেই সময় কোনওভাবে জিনাত ওরফে গঙ্গা (এস ওয়ান)-র সঙ্গে টি-১২ মহাবল নামে একটি কালো পুরুষ বাঘের সঙ্গে তার সখ্যতা হয়। শুধু ওই বাঘটি জিনাতের ওপর আকর্ষিত হয়েছিল তা নয়। টান দেখা গিয়েছিলো বাঘিনী জিনাতেরও। তবে টি-৩১ নামে একটি কালো পুরুষ বাঘের আবেদনে জিনাত সাড়া দেয়নি। প্রত্যাখ্যান করেছিল তার আবেদন। তাই চলতি বছরের ১৭ এপ্রিল জিনাতকে এনক্লোজার থেকে সিমলিপালের দক্ষিণ বিভাগে ছাড়া হয়েছিল। জুলাই মাস নাগাদ কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল জিনাত অন্ত:সত্ত্বা। সেপ্টেম্বর মাস নাগাদ সে সন্তান প্রসব করতে পারে। কিন্তু তারপর জিনাতের সম্বন্ধে আর সঠিক তথ্য মেলেনি। জিনাতের অন্তঃস্বত্তার খবর ভুয়ো? নাকি সে সন্তান প্রসব করেছে? এই তথ্য জানতে উৎসুক ছিল বাংলা। দেশের মধ্যে প্রথম ইন্টার স্টেট টাইগার ট্রান্সলোকেশন ২০১৮ সালে সফল হয়নি। মধ্যপ্রদেশের কানহা ও বান্ধবগড় টাইগার রিজার্ভ থেকে একটি পুরুষ ও একটি স্ত্রী মিলিয়ে দুটি বাঘকে ওড়িশার সাতকোসিয়া টাইগার প্রজেক্টে নিয়ে আসা হয়েছিল। মহাবীর নামে একটি পুরুষ ও সুন্দরী নামে একটি স্ত্রী বাঘকে সেখানে রাখা হলেও মানুষের সঙ্গে অসম লড়াই-এ জড়িয়ে গিয়েছিল তারা। পুরুষ বাঘটি সেখানেই মারা যায়। স্ত্রী সুন্দরীকে মধ্যপ্রদেশে ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হয় কর্তৃপক্ষ। কিন্তু এবার সাফল্য পেল ওড়িশার সিমলিপাল।

    জিনাতকে ২০২৫ সালের ১৫ নভেম্বর মহারাষ্ট্রের তাডোবা-আন্ধারি ব্যাঘ্র প্রকল্প থেকে সিমলিপালে নিয়ে আসা হয়। সেখানে তার নম্বর ছিল টি-১৬৩। পরবর্তীকালে জিনাতের নাম দেওয়া হয় গঙ্গা। তিন বছরের জিনাতের সঙ্গে একই কারণে এসেছিল টি ১৫৮ যমুনাও। তার সিমলিপালের নম্বর এস-থ্রি। প্রথমে জিনাতকে কোয়ারেন্টাইন। তারপর ২৪ নভেম্বর রেডিওকলার পরিয়ে সফট রিলিজে রাখা হয়। কিছুদিন সেখানে রাখার পর তার ঠিকানা হয় সিমলিপাল টাইগার রিজার্ভের উত্তর বিভাগ। ২৮ নভেম্বর সিমলিপাল থেকে ঘরছাড়া হয় জিনাত। এখন রেডিও কলারের পাশাপাশি উপগ্রহ চিত্রের মাধ্যমে জিপিএস ব্যবস্থাপনাতেও তার নজরদারি চলে। জিনাত যে একেবারে ভিভিআইপি!
  • Link to this news (প্রতিদিন)